১৪ নভেম্বর ২০১৮
ওলির বেইজিং সফর

নেপালে কমছে ভারতের প্রভাব

-

নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এখন পাঁচ দিনের চীন সফর করে দেশে ফিরে এসেছেন। চীনের সাথে নেপালের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তি তিনি রচনা করেছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময় চীনা বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এখন সেসব প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে দুই দেশ। এবারের সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করলেও দুই দেশের সহযোগিতার নানা দিক নিয়ে মূলত চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কাচিয়াংয়য়ের সাথে তার দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে নেপালের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন চীনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বার্তাটি খুবই স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছেÑ নেপালের অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পাচ্ছেন ওলি।
ওলির চীন সফরে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক প্রকল্পের পাশাপাশি নেপালের সাথে চীনের রেল সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে দুই দেশ একমত হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে নেপালের ভারত নির্ভরতার অবসান ঘটতে পারে। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পে নেপাল একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। আর নেপালও চায় চীন তাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সাহায্য করুক। নেপাল ইতোমধ্যে চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে সংযুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এখন দুই দেশের মধ্যে রেল সংযোগ স্থাপনের যে আলোচনা শুরু হয়েছে তাও এই প্রকল্পের অংশ হবে। চীনের জন্য সবসময়ই নেপাল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। দুই দেশের মধ্যে বিস্তীর্ণ সীমান্ত রয়েছে। চীনের স্বায়ত্তশাসিত তিব্বতের স্থিতিশীলতার জন্যও দুই দেশের সুসম্পর্ক প্রয়োজন।
নেপালে অব্যাহত চীনের প্রভাব নিয়ে ভারত যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে সরাসরি বিরোধিতা করতে পারছে না দেশটি। ২০০৬ সাল পর্যন্ত নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত নানাভাবে হস্তক্ষেপ করে আসছে। কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে পররাষ্ট্রনীতিতে নেপাল ভারতমুখী না হয়ে এক ধরনের ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। নেপালের এ স্বাধীন অবস্থান ভারত কখনো ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালের ওপর অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে ভারত। পাঁচ মাস স্থায়ী এ অবরোধ নেপালের সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সে সময় নেপালে ক্ষমতায় ছিলেন ওলির সরকার। ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টার কারণে ওলির জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে, আর নেপাল চীনের আরো কাছাকাছি পৌঁছানোর একটা সুযোগ পায়। এটা বলা হয়ে থাকে যে, চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে গেলে ভারত তাকে কী চোখে দেখবে, তা নিয়ে ওলি মোটেই চিন্তিত নন।
এ ছাড়া, অবরোধের কারণে নেপালের মানুষ ভারতের ওপর নির্ভরতা কমানোর গুরুত্ব খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে। স্বাভাবিকভাবে নেপালে যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চীনের ভূমিকা বাড়তে থাকে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীন যে, উদার অর্থনৈতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে নেপাল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
নেপাল নিয়ে ভারত এখন প্রকাশ্য বিরূপ কোনো অবস্থান নিচ্ছে না। তবে চীনের ছায়ায় দেশটিতে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ছে এমন উদ্বেগ আছে। ওলি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে এ বছরের মার্চ মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসিকে কাঠমান্ডুতে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ওলির চীন সফরের আগে পাকিস্তানের সেনাকর্মকর্তারাও সম্প্রতি নেপাল সফর করেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ওলি সম্ভবত এটাই প্রমাণ করতে চাইছেন যে, নেপাল একটি সার্বভৌম দেশ আর নিজেদের পররাষ্ট্র নীতির প্রসঙ্গে তারা অন্য কোনো দেশের পরামর্শ মেনে চলবে না। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রাখার দিকটিও নেপাল একই দৃষ্টিতে চায়। খুব স্বাভাবিকভাবেই চীনের সাথে সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ হবে, ততটা স্বাধীন ভূমিকা নিতে পারবে নেপাল। প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির চীন সফরের মধ্য দিয়ে স্বাধীন পথচলার ক্ষেত্রে হয়তো আরো এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভারতের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ যে কমে আসছে, নেপালের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তার প্রমাণ বহন করছে।


আরো সংবাদ