২১ নভেম্বর ২০১৮

আবার জেলে নওয়াজ

-

নওয়াজ শরিফ ১৩ জুলাই সন্ধ্যায় লন্ডন থেকে পাকিস্তানি নগরী লাহোরে অবতরণ করা ইতিহাদ ফাইটের বিজনেস-কাস কেবিনের পেছনে লৌহ-কঠিন চেহারায় গ্রেফতার হওয়ার জন্য ধৈর্য ধরে বসেছিলেন। মানসিক যন্ত্রণায় থাকার একমাত্র চিহ্ন ফুটে ওঠেছিল তার ডান হাতের মুঠোয় জড়িয়ে থাকা ন্যাপকিনে। সাংবাদিকেরা তাদের আসনে বসে থাকার কেবিন স্টাফের আবেদন অগ্রাহ্য করেছিলেন। তারা পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চার পাশে সমবেত হয়েছিলেন, তারা সেলফি স্টিকে ধরে রাখা স্মার্টফোনগুলোয় ক্ষিপ্রগতিতে প্রতিবেদন পাঠাচ্ছিলেন। নওয়াজ শরিফ স্থিরভাবেই বসেছিলেন। তার বামে বসা ছিলেন তার ৪৪ বছর বয়স্কা মেয়ে মরিয়ম। তিনি প্রায়ই তার সাদা ওড়না ঠিকঠাক করছিলেন। পরিচয় আড়াল করা বিশেষ ধরনের লাল টুপি পরা ডজনখানেক আধা-সামরিক পুলিশ বিমানে ওঠেছিল। যারা নওয়াজের কাছে পৌঁছেছিল, তারা সবাই তার আসনের সামনে থেমেছিল। ইকোনমি কাস থেকে সমর্থকেরা জোরে সেøাগান দিতে থাকে। নওয়াজ শরিফ ধীরে ধীরে ওঠেন।
সপ্তাহখানেক আগে পাকিস্তানের দুর্নীতি দমন আদালত ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবল ব্যুরো (এনএবি) নওয়াজ শরিফের পরিবারের সদস্যদের লন্ডন পার্ক লেনের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কেনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তার অনুপস্থিতিতে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। মরিয়মকে দেয়া হয় সাত বছরের কারাদণ্ড। অনেকে মনে করেছিলেন, নওয়াজ লন্ডনেই থেকে যাবেন। সেখানে তার স্ত্রী কুলসুম গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি যখন সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ১২ দিন আগে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন, তখন ব্যাপক গুঞ্জন সৃষ্টি হয় যে, তার হোমটাউন লাহোরে তার গ্রেফতার প্রতিরোধ করতে সমর্থকদের সম্ভাব্য চেষ্টা এড়াতে তার ফাইটটি সরিয়ে ইসলামাবাদ নিয়ে যাওয়া হবে। অনেকে এমনও ভেবেছে, আবুধাবিভিত্তিক বিমানটি সেখানে বিরতি দেয়ার সময়ই পাকিস্তানি গোয়েন্দারা এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। বিমানবন্দর লাউঞ্জে শরিফ নিজেই দেড় ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় অপেক্ষার পেছনে কালো শক্তির ইঙ্গিত দিয়ে বলেন : ‘এই বিলম্বের পেছনে কারা আছে ও কেন আছে, তা ভাবুন।’
তবে গ্রেফতার-পর্ব সাবলীলভাবে হলে সন্দেহাতীতভাবেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বেশ স্বস্তি লাভ করে। লাহোরে শরিফের সমর্থকদের ওপর ব্যাপক দমন অভিযান চালানোর কারণেই এটি এত সহজে হয়ে থাকতে পারে। বিমানবন্দরে যাতে তার লাখ লাখ সমর্থক পৌঁছাতে না পারে সে জন্য লাহোরে প্রায় ১০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিমানবন্দরগামী রাস্তাগুলো বন্ধ করে দিতে লরি আর কনটেইনার ব্যবহার করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক প্রাদেশিক সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। তুচ্ছ গণশৃঙ্খলা অপরাধের অভিযোগে দেশটির ক্ষমতাসীন দল নওয়াজের পাকিস্তান মুসলিম লিগের (এন) প্রায় ৩০০ সমর্থককে সাময়িকভাব কারাগারে ঢোকানো হয়। নওয়াজ শরিফের অবতরণের পর প্রায় ৫০ জন আধাসামরিক পুলিশ অস্ত্র হাতে একটি গাড়িতে মানবঢাল তৈরি করে। এই গাড়িটিই তাকে অন্য একটি বিমানের কাছে নিয়ে যায়। তারপর তাকে রাজধানীর কাছে রাওয়ালপিন্ডি নগরীতে উড়িয়ে নেয়া হয়। তাকে সেখানকার জেলে ঢোকানো হয়।
এখনো পিএমএল-এনের নিয়ন্ত্রণকারী নওয়াজ শরিফ বলছেন, তার দলকে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে না দিতে এবং ২০১৩ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অত্যধিক প্রভাবশালী সেনাবাহিনীর ভূমিকা হ্রাস করার চেষ্টা করার জন্য তার প্রতি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশোধ নিতে সামরিক-সমর্থিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ইতিহাদের ফাইটে দ্য ইকোনমিস্টকে নওয়াজ শরিফ ১৯৯৯ সালের রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের পর তার প্রথমবারের মতো কারাগারে যাওয়া থেকে শুরু করে তার রাজনৈতিক জীবন মূল্যায়ন করে বলেন, ‘এস্টাবলিশমেন্টের’ বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ‘চূড়ান্তপর্যায়ে উপনীত’ হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ’ করার পর নির্বাচন কিভাবে বিশ^াসযোগ্য হতে পারে।
নওয়াজ শরিফের বিরোধীরা আশা করছে, কারাগারে যাওয়ার ফলে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার তার সামর্থ সীমিত হবে। কারাগারে থাকার কারণে তিনি তার কর্মীদের পরিচালনা করতে সমস্যায় পড়বেন। মিডিয়ায় খবর প্রকাশ না হওয়া কর্মী পরিচালনা করার যেকোনো প্রয়াসে হতাশার সৃষ্টি হবে। নওয়াজের প্রত্যাবর্তনের দিনে পাকিস্তানের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণকারীরা তার প্রত্যাবর্তনের ফুটেজ প্রচারের বিরুদ্ধে মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে হুঁশিয়ার করে দেয়। নওয়াজের প্রত্যাবর্তন নিয়ে পাকিস্তানের অন্যতম টেলিভিশন উপস্থাপক সৈয়দ তালাত হোসাইনের একটি অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। নওয়াজের বেশ বড় একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বর্ষীয়ান টিভি সাংবাদিক আসমা সিরাজি। সেটিও প্রচার করা হয়নি। আবুধাবি বিমানবন্দরের বিজনেস-কাস লাউঞ্জে অপেক্ষা করার সময় তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘এটি স্বৈরাচারের চেয়েও খারাপ’। শিরাজি বলেন, ১৯৯৯ সালে নওয়াজকে উৎখাতকারী জেনারেল পারভেজ মোশাররফও অন্তত ২০০৭ সালে প্রবাস থেকে ফেরার সময় বেনজির ভুট্টোর অনুষ্ঠান কভার করার সুযোগ দিয়েছিলেন।
তবে নওয়াজ শরিফ যে তার ব্যক্তিগত আয়েশ কোরবানি দিয়েছেন, তা সম্ভবত ভোটারেরা ভুলবে না। টেলিভিশন হোস্ট মর্তুজা সোলাঙ্গি বলেন, পিএমএল-এনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব আরো জোরদার হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, দলটি নির্বাচনে তার সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে না (দলটির অনেক প্রার্থী পক্ষ ত্যাগ করে প্রতিদ্বন্দ্বী ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফে যোগ দিয়েছে। সেনাবাহিনীর সমর্থন পাচ্ছেন সাবেক এই ক্রিকেটার)। তবে নওয়াজ শরিফ দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, আমার ‘সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে আমার দল ও আমার ভাই শাহবাজ’।
নওয়াজ শরিফের মেয়ে মরিয়মের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল হতে পারে। অথচ মাত্র এক বছর আগেও পাকিস্তানের অনেকে বেপরোয়া টুইটার-ব্যবহারকারীর চেয়ে তাকে বড় কিছু ভাবত না। কিন্তু তার বাবাকে নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে তার অবস্থান উঁচু হয়েছে। তিনি এখন আরো ১০ বছরের জন্য রাজনীতি থেকে নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছেন।
জুলফিকার আলি ভুট্টোর ফাঁসি হওয়ার পর তার মেয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাকে সাজা দেয়া হয়েছে নথি দাখিল করার সময়, তখনো জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য প্রকাশ না হওয়া ক্যালিব্রি ফন্ট ব্যবহার করাকে দুর্নীতিকে ‘সমর্থন’ করা ও ‘আদালতের সাথে সহযোগিতা না করার’ অপরাধে। সম্ভবত পাকিস্তানের ইতিহাসে বড় ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছেন মরিয়ম শরিফ। হ

 


আরো সংবাদ