২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা

-

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে টালমাটাল অবস্থার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। সরকারের তিন বছরের মাথায় দলীয় অভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেন টার্নবুল। টার্নবুলের মন্ত্রিসভার সদস্যÑ অর্থমন্ত্রী স্কট মরিসন দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান দল লিবারেল পার্টি নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মরিসনকে বেছে নিয়েছে। কয়েক বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ১১ বছরের মধ্যে মরিসন হলেন দেশটির সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। আর দলের মধ্যে সঙ্ঘটিত বিদ্রোহের কারণে এক দশকের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হলেন ম্যালকম ট্রার্নবুল। ট্রার্নবুলের বিদায় ও মরিসনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার চলমান চরম রাজনৈতিক সঙ্কটের কি অবসান হবে?
অস্ট্রেলিয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক সঙ্কট শুরু হয় আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে। টার্নবুলের উদার নীতির বিরুদ্ধে দলের ভেতর থেকে বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে। নেতৃত্বের কোন্দলে ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির রক্ষণশীল সদস্যদের তোপের মুখে পড়েন টার্নবুল। আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনমত জরিপে বিরোধী দল লেবার পার্টির তুলনায় ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি পিছিয়ে থাকায় ক্ষমতাসীন দলে টার্নবুলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ট্রার্নবুলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডাটন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। গত ২১ আগস্ট পিটার ডাউন দলে এবং সরকারে টার্নবুলের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করলে সঙ্কট শুরু হয়। ২১ আগস্ট অনুষ্ঠিত পার্টির মধ্যকার ভোটাভুটিতে ১৩ ভোটের ব্যবধানে টার্নবুলের কাছে হেরে যান পিটার ডাটন। এরপর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ডাটনের পথ অনুসরণ করে ১৩ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করলে ২২ আগস্ট সরকারের কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়।
দল ও সরকারের এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সহকর্মীদের একটি অংশের সমর্থন নিয়ে ডাটন আবারো টার্নবুলকে চ্যালেঞ্জ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে টার্নবুল ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী পদ ধরে রাখতে আর কোনো চ্যালেঞ্জে যাবেন না তিনি। এই সময় ডাটনের বিরুদ্ধে নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দেন টার্নবুলের মিত্র ও দলের অর্থ সম্পাদক মরিসন। মরিসনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপ। মরিসন ৪৫-৪০ ভোটে ডাটনকে হারিয়ে দলের নতুন নেতা নির্বাচিত হন। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে জুলি বিশপ পদত্যাগ করেন।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের জীবনযাপন, সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবন মানের দিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে জীবন ধারণের জন্য বিশ্বে অস্ট্রেলিয়া হচ্ছে অন্যতম সর্বোত্তম দেশ। বিশাল ভূখণ্ডবিশিষ্ট এ দেশটি হচ্ছে ভূখণ্ডগত দিক দিয়ে ষষ্ঠ বৃহত্তম দেশ। তবে দেশটির জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় অঞ্চলে বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস। দেশটির জনসংখ্যা ২২ দশমিক ৯ মিলিয়ন এবং মানুষের গড় বয়স হচ্ছে ৮০ বছর।
তীব্র রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন একজন সোস্যাল কনজারভেটিভ। তিনি কটুভাষী ও বাস্তববাদী রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। ৫০ বছর বয়সী মরিসন ধর্মীয়ভাবে একজন কনজারভেটিভ। তিনি পার্লামেন্টে বিতর্কের সময় সমকামী বিয়ে বিলের বিরোধিতা করেন এবং বিলের ওপর ভোটাভুটির সময় অনুপস্থিত ছিলেন। রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তিনি স্পষ্টত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। তিনি গভীর ঐতিহ্যের ধারক সিডনির প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি দেশটির অভিবাসন মন্ত্রীর দািয়ত্ব পালনকালে অন্যদের দ্বারা সমালোচিত হলেও অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নের জন্য ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে প্রশংসিত হন। তিনি দেশটির অর্থমন্ত্রী হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দেন। তার সহকর্মী এবং বিরোধী দলীয় সদস্যরাও তার কাজের প্রশংসা করেন। তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তার সন্তান। তিনি একুশ বছর বয়সে বিয়ে করেন। তাদের দু’টি সন্তান আছে। তিনি সব সময় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং লিবারেল পার্টর সাবেক স্টেট ডিরেক্টর ছিলেন। মরিসন ২০০৭ সালে ফেডারেল অফিসে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে ট্যুরিজম অস্ট্রেলিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। মরিসন-ম্যালকম টার্নবুলের একজন প্রধান সমর্থক। অস্ট্রেলিয়ার কুখ্যাত রাজনৈতিক যুদ্ধের সর্বশেষ ধাপে জয়লাভের মাধ্যমে তিনি ১১ বছরের মধ্যে দেশটির ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করলেন। তিনি কতদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন তা এখনো কেউ বলতে পারেন না।
বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশে চার অথবা পাঁচ বছর মেয়াদের পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছেÑ অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি তিন বছর পর অবশ্যই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের মতেÑ যাই হোক না কেন, ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সরকারের মেয়াদ কমতে কমতে গড়ে প্রায় ৩২ মাসে এসে দাঁড়িয়েছে। সমালোচকদের মতে এর অর্থ হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচন যেন সব সময় খুব কাছে থেকে দেখা যায়। এতে এমপিরা তাদের স্বল্পমেয়াদের রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুতি নেবেন। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকায় ইসরাইলে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার সাবেক রাষ্ট্রদূত ডেভি শর্মা লিখেছেন : ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল তার চার বছর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে চারজন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তারা হলেনÑ জুলিয়া গিলার্ড, কেভিন রাড, টনি অ্যাবেটে এবং টার্নবুল। এদের মধ্যে দু’জন মিসেস গিলার্ড এবং মি. অ্যাবোর্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অপসারিত হন। মি. শর্মা বলেনÑ এটা ‘কাঠামোগত ত্রুটি’। তিনি সংবিধান পরিবর্তন করার আহ্বান জানান। তিনি পত্রিকাটিতে লিখেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদরা নির্বাচকমণ্ডলীর অনুমোদন ছাড়াই নিজেদের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীদের সরিয়ে দেন। এতে নিয়ম-শৃঙ্খলা বিঘিœত হয়Ñ এতে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ নাইন নিউজের ক্রিস ওহলম্যান বলেন, ‘সিনিয়র রাজনীতিবিদেরা তাকে বলেছেন, নিউজ করপোরেশন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ উসকে দিয়েছিল। লিবারেল পার্টির রক্ষণশীলেরা এ জন্য দায়ী। তিনি বলেন, তারা কেবল ভাষ্যকার নন, তারা হচ্ছেন খেলোয়াড়। তারা সীমা অতিক্রম করেছেন। তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া বিপজ্জনকপর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে।
একটি দেশের স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক উন্নতির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে এ ধরনের অস্থিরতা কাম্য নয়। আগামী বছরই দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি যেভাবে টালমাটাল হয়ে উঠেছে তাতে নতুন প্রধানমন্ত্রী কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনÑ তাও দেখার বিষয়। হ

 


আরো সংবাদ