২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সৌদি-কানাডা সম্পর্কে টানাপড়েন

-

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্যের জের ধরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে সৌদি আরব ও কানাডার মধ্যকার সম্পর্কে। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টুইটার পোস্টের জের ধরে রিয়াদ এতটাই চটেছে যে, কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে নিজ দেশের রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে আনা ও বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত করেছে কানাডার সাথে। ‘ছোট’ ঘটনায় এত কঠিন প্রতিক্রিয়া কেন দেখিয়েছে সৌদি আরব সেটি নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। মনে করা হচ্ছে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যে দাপুটে পররাষ্ট্র নীতির পথে চলতে শুরু করেছেন এটি তারই ধারবাহিকতা। আবার এমনটাও ভাবা হচ্ছে যে, কানাডার বিরুদ্ধে এত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সৌদি আরব মূলত অন্য দেশগুলোকে শক্ত বার্তা দিতে চাইছে যেÑ তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো চলবে না।
দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নেই এমন দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো হরহামেশাই মন্তব্য করে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও বিষয়টিকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না। বেশির ভাগ সময়ই শুনেও না শোনার ভান করে, কখনো বা পাল্টা বক্তব্য দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়। এসব বক্তব্যকে পাত্তা না দিয়েই তারা চলতে থাকে তাদের নিজস্ব গতিতে।
তাই হঠাৎ করেই সৌদি আরবের এবারের ঘটনাটি অস্বাভাবিক লাগছে। কানাডার পক্ষ থেকে সৌদি আরবের ‘মানবাধিকার কর্মীদের’ মুক্তি চাওয়ায় সৌদি আরব শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এতটাই যে, দুই দেশের সম্পর্কই পড়ে গেছে অনিশ্চয়তায়। কূটনীতিক বহিষ্কার এমনকি তাও ২৪ ঘণ্টার নোটিশে, কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সৌদি ছাত্রদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। কানাডার সাথে নতুন কোনো বাণিজ্য বা বিনিয়োগ শুরু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিয়াদ কর্তৃপক্ষ। সৌদি আরব বলছে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো সহ্য করবে না তারা। বিপরীতে কানাডা বলছে, সারা বিশ্বের যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হোক তারা তার প্রতিবাদ করবে।
নাম উল্লেখ না করলেও সৌদি মানবাধিকার কর্মী সামার বাদাবির গ্রেফতারের পরই কানাডা এই দাবি জানিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত ৩০ জুলাই সৌদি আরবে পুরুষ অভিভাবকত্ব আইনের বিরোধী হিসেবে পরিচিত সামার বাদাবিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে বাদাবি প্রশংসিত হলেও সৌদি আরবে তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। অনেক দিন ধরেই পুরুষ অভিভাবকত্ব আইনের বিরোধিতা করে আসছেন এই নারী।
সাম্প্রতিক সময়ে বাদাবি তার ভাইয়ের মুক্তির দাবিতে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। ইসলাম অবমাননার মামলায় ২০১৪ সালে বাদাবির ভাই রাইফের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়। ২০১২ সালে রাইফ গ্রেফতারের পরই তার তিন সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী ইনসাফ হায়দার কানাডায় পালিয়ে যান। এ বছরের ১ জুলাই কানাডার জাতীয় দিবসে তাদের নাগরিকত্ব প্রদান করেছে কানাডার সরকার। এখানেই সামার বাদাবির পরিবারের সাথে কানাডার সম্পর্কের অতীত। এ কারণেই তারা সামার বাদাবির মুক্তির বিষয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু তাদের এই বিষয়টি ভালোভাবে নেননি সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। যার ফলাফল দুই দেশের সম্পর্কের এই অচলাবস্থা।
কানাডার প্রতি সৌদি আররে ক্ষোভের আরো কারণ আছে। প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের সময় কানাডা থেকে কিছু হালকা সামরিক যান ক্রয় করার চুক্তি করে সৌদি আরব। জাস্টিন ট্রুডোর বর্তমান সরকারও সেই চুক্তিটি বহাল রাখে। কিন্তু কানাডার মিডিয়ায় বিষয়টির ব্যাপক সমালোচনা হয়। বলা হয়, এসব যুদ্ধোপকরণ ব্যবহৃত হবে ইয়েমেন ও নিজ দেশের ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টিতে ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা সৌদি আরবের।
সৌদি আরবের বর্তমান প্রশাসন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দায়িত্বে আসার পর দেশটিতে তিনি ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। নারীদের ড্রাইভিং, স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার অনুমতি, সিনেমা হল চালুর মতো অনেক উদার নীতি গ্রহণ করেছেন। অর্থনীতিতে নিয়েছেন ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম। তেলনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থনৈতিক উপায় খুঁজছেন বিন সালমান। এ বিষয়গুলো অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। অনেকেই বলছেন, বিন সালমানের হাত ধরে নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, সংস্কারই যেহেতু চলছে তাহলে সমালোচনা সহ্য করা হবে না কেন?
তবে এই সময়ে পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক কঠোরতা অবলম্বন করেছে দেশটি। একটি সংবাদের জের ধরে কাতারের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে। ইয়েমেনে হাউছি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে এবং এখনো দেশটিতে চলছে যুদ্ধ। ইরানের বিরুদ্ধেও আরো কঠোর হয়েছে সৌদি আরবের নীতি। এসব কর্মকাণ্ডের ধারবাহিকতা হিসেবেই কানাডার সাথে এমন কঠিন প্রতিক্রিয়া দেখানোর বিষয়টিকে ধরা যায়। এর মাধ্যমে হয়তো বিন সালমান আমেরিকা-ইউরোপের রাজতন্ত্রের সমালোচকদের বোঝাতে চাইছেন তার দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াটা তিনি ভালোভাবে নেবেন না। এশিয়া ও আফ্রিকার বৈরী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিও তার একটি বার্তা রয়েছে এই ঘটনার মধ্যে।
এমনিতে কানাডার সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক খুব বেশি গভীর নয়। দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে সামান্যই বলা চলে। কানাডার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দিনে যে বাণ্যিজ্যিক লেনদেন হয়, সৌদি আরবের সাথে তা পুরো বছরের লেনদেন। অন্য খাতেও খুব জোরালো কোনো বিষয় নেই। তাই কানাডার বিষয়টি ‘ঝিকে মেরে বৌকে বোঝানো’র মতো ভাবছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার স্কুল অব পাবলিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর থমাস জুনিয়াও লিখেছেন, ‘এটি শুধু কানাডার বিষয় নয়। সবাইকে এই বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, রিয়াদ কোনো সমালোচনা সহ্য করবে না। এটি ইউরোপীয়দের জন্যও বার্তা যে, সমালোচনা করলে তোমাদেরও ছাড় দেয়া হবে না’।
সৌদি আরব নতুন যুবরাজের মাধ্যমে যে সংস্কারের যুগে প্রবেশ করেছে তা সারা বিশ্বে সাড়া ফেলেছে। তবে পাশাপাশি তারা হয়তো দেখাতে চাইছে যে, আমরা দুর্বল নই। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সংস্কার চলবে, তবে সেটি বাইরের চাপে নয়। এর মধ্য দিয়ে হয়তো যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তার দৃঢ় মানসিকতারই জানান দিতে চান বহির্বিশ্বে। হ

 


আরো সংবাদ