২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সুইডেনের নির্বাচনে কেন দেশ পরিবর্তনের অঙ্গীকার?

-

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সুইডেনকে বিবেচনা করা হতো সবচেয়ে প্রগতিশীল হিসেবে। কারণ তারা শরণার্থী আর উদ্বাস্তু‘দের সাদরে গ্রহণ করত। গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে এ বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আর এ কারণেই দেশটির সাধারণ নির্বাচনে জয়-পরাজয় এখনো নির্ধারণ হয়নি। প্রধান দুটি জোট প্রায় সমান সংখ্যক ভোট পাওয়ায় ঝুলন্ত পার্লামেন্টের পথে দেশটির ভবিষ্যৎ। পরবর্তী সরকারে কে আসছেন, তা জানতে বেশ কিছু সময় অপো করতে হবে।
গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সুইডেনের সাধারণ নির্বাচনে দুই প্রধান জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। শাসক দল বামপন্থী জোট সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। বাম জোট পেয়েছে ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। আর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অভিবাসনবিরোধী কট্টর ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ছাড়া এবার নির্বাচনে ন্যাশনালিস্ট সুইডেন ডেমোক্র্যাটস (এসডি) ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর আগের নির্বাচনের চেয়ে দলটি ১২ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছিল। এসডি দলের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটের ফল দেখে বোঝা যাচ্ছে, অভিবাসন সঙ্কট ইউরোপের এ উদারপন্থী দেশের ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে। ভোটারেরা অভিবাসনবিরোধী দলগুলোর দিকে ঝুঁঁকেছেন। শুধু তা-ই নয়, বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ রয়েছেÑ এমন দলও এবার বেশি ভোট পেয়েছে।
সুইডেনে জোট সরকার গঠনের বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হলেও সরকার গঠনের েেত্র দুটো দলই এসডির সাথে জোট গঠনের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে। যদিও এসডির নেতা বলেছেন, তিনি সব দলের সাথে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। এসডি দলের নেতা জিমি অ্যাকেসন দলের সমাবেশে বলেছেন, ‘পার্লামেন্টে আমরা আমাদের আসন সংখ্যা বাড়াব এবং সামনের সপ্তাহ, মাস ও দিনগুলোয় সুইডেনে যা ঘটবে, তার ওপর আমাদের অপরিসীম প্রভাব থাকবে।’ প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লোফভেনের নেতৃত্বে তার দল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস ও দ্য গ্রিন পার্টি জোটে সমর্থন রয়েছে বাম দলের। অন্য দিকে, চারটি দল নিয়ে গঠিত হয়েছে ডানপন্থী জোট। এই জোটের হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হিসেবে আছেন উলফ ক্রিস্টেরসন। তিনি শাসক জোটকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী লোফভেন দলীয় সমাবেশে বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। বলেছেন, ‘পার্লামেন্ট শুরু হতে আরো দুই সপ্তাহ বাকি। সুইডিশ নির্বাচন পদ্ধতি ও ভোটারদের সম্মানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি নীরবে কাজ করব।’
ভোটের ফলে এবার চমক দেখানো এসডি দলটি ২০১০ সালে প্রথম পার্লামেন্টে প্রবেশ করে। এ দলের সাথে নব্য-নাৎসিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে দলটি তাদের রূপ বদলের চেষ্টা করছে। দলের প্রতীক মশালে (যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রতীকের মতো) পরিবর্তন এনে সুইডেনের পতাকার রঙ হলুদ ও নীল রঙের আদলে করা হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে দলটি কর্মজীবী মানুষদের প্রতিনিধি বললেও তারা এখন আরো নারী ও উচ্চ বেতনের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চাইছে।
দলের নেতা অ্যাকেসন বলেন, বর্ণবাদী আচরণের ব্যাপারে তারা শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করেছেন। এ ধরনের আচরণের জন্য ইতোমধ্যে দল থেকে কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যদিও এখনো দলটির বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণ নিয়ে বেশ কয়েকটি কেলেঙ্কারির ঘটনা রয়েছে। দলের এক প্রার্থী ফেসবুকে একটি গান শেয়ার করেছিলেন, ওই গানের ভাষা ছিল, ‘সুইডিশরা সাদা, আর দেশটি আমাদের’।
সুইডেনের অর্থনীতি এগিয়ে গেলেও অনেক ভোটার আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও কল্যাণমূলক সেবা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ২০১৫ সালে অভিবাসন সঙ্কট শুরু হওয়ার পর দেশটি এ ব্যাপারে চাপের মধ্যে পড়ে। ওই বছর সুইডেন রেকর্ডসংখ্যকÑ এক লাখ ৬৩ হাজার অভিবাসীকে আশ্রয় দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যা অনুসারে এটা ছিল সর্বোচ্চসংখ্যক অভিবাসী গ্রহণ।
সুইডেনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে পার্লামেন্টের আসন বণ্টন করা হয়। তাতে ৩৪৯ আসনের পার্লামেন্টে মধ্য-বামরা ১৪৪ এবং মধ্য-ডান জোট পাবে ১৪২টি আসন।
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস’ ও ‘দ্য সেন্ট্রাল লেফট পার্টি, যারা ৫০ বছর ধরে দেশ চালাচ্ছে; নির্বাচনের আগে তাদের জনসমর্থন ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে (২৬ শতাংশ)।
তবে এখন ভোটের ফলাফলের যা অবস্থা, তাতে একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর জোট হবে সংসদে, যা ক্ষণস্থায়ী হওয়া আশঙ্কায় থাকবে।
সুইডেনের বাইরে অন্যান্য দেশ শরণার্থীবিরোধী মতবাদে বিশ্বাসী ইউরোপীয় দেশগুলো এ নির্বাচনকে একটি কঠিন পরীা হিসেবে নিয়েছিল এ কারণেই। ২০১৫ সালে শরণার্থী সঙ্কট শুরুর পর এটি একটি বড় নির্বাচনকালীন সঙ্কট।
‘দ্য সুইডেন ডেমোক্র্যাটস’ নরডিক দেশগুলোর মতো মতাদর্শে উজ্জীবিত। যেমনÑ ‘নরওয়ে প্রসরেস পার্টি’, ‘দ্য ডেনিশ পিপল পার্টি’ এবং ‘দ্য ফিনস পার্টি’। এ দলগুলো সরকার গঠনে ভূমিকা রেখেছে বিভিন্নভাবে।
শরণার্থী সমস্যাকে সূক্ষ্মভাবে সমাধান করতে চায়, কিন্তু পুরোপুরি শেষ করতে চায় না। বরং তারা সুইডেনের শিথিল বা নীতিহীন অখণ্ড নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং তাদের দাবি এই নীতির ফলে নৃগোষ্ঠী প্রতিবেশীরা পৃথক হচ্ছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে ব্যাপক হারে।
এই দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে শরণার্থী সঙ্কটের সময়কালে, যখন সুইডেন এক লাখ ৬৩ হাজার শরণার্থী আশ্রয় দেয়, যা ছিল সমগ্র ইউরোপীয় দেশের মধ্যে দ্বিতীয় (জার্মানি প্রথম)। এই বিপুল জনসংখ্যার আগমনে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ সবকিছুর ভেতরে বন্ধুকযুদ্ধ বৃদ্ধি পায়, যার নেপথ্যে ছিল বেশির ভাগ অধিবাসী।
যদিও নির্বাচনে চমক দেখানো (এসডি) চায়, শুধু সেসব অধিবাসী শরণার্থী লোকদের যারা তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র দ্বারা উৎপীড়ন-নিপীড়নের শিকার। বলা প্রয়োজন, সুইডেনের প্রতিবেশী দেশ নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক।
এ ছাড়া তাদের কিছু বিরক্তিকর বা সন্দেহজনক বা অসন্তোষজনক কর্মী বা সদস্য আছে, যারা বর্ণবাদী গ্রুপের সাথে জড়িত। যেমনÑ ‘নরডিক রেসিস্ট্যান্স মুভমেন্ট’। ২০১৪ সালে সুইডেনের অন্যান্য দল, যার দুটি দলে দেশটির আসন্ন সঙ্কটে পড়েছে ‘দ্য সোশাল ডেমোক্র্যাটস’ এবং ‘দ্য লাইক মাইন্ডেড গ্রিনস’ ও ‘লেফট পার্টি’ চায় আরো সাব-সাইডেড সামাজিক আবাসন।
ছোট দল এবং তাদের অংশীদাররা চায় বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে স্বাধীনতা এবং বেসরকারি আবাসন প্রকল্পকে উৎসাহ দিতে যারা গরিবদের জন্য কিছু আবাসন তৈরি করতে দেবে। এ ছাড়া সুইডেনে রয়েছে দীর্ঘ দশক পূর্ণ য় হওয়া জরাজীর্ণ স্কুল। বামপন্থীরা চায় এসব স্কুলের পুনর্বিন্যাস এবং বেসরকারি খাতে স্কুলের সুযোগ ছেড়ে দিতে। কিন্তু ডানপন্থীরা চায় সরকারের হাতে তা ধরে রাখতে।
কিন্তু ভোটের আগে ভোটারদের মনে প্রধান শঙ্কা ছিল স্বাস্থ্য খাত নিয়ে। এ সমস্যার কারণে ভোট বিভক্ত হয়েছে বিভিন্ন দলে। যারা অভিবাসী আগমনের বিরুদ্ধে, যেমনÑ ‘এসডি’ পার্টি তাদের সুবিধা হবে এ নির্বাচনে তা জরিপ থেকে আশঙ্কা করা হয়।
কিন্তু দুর্বল সংখ্যালঘিষ্ঠ সরকার সুইডেন রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। আর তাই একটি শক্তিশালী ও উন্নয়নমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণে অন্যান্য রাজনৈতিক দল সব মতবিরোধ উপো করে এ দলের সাথে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে তার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। হ

 


আরো সংবাদ