১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সিরিয়ার ধ্বংসযজ্ঞে শেষ সংযোজন হবে ইদলিব?

-

সিরিয়ার সরকার ও তার মিত্ররা দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশ দখলের জন্য চূড়ান্ত অভিযান চালাতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। আসাদ সরকার ও তার মিত্র রাশিয়া-ইরান এর মধ্যে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহীদের শেষ অবশিষ্ট ঘাঁটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ইদলিবে বিমান আক্রমণের সূচনা করেছে। তারা এখান থেকে বিদ্রোহী ইসলামিস্টদের বিতাড়িত করতে এই অভিযান শুরু করেছে বলে উল্লেখ করেছে।
ইদলিব অঞ্চলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস, যাদের বেশির ভাগ বেসামরিক নাগরিক। সিরিয়ায় অন্য যুদ্ধত্রে থেকে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। সর্বাত্মক সামরিক হামলার ঘটনায় এসব মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাঁড়াবে কঠিন। এতে এখানে মৃত্যুর সংখ্যাও ব্যাপক হতে পারে।
ইদলিব প্রদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ আগামী শুক্রবার বৈঠক ডেকেছে; সেখানে বিদেশী মিত্রদের সহায়তায় সিরিয়ার ইদলিবে সরকারি বাহিনীর হামলা মানবতা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারেÑ জাতিসঙ্ঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি গত মঙ্গলবার মন্তব্য করেছেন।
জাতিসঙ্ঘে সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত স্টেফান ডি মিস্তুরা একই দিনে বলেছেন, সিরিয়াকে রক্তাক্ত যুদ্ধ থেকে বাঁচাতে পারে যদি রাশিয়ান ও তুর্কি প্রেসিডেন্ট ইদলিবের বিদ্রোহী অঞ্চলের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য অবিলম্বে একে অপরের সাথে কথা বলেন। ডি মিস্তুরা আরো বলেন, রাশিয়া ও তুরস্কের হাতে ২৯ লাখ লোকের ওপর হামলা চালানো বন্ধ করার চাবিকাঠি আছে। তবে মঙ্গলবার চালানো ছয় দফা বিমান হামলায় মনে হচ্ছে, আঙ্কারার সাথে মস্কোর আলোচনা খুব একটা ভালোভাবে এগোচ্ছে না।
গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সিরিয়ার সরকার বলেছে, ইদলিবে হামলা চালানোর ব্যাপারে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপো করতে হতে পারে। এরই মধ্যে রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে তেহরানে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বৈঠক শেষ হবে।
প্রায় আট বছরের পুরনো দ্বন্দ্বে রাশিয়া ও ইরান বাশার আল আসাদের প্রধান সমর্থক। তবে সিরিয়া সীমান্তে ওপারে দায়েশ এবং উত্তর সিরিয়ায় পিকেকে সন্ত্রাসী গ্রুপের সিরিয়ান অধিভুক্ত পিপলস প্রটেকশন ইউনিটের (ইয়েপিজি) বিরুদ্ধে পরিচালিত লড়াইয়ে ফ্রি সিরিয়ান আর্মিকে (এফএসএ) সমর্থন করছে প্রতিবেশী তুরস্ক।
ইদলিব পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান জানিয়েছেন, সিরীয় সঙ্ঘাত নিয়ে আলোচনা চলছে। ইদলিবে সামরিক অভিযানে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে। তিনি জানান, ইদলিবের বৈঠকের পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সিরিয়ায় তাল রিফাত এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিরিয়ার মানবিজ নিয়েও আলোচনা চলছে। তিনি ইরানের রাজধানী তেহরানে ৭ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত ত্রিপীয় শীর্ষ বৈঠক থেকে ইতিবাচক ফল আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এ বৈঠক করবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তেহরান সামিট আসাদ প্রশাসনের আগ্রাসনকে বাধাগ্রস্ত করবে। সিরিয়ার পগুলোর সমর্থক তিন দেশ তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার ইস্তাম্বুলে শেষ ত্রিপীয় বৈঠকের সময় তেহরানে পরের শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়। ইস্তাম্বুলের আগের বৈঠকটি হয়েছিল রাশিয়ার পর্যটন শহর সোচিতে।
২০১৭ সালের মে মাসে আস্তানায় শান্তি আলোচনার সময় তিনটি গ্যারান্টি দানকারী দেশ ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়া ইদলিব, আলেপ্পো, লাতাকিয়া ও হামা অঞ্চলে কয়েকটি ‘উত্তেজনা প্রশমন’ জোন স্থাপন করতে সম্মত হয়। সেখানে স্থাপিত পর্যবেণ পোস্টগুলো ‘উত্তেজনা প্রশমন অঞ্চলে’ বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা, পরিস্থিতি নিরীণ ও শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে। তারা সেখানকার মানুষকে প্রয়োজনীয় মানবিক সাহায্য প্রদান করে এবং বাস্তুচ্যুত লোকের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
ইদলিবে যেকোনো সর্বাত্মক আক্রমণ বিধ্বংসী মানবিক পরিণতি সৃষ্টি করতে পারে। তুরস্ক ও ইউরোপ রাশিয়াকে এ ধরনের আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধে প্রভাবিত করতে হবে। আর তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরানের একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার মাধ্যমেই সেটি সম্ভব হবে। রাশিয়ার হেমিমিম বিমানঘাঁটিতে বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলা বন্ধ করা, নিয়মিত বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য মহাসড়ক খুলে দেয়া এবং ইদলিবে সরকারি বাহিনীর হামলা বন্ধ করার ব্যাপারে সাময়িক সমঝোতা এখানকার সমস্যা সমাধানের উপায় বের করার একটি পথ তৈরি করেছিল। এখন পশ্চিমা দেশগুলোর মস্কোর কাছে স্পষ্ট করে দেয়া উচিত যে, ইদলিবের মানবিক বিপর্যয়ের অর্থ হবে, তারা রাজনৈতিক সমাধানের জন্য এর পর রাশিয়ার সাথে কাজ করতে পারবে না অথবা দামাস্কাসের সাথে পুনঃসংশ্লিষ্ট হওয়াও তাদের পক্ষে আর সম্ভব হবে না। তাদের আরো জোর দিতে হবে, তারা ইদলিবের বেসামরিক জনগণের মৃতদেহের ওপর সিরিয়ার পুনর্নির্মাণকাজে শরিক হবে না।
২০১৭ সালের মে থেকে এক বছর ধরে ইদলিব একটি আংশিক যুদ্ধবিরতি দ্বারা সুরতি হয়ে আসছে। তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়া এই ‘উত্তেজনা প্রশমন’ চুক্তি অনুসারে যুদ্ধবিরতি চলে আসছিল। তবে এটি এখন স্পষ্ট নয় যে, ইদলিবে নতুন হামলার তোড়জোড় যে করা হচ্ছে, তা বিদ্রোহীদের সমগ্র এলাকাকে পুনর্দখলের জন্য করা হচ্ছেÑ নাকি তুরস্ককে একটি সমঝোতার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য করা হচ্ছে; যেখানে রাশিয়ার ন্যূনতম চাহিদা পূরণ হবে। যার মধ্যে থাকতে পারে বিদ্রোহীদের এলাকা পরিত্যাগ করার জন্য তুর্কি প্রচেষ্টা জোরদার করা, রাশিয়ার বিমানঘাঁটিতে বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলা বন্ধ করা এবং ইদলিবের প্রধান মহাসড়কে সরকারের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা। তুরস্ক নিজেও ইদলিবে কট্টর জিহাদিদের প্রভাব কম দেখতে চাইতে পারে। অবশ্য তুরস্ক যদি ইদলিবের জিহাদিদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করে, তবে তার সীমান্তবর্তী তুর্কি শহরগুলোতে কট্টরপন্থীদের অভিযানে অরাজক অবস্থা দেখা দিতে পারে। ইদলিবে সরকারি বাহিনীর আক্রমণের হুমকি এমনকি তা যদি সীমিত অভিযানও হয়, তবে তা তুরস্কের হাত জোরদার করতে পারে। যদিও সর্বাত্মক সামরিক অভিযান চললে তা তুরস্কের জন্য দ্বিতীয় দুঃস্বপ্নের দৃশ্যকল্প সৃষ্টি করবে। সেটিকে তার প্রতিরোধ করতে হবে। এই দৃশ্যকল্পে তুরস্কে নতুন করে ব্যাপক সংখ্যায় সিরীয় শরণার্থীর প্রবাহ সৃষ্টি হবে, যার মধ্যে কট্টর বিদ্রোহীরাও থাকতে পারে।
রাশিয়া অবশ্য তুরস্কের সাথে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা বা সমাধান কামনা করতে পারে। মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যে চলমান আলোচনায় উভয় প একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প খুঁজতে পারে। কারণ, মস্কো জানে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক মূল্য ছাড়াই একটি সর্বাত্মক সরকারি অভিযান সম্পন্ন করা যাবে না। এটি ঠিক যে, সিরিয়া সরকারের ইদলিব পুনর্দখল কার্যকরভাবে দেশের সব বিদ্রোহের ওপর তার বিজয় চিহ্নিত করবে। কিন্তু রাশিয়া ২০১৫ সালে যে সামরিক হস্তপে করে, তাতে এর বাইরেও মস্কোর একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। রাশিয়া শুধু সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর সামরিক জয় নিশ্চিত করতে চায়নি, একই সাথে যুদ্ধ শেষে আন্তর্জাতিক পুনঃবৈধতার মাধ্যমে এ অঞ্চলে তার পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। সেই সাথে পশ্চিমা পুনর্নির্মাণ তহবিলের মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও কামনা করেছে।
এসব ল্য অর্জনের জন্য তুরস্ককে সাথে রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজন রাশিয়ার। এ জন্য আস্তানায় শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু করার ব্যাপারে রাশিয়ার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তুর্কি কর্মকর্তারা এবার সতর্ক করে বলেছেন, ইদলিব আক্রমণ আস্তানা প্রক্রিয়াটিকে আঘাত করবে। আস্তানা প্রক্রিয়া ভেঙে গেলে অথবা আঙ্কারা রাশিয়ার সাথে সহযোগিতা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিলে, সেটি সিরিয়ায় রাশিয়ার রাজনৈতিক প্রকল্প তিগ্রস্ত করবে।
অনুরূপভাবে, ইদলিবের সরকারি বাহিনীর বিজয় অনেক বেসামরিক মানুষ হত্যার কারণ হবে এবং শত শত এলাকা তাতে ধ্বংস হবে এবং লাখ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হবে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোকেও আঘাত করবে। রাশিয়া সিরিয়ার আলেপ্পো বা অন্য কোথাও সরকারপক্ষের নির্মম জয় কামনা করেনি, বরং বাস্তবতাকে সামনে রেখে অন্যান্য দেশের সাথে সমঝোতায় এসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতি অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে ইদলিব অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সিরিয়ায় রাশিয়ার জন্য যুদ্ধের এবং এর সাথে যুক্ত সহিংসতার কারণে দুর্দশা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটা প্রয়োজন। এ জন্য রাশিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনার অচলাবস্থা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেবে।
ইদলিবের জন্য কোনো সুস্পষ্ট সমাধান আছেÑ এমনটি এখনো দেখা যাচ্ছে না। সেখানকার বৃহৎসংখ্যক বিদ্রোহীকে উৎখাত করার জন্য অগ্রহণযোগ্য মাত্রার য়তি কোনো সমাধান হতে পারে না। সরকারি বাহিনী ও তার মিত্রদের জন্য ইদলিবের জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশকে হত্যা করা অথবা রাশিয়ার আলোচনার অংশীদার তুরস্ককে অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়।
দামাস্কাস এবং তার মিত্রদের জন্য ইদলিবকে নিছক সামরিক বিজয়ের দৃষ্টিতে দেখা কঠিন। সেখানে সর্বাত্মক সামরিক সহায়তা দিয়ে নির্মম যুদ্ধ জয় সিরিয়ায় রাশিয়ার ল্েযর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। এর সবচেয়ে ভালো বিকল্প হলো আস্তানা প্রক্রিয়ার তিন গ্যারান্টিদাতা দেশের আলোচনা প্রক্রিয়ায় এর সমাধান খোঁজা, যেটি শুক্রবারে তেহরানে তিন নেতার শীর্ষ সম্মেলনে অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এর বিকল্প হবে সব পরে জন্য অনাহূত মূল্যদায়ক। এ কারণে তুরস্ক ও ইউরোপীয় দেশগুলোর রাশিয়াকে বলা উচিত যে, তারা যেন সিরিয়ার ইদলিব দখল করে আসাদ শাসনের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে আপস করে। সর্বাত্মক অভিযানের পরিবর্তে তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরানকে বিদ্রোহীদের নিরপেকরণের কম বিপজ্জনক উপায় খুঁজতে আলোচনার সূচনা করতে হবে। হ


আরো সংবাদ

মাশরাফিদের এবারের টার্গেট আফগানিস্তান নির্বাচনকালীন সরকারে পার্লামেন্টের বাইরের কেউ থাকবে না : কাদের গৃহবধূকে ধর্ষণের পর ভিডিও ছড়িয়ে সাবেক ইউপি সদস্য গ্রেফতার সাংবাদিকতা পেশাকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যবহারে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান শ্রীমঙ্গলে সড়কে গাছ ফেলে ডাকাতি বিশাল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেই ইভিএম প্রকল্প : রিজভী পাকিস্তানের চেয়ে ভারতকে কেন বেশি সুবিধা দিচ্ছে আইসিসি? কুলাউড়ায় নিখোঁজের ১০ ঘণ্টা পর যুবদল নেতার লাশ উদ্ধার মোহাম্মাদ আমিরকে ২৫টি প্রশ্ন ও উত্তর খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসা দাবিতে ঢাবি সাদাদলের মানববন্ধন সিদ্ধিরগঞ্জে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

সকল