২২ মে ২০১৯

স্বৈরশাসনের স্বর্গভূমি আফ্রিকা

-

সম্প্রতি এক সপ্তাহের ব্যবধানে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে আফ্রিকার দু’জন শাসককে। আলজেরিয়ার আবদুল আজিজ বুতেফ্লিকা ও সুদানের ওমর আল বশির। দু’জনের বিপক্ষেই কয়েক মাস ধরে বিক্ষোভ করেছে জনতা। বুতেফ্লিকে বিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনীর চাপে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, আর বশিরকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেছে সে দেশের সেনাবাহিনী। দেড় বছর আগে জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবেকেও ক্ষমতাচ্যুত করেছে সেনাবাহিনী। জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার পর থেকে এককভাবে ৩৭ বছর দেশ শাসন করেছেন মুগাবে। বয়স ৯৪ হয়ে গেছে, তবু ক্ষমতা ছাড়তে চাননি। মুগাবে জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর তিনিই হয়েছেন প্রেসিডেন্ট; কিন্তু এরপর দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে নিজের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করেছেন। বুতেফ্লিকা ২০১৪ সালে স্ট্রোক করার পর থেকে চলছেন হুইল চেয়ারে। হুইল চেয়ারে বসেই দেশ শাসন করেছেন। তবু ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াননি।
এগুলো উদাহরণ মাত্র। পুরো আফ্রিকা মহাদেশজুড়েই বলতে গেলে একই চিত্র। এখনো মহাদেশটির চারজন শাসক আছেন, যারা ৩০ বছরের বেশি সময় ক্ষমতা আঁকড়ে আছেন। আর অন্তত ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন এমন শাসকের সংখ্যা এক ডজনের বেশি। ইকুয়েটোরিয়াল গিনির প্রেসিডেন্ট তিওদোরো ওবিয়াং এমবাসোগো ক্ষমতায় আছেন ৩৯ বছর ধরে। ১৯৭৯ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিজের চাচাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেন এই সেনা কর্মকর্তা। ক্যামেরুনের পল বাইয়া ও উগান্ডার ইউয়েরি মুসেভেনিক ক্ষমতায় আছেন তিন দশকের বেশি সময়। গ্যাবনের প্রেসিডেন্ট ওমর বঙ্গো মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়েননি। তার ৪১ বছরের শাসন শেষ হয়েছে ২০০৯ সালে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ২০১৭ সালের আগস্টে অ্যাঙ্গোলার প্রেসিডেন্ট হোসে ইউদার্দো দো সান্তোস ৩৮ বছর পর ক্ষমতা ছেড়েছেন।
অঞ্চলটির অনেক দেশের শাসকেরা স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে টানা দেশ শাসন করেছেন। প্রথম দিকে জনগণের সহানুভূতি নিয়ে ক্ষমতায় বসলেও আর ছাড়ার নাম করেননি। অনেকে আবার ক্ষমতায় এসেছেন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত শাসকদের সরিয়ে। এর সংখ্যাই বেশি। এক সময় তো আফ্রিকার দেশগুলোতে ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র পদ্ধতিই হয়ে উঠেছিল সামরিক অভ্যুত্থান। গিনির এমবাসোঙ্গো, উগান্ডার মুসেভেনি এভাবেই ক্ষমতা দখল করেছেন। তবে ক্ষমতায় এসে তারা আবার যেকোনোভাবেই হোক অভ্যুত্থান ঘটা বন্ধ রাখতে পেরেছেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে যেখানে আফ্রিকায় ২৭টি সফল অভ্যুত্থান হয়েছে, সেখানে ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে হয়েছে ১২টি এবং ২০১২ সালের পর হয়েছে মাত্র দু’টি (মুগাবে ও বশিরের বিরুদ্ধে)। অর্থাৎ নিজেরা ক্ষমতা দখল করে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারার কারণেই তাদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
২০১৮ সালে দ্য ইকোনমিস্ট এক রিপোর্টে বলেছে, শুধু সাহারা মরুভূমিকে ঘিরে গড়ে ওঠা আফ্রিকান অঞ্চলেই ২০টির বেশি দেশে স্বৈরশাসন চলছে। কিছু দেশ সরাসরিই স্বৈরতান্ত্রিক। আবার কিছু দেশে আছে নামমাত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেসব দেশ কার্যতই একদলীয়। নির্বাচন হলেও তা অনেকটাই সাজানো। যেমন- ২০১৭ সালের আগস্টে রুয়ান্ডার নির্বাচন শেষে সরকার ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, ২৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা পল কাগামে ৯৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।
এই স্বৈরশাসনের কুফলও ভোগ করতে হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশকে। এ শাসকেরা ক্রমেই ধ্বংস করেছেন দেশগুলোকে। লুটপাট, দুর্নীতিসহ এমন কোনো অনিয়ম নেই যা তারা করেননি। ইকোনমিস্ট উদারহরণ দিতে গিয়ে বলেছে জিম্বাবুয়ের কথা। দেশটি একসময় আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি ছিল; কিন্তু মুগাবে শাসনেই ক্রমেই ধ্বংস হয়েছে জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি। গত এক দশকে ভয়াবহ কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে দেশটির অর্থনীতি। বেশির ভাগ দেশের অবস্থাই এমন। শাসকদের সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠেছে, জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর মধ্যে অবশ্য লিবিয়া ব্যতিক্রম। গাদ্দাফির ৪২ বছরের শাসনে দেশটি অর্থনৈতিক সঙ্কটে খুব একটা পড়েনি। জনগণের জীবনযাত্রাও ছিল উন্নত।
গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর সাবেক শাসক মোবুতু সেকো দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারেননি ব্যাপক খনিজ সম্পদ থাকার পরও। খনিজ সম্পদ আহরণে নিযুক্ত বিদেশী কোম্পানিগুলোকে তাড়িয়ে বরং অর্থনৈতিক সঙ্কট ডেকে এনেছেন। সেই সাথে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন প্রতিনিয়ত।
আফ্রিকান শাসকদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু অভিযোগ রয়েছে। গুম, খুনসহ ভিন্নমত দমনে ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ আছে অনেক শাসকের বিরুদ্ধে। বুরুন্ডির মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ভয়াবহ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট পিয়েরে এনকুরানজিজার সমর্থকেরা এমন কোনো অন্যায় নেই যা করেননি।
পাশাপাশি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অনেকে সংবিধানকে কাজে লাগান। কখনো বিচার বিভাগের রায়ে, কখনো পার্লামেন্টে ভোটাভুটি করে, কখনো বা গণভোটের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করা হয়। এসব ক্ষেত্রে গণভোট অবশ্য ‘গণ’ হয় না মোটেই। আর পার্লামেন্ট ও বিচার বিভাগ থাকে শাসকের অনুগত। ২০০০ সালের পর থেকে এই প্রবণতা বেড়েছে অনেকগুণ। এ সময় অনেক শাসকই ক্ষমতার মেয়াদ বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছেন। নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে সংবিধান ব্যবহার করা হয়েছে এ ক্ষেত্রে।
যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন বলেছেন, চলতি শতাব্দীতে অন্তত ১৭ জন আফ্রিকান শাসক ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে সাংবিধানিক বাধাকে যেকোনো উপায়ে দূর করতে চেষ্টা করেছেন। ১৯৯৮ সালে নামিবিয়ার প্রেসিডেন্ট স্যাম নুজোমাও একই কাজ করেছেন। ২০০২ সাল থেকে তাকে অনুসরণ করেছেন টোগোর প্রেসিডেন্ট নাসিংবে ইয়াদেমা, গ্যাবনের ওমর বঙ্গো। বঙ্গো পার্লামেন্টে ভোটাভুটি করিয়ে ষষ্ঠ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার বৈধতা অর্জন করেছেন। পরবর্তী কয়েক বছরে একই কাজ করেছেন অ্যাঙ্গোলা, বুরকিনা ফাসো, বুরুন্ডি, ক্যামেরুন, শাদ, জিবুতি, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, নাইজার, গিনি, নাইজেরিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রুয়ান্ডা, সেনেগাল, সুদান ও উগান্ডার শাসকেরা।

 

শাসক
দেশ
ক্ষমতা গ্রহণ
শাসনকাল
ক্ষমতা ত্যাগ
মুয়াম্মার গাদ্দাফি
লিবিয়া
১৯৬৯
৪২ বছর
মার্কিন অভিযান (২০১১)
ওমর বঙ্গো
গ্যাবন
১৯৬৭
৪১ বছর
মৃত্যু (২০০৯)
তিওদোরো ওবিয়াং এমবাসোগো
ইকু. গিনি
১৯৭৯
৩৯ বছর
চলমান
হোসে ইদুয়ার্দো দো সান্তোস
অ্যাঙ্গোলা
১৯৭৯
৩৮ বছর
পদত্যাগ (২০১৭)
জিনাসিংবে ইয়াদেমা
টোগো
১৯৬৭
৩৭ বছর
মৃত্যু (২০০৫)
রবার্ট মুগাবে
জিম্বাবুয়ে
১৯৮৭
৩৭ বছর
সেনা অভ্যুত্থান (২০১৭)
পল বাইয়া
ক্যামেরুন
১৯৮২
৩৬ বছর
চলমান
দেনিস সাসৌ এনগুয়েসো
প্রজা. কঙ্গো
১৯৯৭
৩৪ বছর
চলমান
ফেলিক্স হউফোয়েত-বোয়িংনি
আইভরি কোস্ট
১৯৬০
৩৪ বছর
মৃত্যু (১৯৯৩)
যোয়েরি কাগুতা মুসেভেনি
উগান্ডা
১৯৮৬
৩৩ বছর
চলমান
মোবুতু সেসে সেকো
ডিআর কঙ্গো
১৯৬৫
৩১ বছর
বিদ্রোহ (১৯৯৭)
ওমর আল বশির
সুদান
১৯৮৯
৩০
সেনা অভ্যুত্থান (২০১৯)
হুসনি মোবারক
মিসর
১৯৮১
৩০
গণবিক্ষোভ (২০১১)
হাস্টিং বান্দা
মালাউই
১৯৬৬
২৯
গণবিক্ষোভ (১৯৯৪)


আরো সংবাদ

কাশ্মীরে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের লোমহর্ষক বিবরণ সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে : প্রধানমন্ত্রী পেশাজীবীদের সম্মানে প্রধানমন্ত্রীর ইফতার ৬ মাস পর কারামুক্ত বিএনপি নেতা শেখ রবিউল আলম নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে তিন মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন ২ জুলাই ৩ টাকার বালিশ তুলতে খরচ ৫ টাকা? রুমিন ফারহানার প্রার্থিতা বৈধ কৃষকেরা অধিকার থেকে বঞ্চিত : মাওলানা আতাউল্লাহ শাহজালাল বিমানবন্দরে সোয়া ৩ কোটি টাকার স্বর্ণসহ একজন গ্রেফতার পশ্চিম রাজাবাজারের জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি আওয়ামী লীগ-বিএনপির তরুণ নেতাদের

সকল




agario agario - agario