২৪ আগস্ট ২০১৯

মিয়ানমারের অবরুদ্ধ সাংবাদিকতা

-

ওয়া লোন (৩৩) ও কিয়াউ সোয়ি উ (২৯) মিয়ানমারের নাগরিক ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিনিধি। ৫১১ দিন কারাগারে থাকার পর গত ৭ মে মুক্তি পেয়েছেন এই দুই সাংবাদিক। জজ আদালত তাদের সাত বছরের সাজা দেয়ার পর হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগেও তা বহাল থাকে। সারা বিশ্ব থেকে তাদের মুক্তির দাবি জানানো হলেও মিয়ানমার তা উপেক্ষা করে বিচার চালিয়ে যায়। অবশেষে আপিল বিভাগের রায় আসার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় তাদের মুক্তির খবর আসে। প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমায় তারা মুক্তি পান। প্রতিবছর বর্ষবরণের মওসুমে মিয়ানমারে প্রেসিডেন্টের ক্ষমায় বিপুলসংখ্যক বন্দীকে মুক্তি দেয়া হয়।
তাদের মুক্তির জন্য তাদের স্ত্রীরা গত এপ্রিলে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করেছিলেন। তবে সেখানে অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তারা কারাগার থেকে বেরিয়ে এলে বন্ধু, স্বজন আর সহকর্মীরা স্বাগত জানান। ক্যামেরার সামনে বুড়ো আঙুল তুলে ‘থাম্বস আপ’ দেখিয়ে ওয়া লোন বলেন, তাদের মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে সমর্থন দিয়ে গেছে, সে জন্য তারা কৃতজ্ঞ। ‘আমার পরিবার, আমার সহকর্মীদের মাঝে ফিরে আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে। বার্তা কক্ষে ফিরতে আমার আর দেরি সহ্য হচ্ছে না।’
কী ছিল রয়টার্সের প্রতিবেদনে, কেন গ্রেফতার
উত্তর রাখাইনের ইনদিন গ্রামে সেনাবাহিনী ও কিছু গ্রামবাসী মিলে সারিবদ্ধভাবে একদল রোহিঙ্গাকে বসিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর। এ ঘটনাই উঠে এসেছিল রয়টার্সের প্রতিবেদনে। যার তথ্য-উপাত্ত সব ওই দুই সাংবাদিকই জোগাড় করেছিলেন।
আটক দুই সাংবাদিকের কিছু প্রতিবেদন ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময়ে রয়টার্সে প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। ‘কিভাবে মিয়ানমারের প্রত্যন্ত গ্রামে সেনাবাহিনী অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা, লুটপাট চালিয়েছে’ শিরোনামে বেশ কয়েকটি ছবিসংবলিত এ প্রতিবেদনটিতে দেখা গেছে, রাখাইনের ইনদিন গ্রামে ১০ জন রোহিঙ্গাকে হাত পেছনে বেঁধে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের পেছনে রয়েছে অস্ত্রধারী বেশ কয়েকজন ব্যক্তি। প্রতিবেদনটিতে সংযুক্ত আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে আটককৃত এ রোহিঙ্গাদের অনেকে মৃত পড়ে আছেন, যাদের অনেককেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর নির্যাতনের তথ্য প্রকাশ করা এ প্রতিবেদনটির জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন ওই দুই সাংবাদিক। প্রতিবেদনটির জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর পুলিৎজার পুরস্কারও প্রদান করা হয় তাদের।
এই দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার মিয়ানমারে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে বিচারিক হয়রানির ভয়ঙ্কর এবং হাইপ্রোফাইল উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে।
রয়টার্স দাবি করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের এটিই প্রথম কোনো প্রমাণ। বৌদ্ধ গ্রামবাসীও ঘটনা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থাটি। পরে দুই সাংবাদিককে আটকের পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ঘটনা তদন্ত করে। মিয়ানমার দাবি করে ওই ১০ ব্যক্তি ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ কিন্তু রয়টার্স দাবি করে এর কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। ওই দুই সাংবাদিক পরে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথেও কথা বলেন, যারা এখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে।
নিপীড়নমূলক আইন ও সাংবাদিকতা
মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম কিছুটা বৈচিত্র্যপূর্ণ হলেও দেশটিতে বিভিন্ন সময়ে প্রণীত আইনকানুনে আটকে থেকেই পেশাগত কাজ চালিয়ে যেতে হয় সাংবাদিকদের। ‘ইউরোপিয়ান জার্নালিজম সেন্টার’-এর এক প্রতিবেদন বলছে, মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমকে দেশটির সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিয়ত চাপের মুখে থাকতে হয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৩০টি সংবাদ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি দিয়েছিল সরকার। দেশটির বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্য রয়েছে কমিউনিটি রেডিও চ্যানেলও। তবে দেশটির টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০১৭ সালে দেশটিতে নতুন পাঁচটি কোম্পানি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চালানোর অনুমোদন পায়। ইন্টারনেটের বিকাশ খুব দ্রুত হচ্ছে দেশটিতে। ফেসবুক দেশটিতে এতই জনপ্রিয় যে, দেশের অনেকেই ফেসবুককে ইন্টারনেট মনে করে থাকেন, বলছে ইউরোপিয়ান জার্নালিজম সেন্টার।
দেশটিতে গণমাধ্যমের উন্নয়নের এ তৎপরতা খুব সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ করা গেছে। ২০১২ সালের নির্বাচনের পর দেশটিতে গণমাধ্যমের জন্য একটি উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেয়া হচ্ছিল। সে বছরের জাতীয় নির্বাচনের পর দেশটির প্রি-পাবলিকেশন সেন্সরশিপ উঠিয়ে নেয়া হয়। ধারণা করা হয়েছিল যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটি বাকস্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিস্থাপনে কাজ করবে। কিন্তু রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের সাজার ঘটনায় দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়ে মিয়ানমার।
১৯২৩ সালে ব্রিটিশদের করা দাফতরিক গোপনীয়তা আইন খুব কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় দেশটিতে। ২০১৪ সালে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় করা গণমাধ্যম আইন খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
দাফতরিক গোপনীয়তা আইন বলবৎ থাকার পাশাপাশি আরো রয়েছে ২০১৩ সালে টেলিকমিউনিকেশন আইন, যার আওতায় মানহানির মতো ধারা সংযুক্ত আছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের এক প্রতিবেদন বলছে, দেশটির সাংবাদিকরা টেলিকমিউনিকেশন আইনের আওতায় প্রায়ই হেনস্তার শিকার হন। সংস্থাটির ২০১৯ সালের প্রতিবেদন বলছে, গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে দেশটির অবস্থান ১৩৮তম।
মুক্ত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সরকার একজোট হয়ে রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে। সে লক্ষ্যেই অস্পষ্ট আইনে বহু সাংবাদিককে গ্রেফতার বা বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে বলে মনে করছে জাতিসঙ্ঘ।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের পরিসংখ্যান থেকে উদ্ধৃত করে মানবাধিকার কমিশনের মুখপাত্র রাভিনা শ্যামদাসানি বলেন, শুধু ২০১৭ সালেই মিয়ানমারে অন্তত ২০ জন সাংবাদিককে এসব আইনে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।
পালিয়ে বেড়াচ্ছেন একজন প্রধান সম্পাদক
রাখাইনভিত্তিক বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া গ্রুপের প্রধান সম্পাদক অং মার্ম ও’কে হয়রানি ও গ্রেফতারের হুমকি অবিলম্বে বন্ধ করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। তার বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক আমলের ‘আনলফুল অ্যাসোসিয়েশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে ‘আনস্পেসিফাইড’ নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করেছে কর্তৃপক্ষ। গত ১ মে করা ওই মামলায় তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য অং মার্ম ও আত্মগোপন করে আছেন। এ অভিযোগে তিনি দোষী প্রমাণ হলে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল ও জরিমানা হতে পারে।
মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমের ওপর ক্রমেই বাড়ছে সেনাবাহিনীর চাপ। তার একটি উদাহরণ হলোÑ অং মার্ম ও। এ ছাড়া ১ এপ্রিল দ্য ইরাবতি পত্রিকার বার্মিজ ভাষা সংস্করণের সম্পাদক ইয়ি নি’র বিরুদ্ধে অনলাইনে মানহানির ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছে। এই অভিযোগ করা হয়েছে টেলিযোগাযোগবিষয়ক আইনের ৬৬(ডি) ধারার অধীনে। এর আওতায় দুই বছরের জেল হতে পারে তার।হ

 


আরো সংবাদ

ভারতের হামলার মুখে কতটুকু প্রস্তুত পাকিস্তান? (২৭৭২২)জামালপুরের ডিসির নারী কেলেঙ্কারির ভিডিও ভাইরাল, ডিসির অস্বীকার (২৭৪২৬)কিশোরীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুললেন নোবেল (১৯৩২৬)‘কাশ্মিরি গাজা’য় নজিরবিহীন প্রতিরোধ (১৯০১৫)ভারত কেন আগে পরমাণু হামলা চালাতে চায়? (১৮৭০০)সেনাবাহিনীর গাড়িতে গুলি, পাল্টা গুলিতে সন্ত্রাসী নিহত (১৮৩৫২)কাশ্মির সীমান্তে পাক বাহিনীর গুলিতে ভারতীয় সেনা নিহত (১৩৭৫২)দাম্পত্য জীবনে কোনো কলহ না হওয়ায় স্বামীকে তালাক দিতে চান স্ত্রী (১২৫৩৫)প্রিয়াঙ্কাকে সরাতে পাকিস্তানের চিঠির জবাব দিয়েছে জাতিসংঘ (৮৩৮৪)রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে যে বার্তা দিল চীন (৭৭২৬)



mp3 indir bedava internet