২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কাশ্মির আবার অগ্নিগর্ভ

-

ভূ-স্বর্গ কাশ্মির স্বাধীনতাকামী মজলুম মানুষের রক্তে এখনো রঞ্জিত হচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের দাবিদার ভারতের জন্য এটা লজ্জার বিষয়। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার কাশ্মিরকে নিয়ে নিত্যনতুন নোংরা খেলা অব্যাহত রেখেছে। মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কাশ্মিরকে নিয়ে তাদের নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের কারণে কাশ্মির আরো অগ্নিগর্ভ হয়েছে। বিজেপি কাশ্মিরের জনসংখ্যার ভারসাম্য পাল্টে দেয়ার লক্ষ্যে কাশ্মিরকে দেয়া ভারতীয় সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতা ও বিশেষ মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার জন্য কিছু দিন আগে সংবিধানের ওই ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে। ওই মামলাকে কেন্দ্র করে কাশ্মির পরিস্থিতি আবার সরগরম হয়ে ওঠে। দমন-পীড়ন ও আইনি মারপ্যাঁচের মাধ্যমে কি কাশ্মিরি স্বাধীনতাকামীদের দমিয়ে রাখা যাবে?
ভারতের সংবিধান কাশ্মিরকে কিছু বিশেষ ক্ষমতা ও মর্যাদাসহকারে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছে। সংবিধানের ৩৭০ ধারায় তা লিপিবদ্ধ রয়েছে। কাশ্মিরের স্থায়ী বাসিন্দা কারাÑ সংবিধানের ৩৫(ক) ধারা তা নির্ধারণের ক্ষমতা দিয়েছে রাজ্যের বিধানসভাকে। একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দারাই বিশেষ অধিকার পাওয়ার যোগ্য। ওই ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির দিল্লি অঞ্চলের নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়। এর পর থেকে কাশ্মিরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
চুরাশি হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত কাশ্মির উপত্যকা। জম্মু, কাশ্মির ও উত্তর এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত এই উপত্যকা ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভূখণ্ড সমুদ্রসীমা থেকে দু’হাজার থেকে ছয় হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এর বেশির ভাগ পাহাড় ভূমির সীমান্ত রেখা ভারত, পাকিস্তান, চীন ও রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত। কাশ্মিরের পূর্ব ও পশ্চিমপ্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে রাভি ও ঝিলাম নদী। ঝিলাম নদী যেন কাশ্মিরের প্রাণধারা। এর গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হলো জম্মু। কাশ্মিরের দৈর্ঘ্য চুরাশি মাইল ও প্রস্থ পঁচিশ থেকে আটাশ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। কাশ্মির মনোরম ঝিল, হ্রদ, ঝর্ণধারা জলপ্রভাতÑ মেঘলা পাহাড় ঘেরা এক অনিন্দ্য সুন্দর উপত্যকা। এখানকার পুষ্পোদ্যান আর মিষ্ট ও স্বচ্ছ পানির ঝিল ও স্বাস্থ্যকর জায়গাগুলো পর্যটকদের গভীরভাবে আকর্ষণ করে। ঝিলাম নদীর দুই প্রান্তে অবস্থিত জনবহুল শহর শ্রীনগর কাশ্মিরের রাজধানী। শ্রীনগর বছরের অর্ধেক সময় ধরে থাকে বরফাচ্ছাদিত।
ভারতের সংবিধানের ৩৫-ক ধারায় বলা হয়েছে, জম্মু ও কাশ্মিরের জন্য বর্তমান অথবা ভবিষ্যতে এমন কোনো আইন করা যাবে না যা মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘন করেÑ যা ‘স্থায়ী অধিবাসী’দের ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথবা সরকারি চাকরি, স্থাবর সম্পত্তি, রাজ্যে বসতি স্থাপন অথবা বৃত্তিপ্রাপ্তির অধিকার বা অন্যভাবে সরকারি সাহায্য যা ‘বিশেষ অধিকার’ হিসেবে দেয়া হয়। এসব বিষয়কে ‘সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর’ লঙ্ঘন হিসেবে ঘোষণা করতে সুপ্রিম কোর্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কেবল সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে এটা প্রয়োগ করা যায় না। সংবিধানের ৩৫-(ক) ধারা ১৯৫৪ সালে সংবিধানে সংযোজন করা হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মিরের স্বায়ত্তশানের ক্ষেত্রে ৩৭০ নম্বর ধারার অধীনে রাষ্ট্রপতির আদেশে ৩৫(ক) ধারাটি সংযোজন করা হয়। ৩৫(ক) ধারার প্রতি হুমকি সৃষ্টি হলে সেটা হবে জম্মু ও কাশ্মিরের বিরুদ্ধে বাইরের হুমকি।
ভারতের সংবিধানে জম্মু ও কাশ্মিরকে যে মর্যাদা দেয়া হয়েছে তা কিছুতেই প্রত্যাহার করা যাবে না। অতীতে কোনো সরকারই এটা নিয়ে কার্যকর কোনো আপত্তি উত্থাপন করেনি। সংবিধানের ৩৫-ক ধারা বাতিল করা সাংবিধানিকভাবে অসম্ভব। কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদাসংবলিত ধারাটি রক্ষার দাবিতে এবং ওই ধারায় রদবদল চেষ্টার প্রতিবাদে কাশ্মিরে কয়েক দিন ধরে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়েছে। স্বাধীনতাকামীরা এখন অনেকটা বেপরোয়া। তারা ভারতের পুলিশ, সেনাবাহিনকে তেমন একটা পরোয়া করছে না। কয়েক দিন আগে স্বাধীনতাকামীরা তাদের গ্রেফতারকৃত আত্মীয়স্বজনকে মুক্ত করতে নতুন পথ বেছে নেয় এবং তাতে তারা সফলও হয়। নতুন কৌশল হিসেবে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাদের পরিবারের অন্তত ৯ সদস্যকে অপহরণ করা হয়। অপরহণকারীরা পুলওয়ামা, অনন্তনাগ ও কুলগ্রাম জেলায় পুলিশ কর্মকর্তাদের বাড়িতে অতর্কিতে হামলা চালায় এবং পুলিশ সদস্যের পরিবারের ৯ জনকে ধরে নিয়ে যায়। পরে পুলিশ গোপনে স্বাধীনতাকামীদের ১২ আত্মীয়কে মুক্তি দিয়েছে। কাশ্মির পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এনডিটিভিকে বলেছেন, অপহৃত পুলিশ পরিবারের সদস্যদের মুক্তি নিশ্চিত করাকে তারা সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন।
পশ্চিমা বিশ্বের সহযোগিতা ও আনুকূল্যে পূর্ব তিমুর স্বাধীনতা অর্জনে সফল হলেও কাশ্মিরের মুসলমানদের দীর্ঘ দিনের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ভারত এখনো দাবিয়ে রেখেছে। কাশ্মিরকে নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে দু’বার যুদ্ধ হয়েছে। ভারতের অবিসংবাদিত নেতা পণ্ডিত জওহর লাল নেহরু জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমরা ঘোষণা করেছি যে, কাশ্মিরের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে সেখানকার জনগণের দ্বারাই নির্ধারিত হবে। এই প্রতিশ্রুতি শুধু কাশ্মিরের জনগণকেই আমরা দিইনি, সারা বিশ্বের কাছে আমাদের এই অঙ্গীকার। আমরা কিছুতেই তা লঙ্ঘন করতে পারি না (অল ইন্ডিয়া রেডিও : ৩ নভেম্বর, ১৯৪৭)।
জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদেও কাশ্মিরে গণভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইস্যুটির মীমাংসার জন্য প্রস্তাব পাস হয়। কিন্তু ভারত তাদের পূর্ব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে এবং ছলেবলে কৌশলে এখনো কাশ্মিরকে করাত্ত করে রেখেছে। এখন তারা তাদেরই সংবিধানে প্রদত্ত কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদাও বাতিল করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, কাশ্মির রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে শুনানি আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। শুনানিকে কেন্দ্র করে সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা কারফিউ এবং স্বাধীনতাকামীদের ডাকা ধর্মঘটে কাশ্মির অচল হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ আদালত এই আদেশ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের অনুরোধে সুপ্রিম কোর্ট মামলার শুনানি জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত রাখে। ভারত সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেনু গোপাল এক আবেদনে বলেন, ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত রাজ্যে পঞ্চায়েত ভোট চলবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুনানি স্থগিত রাখা হোক। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রসহ তিন বিচারপতির বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারের আরজি মেনে নেন।
আগামী বছর ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে বিজেপি আবার ক্ষমতায় এলে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনও বাতিল হয়ে যেতে পারে। বিজেপির এই অন্যায় ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত কাশ্মিরিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে হয়তো চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। কাশ্মিরের জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখলে তার পরিণতি কখনো শুভ হবে না। এ জন্য ভারতকে আরো বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে। হ

 


আরো সংবাদ