২২ আগস্ট ২০১৯

শরণার্থীদের মৃত্যু ও ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি

-

আয়লান কুর্দিকে মনে আছে? সেই ছোট্ট ছেলেটি, শরণার্থী হওয়ার ‘অপরাধে’ যার দেহ ভেসে উঠেছিল সমুদ্র তীরে, সেই আয়লান। এবার আবার যেন সেই স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিলো শরণার্থী এক বাবা আর ছোট্ট মেয়ের দেহ ভেসে ওঠার ঘটনা। এই ছবিই যেন বলে দিচ্ছে, বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের দুর্দশার কথা। পশ্চিমা বিশ্বে শরণার্থী সঙ্কট কতটা ভয়াবহ সেই চিত্রই উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক এই ছবির মধ্য দিয়ে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সীমান্তে ঘটল এমন মর্মান্তিক ঘটনা।
২৫ বছর বয়সী অস্কার অ্যালবার্তো তার দুই বছরের মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন; যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রিও গান্ডে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু নদীর স্রোতে ভেসে যান অ্যালবার্তো। সাথে তার মেয়েরও একই পরিণতি হয়। মেয়েকে নিজের টিশার্টের ভেতরে ঢুুকিয়ে রেখেছিলেন। স্রোতে দুই বছরের মেয়ে যেন কোনোভাবেই ভেসে না যায়। কিন্তু তিনিই শেষ পর্যন্ত তলিয়ে গেলেন ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে। পরে তার ও মেয়ের নিথর দেহ ভেসে ওঠে নদীর পানিতে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত রিও গান্ডে পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক শরণার্থীর মৃত্যু হয়ছে, যা বিগত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর পিয়েদ্রাস নেগরাসে পুলিশ কর্মকর্তা ক্লডিয়া হার্নান্দেজ বলেন, এই নদীটি খুবই বিপজ্জনক। যারা এখানে থাকেন না, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয়। আমি এখানে বড় হয়েছি। আমি কখনোই এই নদীতে যাব না। নদীর স্রোত আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
এর আগে আয়লান কুর্দির ছবিও নাড়া দিয়েছিল বিশ্ববিবেককে। সারা বিশ্বের মানুষ মানবিক পৃথিবীর কথা বললেন। কিন্তু অসহায় মানুষের কথা না ভেবে, সীমান্ত সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে দুনিয়ার সব দেশ। ফলে সীমান্তে মৃত্যুর মিছিল থামেনি।
মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্রকে ভাগ করেছে রিও গান্ডে নদী। আর সেটি পাড়ি দিলেই স্বপ্নের অ্যামেরিকা। তাই দুই বছরের মেয়ে ভ্যালেরিয়াকে সাথে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনে পা বাড়িয়েছিলেন বাবা আলবার্তো। নদী পাড়ি দিতে গিয়ে বরণ করতে হলো মৃত্যু। মা তানিয়া ভানেসা অ্যাভলোসও নদীর পাড়ি দেয়ার ঝুঁকিটা নিয়েছেন। তিনি শুধু প্রাণেই বেঁচেছেন!
মেক্সিকোর দৈনিক লা জরনাডার সাংবাদিক জুলিয়া লা ডুকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে মর্মান্তিক ওই ছবিটি। পত্রিকাটি লিখেছে, গুয়েতেমালা সীমান্ত দিয়ে মানবিক কারণে পাওয়া দুই মাস মেয়াদি ভিসা নিয়ে আল সালভাদর থেকে মেক্সিকো পাড়ি জমান নিহত আলবার্তোর পরিবার। সে দিন ছিল রোববার। যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী মেক্সিকান শহর মাটামোরজে আশ্রয়ের আবেদন জানাতে আসেন তারা। কিন্তু রোববার বলে সে দিন অফিস বন্ধ ছিল। উপায়ান্তর না দেখে, নিশ্চিত ঝুঁকি জেনেও হেঁটে, নদী সাঁতরে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন আলবার্তো ও তার শিশু কন্যা।
ঘটনায় শোক জানিয়ে আল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নাইয়িব বুকেলে বলেছেন, একদিন সবাই মিলে এমন এক রাষ্ট্র বানানো হবে, যেখানে শরণার্থী হবে একটা সুযোগ, প্রতিবন্ধকতা নয়। তার মতে, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান আর সুযোগের অভাব ও অসমতার কারণে লোকজন জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে সীমানা পাড়ি দিতে চায়।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্দ্রা হিল বলেছেন, ২০ বছর ধরে চলে আসা অভিবাসনের এই প্রক্রিয়া দ্ইু সপ্তাহের ব্যবধানে বন্ধ করা যাবে না। তবে এই সঙ্কট নিরসনে মেক্সিকান ও মার্কিন সরকারের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে আল সালভাদর।
এ ঘটনায় শোক জানিয়ে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওবারডোর বলেছেন, এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা সবসময় বলে আসছি, যুক্তরাষ্ট্র খুব কড়াকড়িভাবে অভিবাসী প্রত্যাশীদের বাধা দিচ্ছে। ফলে মরুভূমিতে অথবা নদী পার হতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে এ প্রক্রিয়ার আসল কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার শিরোনামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলা হয়েছে, শরণার্থীদের কি ট্রাম্প নিজের পশু মনে করেন?
এর আগেও শরণার্থীদের প্রতি অমানবিক আচরণের জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন ট্রাম্প। অশালীন ভাষায় শরণার্থীদের আক্রমণ করেছেন তিনি। মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে চাওয়া মানুষদের তিনি কখনো ‘পশু’, ‘ঠাণ্ডা মাথার অপরাধী’, ‘খারাপ মানুষ’ প্রভৃতি আখ্যা দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হতে ইচ্ছুক বেটো ওরউরক বলেন, এই মৃত্যুর জন্য ট্রাম্পই দায়ী। তার অনৈতিক ও অমানবিক অভিবাসন নীতির ফল এটি।
যুক্তরাষ্ট্র আর মেক্সিকো সীমান্তের বেশির ভাগ অংশে আছে মরুভূমি আর রিও গ্রান্ডে নদী। বেশির ভাগ অভিবাসনপ্রত্যাশী তীব্র ¯্রােতের এই নদী পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের (সিবিপি) তথ্য মতে, ২০১৮ সালেই সীমান্ত পাড়ি দিতে প্রাণ হারিয়েছে ২৮৩ জন। তবে এটা প্রকৃত চিত্র নয়। কারণ, শুধু নিজেদের অংশে মৃতের হিসাব রাখে সিবিপি। আইওএম বলছে, গত বছর এই দুই দেশের সীমান্তে মৃতের সংখ্যা ৪৪৪। আইওএমর নিখোঁজ অভিবাসী প্রকল্পের কর্মকর্তা কেইট ডিয়ারডেন বলেছেন, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে ১৩ কন্যাশিশু প্রাণ হারিয়েছে। সারা বিশ্বের হিসাব সীমান্তে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৭৩।
যুক্তরাষ্ট্র আর মেক্সিকো সীমান্তের শরণার্থী সমস্যা একটি দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট; যা কাটাতে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। শরণার্থীরা যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে তা দূর করতে হবে। না হলে নতুন নতুন আয়লান কুর্দির দেখা মিলতে পারে।

 


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet