২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রাশিয়া-আমেরিকা-ন্যাটো কার অবস্থান কোথায়?

-

ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে জিডিপির চার ভাগ অর্থ জোটটির নিরাপত্তা বাজেট হিসেবে আদায়ের প্রতিশ্রুতি পেয়ে খুশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবশ্য ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো বলেছেন, তিনি এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেননি। আর চোখের সামনে আফগানিস্তানে ১৭ বছর ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করার পর কোনো ফল লাভ হয়নি। ন্যাটো সদস্যরা আর কোনো দেশে সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি বা অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধিতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন কেন? শুধু মার্কিন স্বার্থে? এমনিতে বাণিজ্য যুদ্ধের ডঙ্কায় অর্থনৈতিক মন্দার ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে, এরপর নতুন করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা। তাও এ অবরোধ করা হচ্ছে তখন যখন সবার অভিযোগ রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের প্রেমে মজেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন সমালোচনা শুনতে হচ্ছে। সুতরাং ব্রাসেলসে ন্যাটো সামিট থেকে ব্রিটেন সফর, এ সফরের বিরুদ্ধে ব্রিটেনজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ, এরপর হেলসিংকিতে ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক কী ফলাফল বয়ে আনছে? এ প্রশ্নের উত্তর বা প্রভাব ন্যাটোর ওপরও এসে পড়ছে। ন্যাটো কী তাহলে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে থাকবে? হেলসিংকিতে পুতিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন ট্রাম্প। এ ধরনের অভিব্যক্তি নিয়ে ট্রাম্প ন্যাটোর সংস্কারের জন্য যতই আহ্বান জানান, ন্যাটোর ২৮টি দেশ এখন তাকেই সবচেয়ে বড় সঙ্কট মনে করছে।
ন্যাটোর প্রভাবশালী সদস্য দেশ তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে বড় একটি চির আস্তে আস্তে ফাটলে পরিণত হয়েছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো একে অপরের প্রতি যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে পারস্পরিক সহমর্মিতা দেখানোর কথা তা ন্যাটো সামিটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পাশাপাশি দাঁড়ান ছবিতে তার বিন্দুমাত্র অভিব্যক্তি দেখা যায়নি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার দেশ ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে জনসমাবেশে বলেছেন, অক্টোপাসের হাত ভেঙে দেয়া হয়েছে। এরদোগানের এক সময়ের রাজনৈতিক গুরু ফেতুল্লাহ গুলেনকে তিনি অভ্যুত্থানের পেছনে কলকাঠি নাড়ার জন্য দায়ী করলেও গুলেন তা অস্বীকার করে আসছেন। কিন্তু তুরস্কে এরদোগানের সরকার ফেলে দেয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত আছে এমন অভিযোগ জোড়ালোভাবেই রয়েছে। একই সাথে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র এস-৪০০ যাতে তুরস্ক না কেনে সে জন্য চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি দেশটির কাছে প্যাট্রিয়ট বেচতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বিষয়টি নিয়ে তুরস্কের সাথে আলোচনা করছে। এর আগে তুরস্ক যখন রাশিয়া থেকে এস-৪০০ পেণাস্ত্র প্রতিরা ব্যবস্থা কেনার জন্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে তখন যুক্তরাষ্ট্রের প থেকে তা বানচালের চেষ্টা করা হয়েছে। তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিমান বিক্রি না করারও হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সদস্য দেশ বলছে রাশিয়া থেকে তুরস্ক এস-৪০০ কিনলে ন্যাটোর ভেতরে অচলাবস্থা দেখা দেবে।
এ দিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্পর্ক নিয়ে মার্কিন শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও গোয়েন্দারা প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলেছেন। হেলসিংকি বৈঠকের পর বলা হচ্ছে ট্রাম্প দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহের সাথে তুলনীয়। তো দেশের মধ্যে এই যদি হয় ট্রাম্পের অবস্থা তাহলে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যকে কেন গুরুত্ব দেবেন। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ প্রশ্নে মার্কিন গোয়েন্দা দফতরের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট পুতিনের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তোপের মুখে পড়েছেন। সিআইএ’র এক সাবেক প্রধান বলেছেন, ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্য শুধু লজ্জাজনকই নয়, রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহ। আরেক রিপাবলিকান সিনেটর বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গভীর বেদনাময় দিন। ব্রাসেলসে ন্যাটোর বৈঠক কিংবা লন্ডনে ন্যাটোর আরেক প্রভাবশালী সদস্য দেশ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সাথে ট্রাম্পের বৈঠক নিয়ে কম বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। নিজের গোয়েন্দা দফতর ও পুতিনের মধ্যে তিনি কাকে অধিক বিশ্বাস করেন, এমন এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, রুশ প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত জোরালো ভাষায় কোনো রকম হস্তেেপর কথা অস্বীকার করেছেন। তার এ কথায় বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। তিনি বুঝতে পারেন না, রাশিয়া কেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কম্পিউটার ব্যবস্থা থেকে তথ্য চুরি করতে যাবে।
রুশ হস্তপে প্রশ্নে তদন্তরত বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট ম্যুলার তথ্য-প্রমাণসহ ১২ জন রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র উত্থাপন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাট ছাড়াও তার নিজের রিপাবলিকান পার্টির নেতারাও ট্রাম্পের এই বক্তব্য তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। আমেরিকার ইতিহাসে এর আগে অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট নিজ সরকারের বদলে তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীকে বেশি বিশ্বাস করেননি। সিআইএ’র সাবেক প্রধান জন ব্রেনন ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তার অভিশংসনের দাবি তুলেছেন। রিপাবলিকান নেতা সিনেটর জন ম্যাককেইন রোগশয্যা থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের বক্তব্যকে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্টের জন্য ইতিহাসে সবচেয়ে ‘জঘন্য’ বলে মন্তব্য করেন। এর আগে আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট একজন একনায়কের সামনে এমন নতজানু ব্যবহার করেনি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের খ্যাতনামা ভাষ্যকার টমাস ফ্রিডম্যান সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, ট্রাম্প সম্ভবত একজন ‘রুশ স্পাই’, এ ছাড়া তার ব্যবহারের অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।
অর্থাৎ ট্রাম্পের এ ধরনের রাষ্ট্রনায়কোচিত অবস্থানের পরিবর্তে আত্মকেন্দ্রিক যে ব্যবহার এবং যখন যা খুশি বলা তা ন্যাটো সদস্য দেশগুলো মোটেই পছন্দ করছেন না। ট্রাম্পের নিজের দেশের ভেতরই কেউ কেউ সন্দেহ করেছেন, ২০১৩ সালে মস্কোতে রাত্রিবাসের সময় ট্রাম্প রুশ পতিতাদের কাজে লাগান বলে যে অভিযোগ রয়েছে, পুতিনের হাতে সম্ভবত সেই ঘটনার প্রমাণ থাকতে পারে বলে ট্রাম্প পুতিনের কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে রয়েছেন। অথচ কিছু দিন আগেও ট্রাম্প জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সাথে কঠোর সমালোচনা করেছেন, পুতিনের ব্যাপারে তেমন সমালোচনার সুযোগ পেয়েও পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। তাই ট্রাম্পকে নিয়ে শুধু তার দেশে নয় ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস ও অনাস্থা রয়েছে ন্যাটোতেও। এর বিপরীতে ন্যাটো তাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য সঙ্কটজনক হয়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ন্যাটোর অন্যান্য নেতৃবৃন্দ সাবধানতা অবলম্বন করতে চান কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্য ও আহ্বানের মধ্যে যথেষ্ট বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন না। ন্যাটোকে সংস্কার করার কথা বললেও ট্রাম্প তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আস্থা সঙ্কটে পড়েছেন। ন্যাটো সামরিক জোটের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে সদস্য দেশগুলো রাজি হয়েছে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন তা নাকচ করেছে ইতালি ও ফ্রান্স। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা দাবি করছেন তা সঠিক নয়। বর্তমান ব্যয়ের চেয়ে ন্যাটো এই মুহূর্তে সামরিক বাজেট বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা করছে না। ট্রাম্পের ন্যাটো বাজেট বাড়ানোর ব্যাপারে ম্যাঁক্রো বলেন, আমি জানি না যে, এটি কত ভালো পদপে এবং আমাদের সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য কতটা দরকার।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপে কোন্তেও বলেছেন, তার দেশ প্রতিশ্রুতিমতো অর্থ দিয়ে যাচ্ছে এবং ব্যয় বাড়নোর বিষয়ে তাকে কিছু বলা হয়নি। ফলে নতুন বাড়তি ব্যয়ের প্রশ্নও নেই। আমার কান কখনো শোনেনি যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটো জোট ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন। ফলে আমি খবরটি নিশ্চিত করতে পারছি না। যদি সম্মেলনের অবকাশে তিনি এমন কোনো কিছু বলে থাকেন তাহলে আমি তা জানি না। এদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা অভিযোগ তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সামরিক জোট হচ্ছে তালেবানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ন্যাটো সেনাদের সক্রিয় উপস্থিতির পরও এদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে আফগানিস্তানে মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও চোরাচালান মারাত্মক বেড়েছে। উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে রাশিয়া সহযোগিতা দিচ্ছে বলে মার্কিন সরকারের অভিযোগের জবাব এভাবেই দেন জাখারোভা। জাখারোভা বলেন, মার্কিন কংগ্রেসের বিশেষ কমিটির তদন্তে এরই মধ্যে তলেবানের প্রতি মার্কিন সেনাদের পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ মিলেছে। এর উদাহরণ হচ্ছেÑ বিভিন্ন রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে, যেসব মার্কিন অস্ত্র ‘চুরি’ হয়েছে অথবা ‘ভুল হাতে’ পড়েছে তা মূলত তালেবানের হাতেই পড়েছে। আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই গত নভেম্বরে সরাসরি বলেছিলেন, তার দেশে মার্কিন সরকার আইএস সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা দিচ্ছে। আলজাজিরা টেলিভিশনকে দেয়া সাাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমার দৃষ্টিতে মার্কিন সেনাদের পূর্ণ উপস্থিতি, নজরদারি, সামরিক, রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যেই উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসের উত্থান ঘটেছে। এটিও এক কারণ ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো কেন প্রতিরক্ষা বাজেট আর বৃদ্ধি করতে চাচ্ছেন না। কৌশলগত কারণে রাশিয়া ও চীন মধ্যপ্রাচ্যে উন্নয়ন এবং সহযোগিতা নিয়ে যখন অগ্রসর হচ্ছে তখন মার্কিনিদের রেজিম চেঞ্জ প্রকল্পে আর কোনো আস্থা রাখতে পারছে না ন্যাটো। চীনের শি জিনপিং আগামী সপ্তাহে আমিরাত যাচ্ছেন। তার আগেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশগুলোয় ২০ বিলিয়ন ডলার উন্নয়ন সহায়তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ রক্ষায় ঋণসহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। সিরিয়ায় রুশ অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গত তিন বছরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে মস্কোয় নবমবারের মতো বৈঠক করেছেন। ন্যাটো সম্মেলনেও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার পর ট্রাম্প যে মধ্যপ্রাচ্য ফর্মুলা দিচ্ছেন তাতে ন্যাটোর বেশির ভাগ দেশ সন্তুষ্ট নয়। সুতরাং বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যে পটপরিবর্তন ঘটছে তাতে ন্যাটো আর আগের মতো কাজ করতে পারবে না এটিই স্বাভাবিক। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বাণিজ্যযুদ্ধ। এ যুদ্ধ বিশ্বের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিকে কতটা বেসামাল করে তুলবে এবং তা সামাল দেয়া ন্যাটোর পক্ষে কতটা সম্ভব হবে তা দেখার জন্য আরো বেশ কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। হ


আরো সংবাদ