২০ জুলাই ২০১৯
মধ্যপ্রাচ্য

উত্তেজনা কোন দিকে মোড় নিচ্ছে?

-

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ওমান সাগরে দুই তেল ট্যাংকারে হামলার পর পরিস্থিতি মনে হচ্ছে আরো অবনতির দিকেই যাচ্ছে। তেলের ট্যাংকারে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন সৌদি যুবরাজ। এর আগে এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি যুবরাজ বলেন, এ অঞ্চলে যুদ্ধ চায় না সৌদি আরব। কিন্তু নিজের জনগণ, সার্বভৌমত্ব ও মৌলিক স্বার্থ ক্ষুণœ হলে যেকোনো হামলা মোকাবেলায় দ্বিধা থাকবে না। অপর দিকে তেল ট্যাংকারে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যোগসাজশ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইরান। রোববার ইরানের পার্লামেন্টে এমন আশঙ্কার কথা জানান দেশটির স্পিকার আলী লারিজানি। তিনি বলেন, ট্যাংকারে নাশকতার সাথে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত থাকতে পারে। এর মাধ্যমে হয়তো তারা ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, তেহরানের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর ইচ্ছা ওয়াশিংটনের নেই। তবে একই সাথে তিনি ওমান সাগরে তেল ট্যাংকারে রহস্যজনক হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্র সৌদি আরব একই ভাষায় কথা বলছে। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ইরানের সাথে যুদ্ধ চান না বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করলেও বাস্তব অবস্থা উল্টো দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে বলেই পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা।
ওমান উপসাগরে দু’টি তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরান জড়িত থাকার প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্য দেয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সঙ্কট জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই তথ্য প্রমাণ করে, বৃহস্পতিবারের হামলায় জড়িত ছিল ইরান। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এতেই বেশ পরিষ্কার প্রমাণ রয়েছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেমন হতে যাচ্ছে পরবর্তী পরিস্থিতি? যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে? বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জনাথন মার্কাস তার বিশ্লেষণে বলেন, পেন্টাগনের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার হামলার শিকার তেল ট্যাংকার দু’টির একটি থেকে অবিস্ফোরিত একটি লিমপেট মাইন সরিয়ে নিচ্ছে ইরানি একটি ছোট তরীর ক্রুরা। যাকে এই যুদ্ধে প্রকৃত ঘটনা প্রতিষ্ঠার প্রথম শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ইরান ও ট্রাম্প প্রশাসন উভয় পক্ষের সমালোচনাই বিষাক্ত।
গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে জাহাজে চারটি লিমপেট মাইন হামলার মতোই শুরু থেকে এ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে ইরান। তবে দুটো ঘটনার জন্যই তেহরানকে দোষারোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, এই বাকযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সঙ্ঘাতে রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও দ্রুত ও স্পষ্টভাবেই ইরানের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেন, এই মূল্যায়ন গোয়েন্দা তথ্য, ব্যবহৃত অস্ত্র, অভিযান পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা, সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজে ইরানের হামলা এবং যেহেতু ওই এলাকায় থাকা কোনো প্রক্সি গ্রুপের এ ধরনের সূক্ষ্ম অভিযান পরিচালনার মতো সক্ষমতা না থাকার ভিত্তিতে করা হয়েছে।
এ অভিযোগ দ্রুতই নাকচ করেছে ইরান। উল্টো এ ঘটনা সাজানো উল্লেখ করে পাল্টা দোষারোপ করেছে দেশটি। ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, কেউ ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে।
সাধারণভাবে মার্কিন নৌবাহিনীর ভিডিওটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও কিন্তু এরপরও আসলে অনেক প্রশ্ন থেকে যায়।
মার্কিনিদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিস্ফোরণের কিছু সময় পর এটি রেকর্ড করা হয়েছিল, যখন কিনা ইরানিরা প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করছিল।
তবে এই হামলার কালক্রম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ হওয়া দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কখন এই মাইনগুলো জাহাজে স্থাপন করা হয়েছিল?
ওই এলাকায় শক্তিশালী মার্কিন নৌ উপস্থিতি থাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের বেশ সক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাই আরো তথ্য সামনে আসা উচিত। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর ময়নাতদন্তও আরো তথ্য উদঘাটন করবে।
যা হোক, মার্কিন এই দাবির প্রভাব আরো অনেক সুদূরপ্রসারী। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, ইরান ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
মিস্টার পম্পেও এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘পুরো ঘটনা আমলে নিলে বোঝা যায়, এ ধরনের উসকানিহীন হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি ও সুরক্ষার প্রতি হুমকি, নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ এবং উত্তেজনা বাড়ানোর অগ্রহণযোগ্য প্রচারণা।’
এসব স্থূল অভিযোগের পর প্রশ্ন আসে, এগুলো ঠেকাতে কী ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের?
সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতা হতে পারে এক ধরনের উদ্যোগ, যাতে আন্তর্জাতিক মিলিত নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে আরো কোণঠাসা করা যায়।
তবে এ বিষয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই যে, ভুল কিংবা সঠিক, অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের মতো স্বাধীন নৌশক্তি পরিচালনাকারী গ্রুপগুলো হয়তো পাল্টা আঘাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাহলে এখন কী হবে? যুক্তরাষ্ট্র কি শাস্তিস্বরূপ সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা করছে?
উপসাগরীয় অঞ্চল এবং তার বাইরে মিত্রদেশগুলো কী চিন্তা করবে? আর সামরিক পদক্ষেপের পরিণতিই বা কী হবে?
বাস্তবিকপক্ষেই বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে যে, হামলার শিকার হলে ইরান সরাসরি বা তার মিত্রদেশগুলোর সহায়তায় হাইব্রিড যুদ্ধের সূচনা করতে পারে। জাহাজ পরিচালনা ও অন্যান্য টার্গেটে ব্যাপক হারে হামলা শুরু করতে পারে, বাড়তে পারে তেল ও বীমার দাম; যা আসলে আরো শাস্তিমূলক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে।
তবে কোনো পক্ষই এ ধরনের বিপজ্জনক সঙ্ঘাতের শঙ্কার বিষয়ে আগ্রহী হবে না। অবশ্য কেউ ভাবে না যে, ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রÑ দুই পক্ষই পূর্ণমাত্রায় সঙ্ঘাত শুরু করতে চায়।
আমেরিকানদের জন্য পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে বিমান ও নৌ হামলা সব ধরনের বিপদ ডেকে আনবে। এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক সময় অনেক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেও বিদেশে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে ধৈর্যশীল ছিলেন। তার শাসনামলে সিরিয়ায় বিমান হামলা ছিল মূলত প্রতীকী।
এখন শঙ্কা হচ্ছে, পরিস্থিতি না বুঝে হলেও মার্কিন প্রশাসনে একটা শোরগোল তুলেছে ইরান, যা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে উসকে দিতে পারে। আসল বিপদ হচ্ছে, পরিকল্পিত নয় বরং দুর্ঘটনাবশত যুদ্ধের সূচনা। তেহরান ও ওয়াশিংটন দুই পক্ষই সঙ্কট সমাধানের ইঙ্গিত দিলেও কেউই তা সঠিকভাবে গ্রহণ করছে না। উদাহরণস্বরূপ, উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন অবকাঠামোকে হুমকি হিসেবে দেখতে পারে ইরান। আর নিজেদের দোরগোড়ায় এ ধরনের হুমকি কখনোই সহ্য করবে না তারা। ধরা যাক, এই বার্তাকে ভুলভাবে নিতে পারে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড বাহিনী। তারা ভাবতে পারে, উপসাগরের জলসীমায় মার্কিনিদের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা ভোগের অধিকার রয়েছে তাদের, যা মানে না আমেরিকানরা।
অন্য কথায় বলতে গেলে, তারা ভাবতে পারে, তাদেরকে ‘জোর করে খামে ঢোকানোর’ চেষ্টা চলছে। যার জন্য ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের শাস্তি পেতেই হবে। এটা উদ্দেশ্যমূলক ও উদ্দেশ্যহীন যেকোনো ধরনের সঙ্ঘাত উসকে দেয়ার রেসিপি। এগুলো খুবই খারাপ সময়।
জার্মানি আর ফ্রান্সের মতো ওয়াশিংটনের মিত্ররা এরই মধ্যে সাবধানতার আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে। তবে এ ক্ষেত্রে নিজের উপসংহার নিজে টানতে চায় তারা।
‘আমরা আমাদের আলাদা মূল্যায়ন করব, এ বিষয়ে আমাদের নিজেদের প্রক্রিয়া রয়েছে’Ñ বিবিসির টুডে অনুষ্ঠানকে বলেন জেরেমি হান্ট।
তিনি বলেন, ‘আমেরিকার মূল্যায়ন বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। কারণ তারা আমাদের নিকটতম মিত্র।’
তবে যেকোনো পদক্ষেপ মিস্টার ট্রাম্পের হিসাব করেই নেয়া উচিত। তিনি যখন প্রথমে ক্ষমতায় আসেন তখন হোয়াইট হাউজে অনেক এমনকি রিপাবলিকান বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ ছিলেন, যারা তার প্রশাসনের সাথে কাজ করতে চাননি। তাদের অভিযোগ, বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে ট্রাম্পের মারাত্মক ও অনিশ্চিত পদ্ধতি সঙ্কট ডেকে আনবে। আর অনেক সময় মনে হয়েছে, উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়ার সাথে সঙ্কট তৈরি হবে। তবে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। এখন হোয়াইট হাউজের ওপর নতুন করে সঙ্কট আগত।
এর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী, মারাত্মক প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে পড়বে না, বরং গালফ ও অন্যান্য এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী অংশীদার ও মিত্রদের ওপর পড়বে। যাদের অনেকেই জানেন না, এই প্রেসিডেন্ট ও তার অনন্য কূটনৈতিক ধারার সাথে কিভাবে মানিয়ে নিতে হবে।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস তেল ট্যাংকারে হামলার ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে বলেন, এ ঘটনার সত্যতা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার লারিজানি বলেছেন, হামলা চালিয়ে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর অতীত রেকর্ড যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের কাছাকাছি এলাকায় নিজেদের জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে এর দায় জাপানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রÑ যাতে জাপানের সাথে তাদের শত্রুতাকে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরা যায়। এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপ কোনো সুখবর বয়ে আনবে না। এ দিকে বহুজাতিক পরমাণু চুক্তি বাঁচাতে ইউরোপকে ১০ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে ইরান। তা না হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে ইরান ঝুঁকবে পরমাণু অস্ত্রের দিকে। তাই জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থত য় এখন প্রয়োজন সংযম। হ


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi