২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ট্রাম্পের গোঁয়ার্তুমিতে অচল যুক্তরাষ্ট্র

-

বিশ্বের একক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিপত্তি ক্রমেই ম্রিয়মান হয়ে আসছে। এর বিপরীতে বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে নতুন শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে চীন ও রাশিয়া। আমেরিকার ক্রমেই কাগুজে বাঘ হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ হলো বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্যবসায়ী অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও সাবেক রিয়েলিটি শো উপস্থাপক ট্রাম্প আমেরিকার হর্তাকর্তা হয়ে ওঠার পর থেকে দেশটি যেন শনির দশায় পড়েছে। তার একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গোটা দেশটির ভিতকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। অভিবাসীবান্দব ও অভিবাসীদের দেশ হিসেবে পরিচিত আমেরিকা এখন অভিবাসী ঠেকাতেই মরিয়া। আর খোদ প্রেসিডেন্টই এটি নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি করার কারণে দেশটিতে এখন চরম অচলাবস্থা চলছে। অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়া নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গোঁয়ার্তুমির কারণে থমকে গেছে আমেরিকা।
ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পের প্রস্তাবিত দেয়াল নির্মাণে বাজেট অনুমোদনে অস্বীকৃতি জানানোর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারে অচলাবস্থা চলছে। গত ২১ ডিসেম্বর মধ্যরাতের পর থেকে শুরু হওয়া এই অচলাবস্থা মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৫তম দিনে পড়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাস সবচেয়ে দীর্ঘ শাটডাউনের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই শাটডাউনের কারণে মার্কিন অর্থনীতি বিশাল ক্ষতির মুখে পড়েছে। আর্থিক বিচারে এ পর্যন্ত ৭০০ কোটি ডলার গচ্ছা গেছে। শিগগির অচলাবস্থা নিরসন না হলে ভবিষ্যতে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। এ তো গেল আর্থিক ক্ষতি। ট্রাম্পের একগুঁয়েমির কারণে দুর্ভোগে পড়েছে জনগণ, প্রশাসনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বেতনহীন হয়ে পড়েছে আমেরিকার প্রায় আট লাখ সরকারি কর্মচারী। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের এক-চতুর্থাংশ বিভাগ ও সংস্থার আট লাখের বেশি কর্মচারী বেতন না পেয়ে মারাত্মক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কারারক্ষী, বিমানবন্দর কর্মী এবং এফবিআই এজেন্টসহ আরো অনেক সরকারি সংস্থার কর্মীরা তাদের নতুন বছরের প্রথম বেতন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা সড়কে নেমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সরকারি কর্মচারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের খালি ‘পে সিøপ’-এর ছবি পোস্ট করেছেন। নিরাপত্তা কর্মীরা বেতন না পাওয়ায় কাজে অংশ নিচ্ছেন না। তাই ব্যস্ততম মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুরো টার্মিনাল বন্ধ করে দিতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আরো অনেকবার শাটডাউনের ঘটনা ঘটলেও কখনো এত দীর্ঘ দিন ধরে তা অব্যাহত ছিল না। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে ২১ দিন অচলাবস্থা বিরাজমান ছিল।
এ ছাড়া বারাক ওবামার আমলে ১৬ দিন, সিনিয়র বুশের আমলে পাঁচ দিন, ডোনাল্ড রিগ্যানের আমলে পৃথক পৃথকভাবে মোট ১৩ দিন, জিমি কার্টারের আমলে ’৭৯ সালে ১১ দিন, ’৭৮ সালে ১৮ দিন, ’৭৭ সালে আট দিন এবং ১২ দিন সরকার অচল ছিল। জেরাল্ড ফোর্ডের আমলেও ১০ দিন শাটডাউনের ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট অযৌক্তিক দাবিতে যেভাবে গোঁ ধরেছেনÑ আগে তা কখনো দেখা যায়নি।
অচলাবস্থা দূর করতে ডেমোক্র্যাটরা তৎপর হয়েছেন। তারা বিভিন্ন বিলের পক্ষে হাউজ প্রতিনিধিদের সমর্থন আদায় করছেন। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা দেয়াল নির্মাণের জন্য ট্রাম্পের দাবির ৫৭০ কোটি ডলার দেবেন না বলে দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন। এদিকে ট্রাম্পও তার কাক্সিক্ষত দেয়াল নির্মাণের বরাদ্দ না দিলে কোনো অর্থ বিলে সই করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের অনড় অবস্থানের কারণে শাটডাউন নিরসনে সর্বশেষ বৈঠকও ব্যর্থ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শাটডাউন নিরসনে প্রথমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার হুমকি দিলেও এখন তা থেকে সরে এসেছেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই নতি শিকার করবেন না বলে জানিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, অচলাবস্থা নিরসনে জরুরি অবস্থা জারির পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আমেরিকার টেলিভিশন ফক্স নিউজের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের অর্থ বরাদ্দের জন্য তিনি জরুরি অবস্থা জারি করছেন না কেন? জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, অর্থ বরাদ্দের জন্য ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের আরো সময় দিতে চান। তিনি বলেন, তারা যদি দায়িত্বশীল আচরণ করতে চান তাহলে আমি তাদের আরো সময় দিতে চাই।
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ প্রায় শেষ হতে যাচ্ছে। আগামী বছর ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনে দাঁড়াতে চান। শুরু থেকেই নানাভাবে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রার্থী হতে চান। সম্প্রতি এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প লিখেছেন, এই অচলাবস্থা নিরসনের পরিকল্পনা তার অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বুঝতে হলে মাথায় রাখতে হবে, ২০১৬ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, নিজেদের সমর্থকদের খুশি করতেই ট্রাম্প দেয়াল নির্মাণের জন্য গোঁ ধরেছেন।
তিনি মনে করছেন, ২০২০ সালে পুনর্নির্বাচিত হতে হলে তাকে অবশ্যই দেয়াল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। ট্রাম্প যতই অচলাবস্থার জন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করুন না কেন, সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে প্রেসিডেন্ট তার প্রশাসন ও মানুষের কথা চিন্তা করছেন না। কুইনিপাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, ভোটারদের ৬২ শতাংশেরই সীমান্ত দেয়াল প্রশ্নে অচলাবস্থার প্রতি সমর্থন নেই। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপসহ নানা বিতর্ক নিয়ে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাম্প আমেরিকায় ইতিহাসেও সরকারে অচলাবস্থা ও দুর্বল সরকারের ব্যাপারে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। আমেরিকার ইতিহাসে তার মতো প্রেসিডেন্ট অতীতে দেখা যায়নি। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্পকে সম্ভবত আরো অসহায় অবস্থায় পড়তে হবে। তার উচিত হবে দেশটির মর্যাদা ও জনগণ এবং প্রশাসনের কথা চিন্তা করে ডেমোক্র্যাটদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা। হ

 


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme