২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

হানিফের লাশ নিয়েও ছিল সাইফুলের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা

আজিমপুরে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জামে মসজিদের খাদেম হানিফ শেখ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত মূল আসামি আরেক খাদেম সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সোমবার রাতে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার একটি বাসা থেকে সাইফুলকে গ্রেফতার করে পিবিআই ঢাকা মেট্রোর একটি টিম। গ্রেফতারের পর তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। 

এ দিকে খাদেম হানিফ শেখকে হত্যার পর একটি ভাঙা কবরে তার লাশ গুম করতে চেয়েছিল হত্যাকারী খাদেম সাইফুল ইসলাম। কিন্তু মসজিদে অন্যান্য কর্মচারী ও খাদেম উপস্থিত থাকায় তা সফল হয়নি। এরপর মসজিদের একটি কক্ষের বারান্দায় হানিফের বস্তাবন্দী লাশ রেখে পালিয়ে যায় সাইফুল। দাড়ি কামিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে চট্টগ্রামে এক আত্মীয়ের বাসায় পালিয়ে ছিল সে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দফতরে সংস্থাটির প্রধান বনজ কুমার মজুমদার সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, মো: হানিফ শেখ ও সাইফুল ইসলাম দুইজনই ওই মসজিদের খাদেম হিসেবে কর্মরত ছিল। তবে হানিফ শেখ কাজে ভালো হওয়ায় মসজিদ কমিটি তাকে বেশি পছন্দ করত। সাইফুল ইসলাম কাজে ফাঁকি দেয়ায় কমিটি তার পদাবনতি করে দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয় সাইফুল। এ নিয়ে হানিফ শেখের সাথে তার দ্বন্দ্ব ছিল। মূলত এজন্যই হানিফকে খুনের পরিকল্পনা করে সাইফুল।

তিনি বলেন, ২ জুলাই বেলা ২টার দিকে সাইফুল ও হানিফ শেখের মধ্যে ঝগড়া হয়। এরপর সাইফুল বাইরে চলে যায়। বিকেল ৪টার দিকে সাইফুল মসজিদের দোতলায় খাদেমদের কক্ষে যায়। সেখানে গিয়ে হানিফ শেখকে ঘুমাতে দেখে। এ অবস্থায় সাইফুল একটি চাকু দিয়ে হানিফ শেখকে প্রথমে বুকে ও পেটে দু’টি আঘাত করে। এরপর হানিফ জেগে যায়। তখন তার মুখ চেপে ধরে একের পর এক আঘাত করতে থাকে সাইফুল। একপর্যায়ে হানিফ শেখ মারা যান। এ সময় মসজিদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাহারউদ্দিন ও অন্য খাদেম ফরিদউদ্দিন কেউই কক্ষে ছিলেন না। হত্যার পর আজিমপুর কবরস্থানের একটি ভাঙা কবরে হানিফের লাশ গুম করার পরিকল্পনা করেছিল সাইফুল। 

পিবিআই কর্মকর্তা জানান, হানিফকে খুন করার পর তার মাথা ও পা একসাথে মুড়িয়ে বেঁধে ফেলে সাইফুল। এরপর একটি পলিথিনে ঢুকিয়ে বস্তায় ঢোকায়। বস্তায় ঢোকানোর পর সেটি কক্ষের বারন্দায় একটি বাঁশের তৈরি ঝুড়িতে রেখে দেয়। এরপর সে তোষকের কাভার ভিজিয়ে মেঝের রক্ত পরিষ্কার করে। হাত-মুখ ধুয়ে নিচতলায় আসরের নামাজ শেষ করে আবার মসজিদের দোতলায় খাদেমদের কক্ষে গিয়ে নিজের জামা-কাপড় ধুয়ে বারান্দায় শুকাতে দেয়। সন্ধ্যা থেকে কক্ষেই অবস্থান করে। এরই মধ্যে রাতে মসজিদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাহারউদ্দিন ও খাদেম ফরিদউদ্দিন আহমেদ কক্ষে চলে আসেন। তারা এসে সাইফুলের কাছে হানিফ কোথায় জানতে চান। তখন সাইফুল বলে সে জানে না। রাত অনেক হলেও সাইফুল ঘুমাচ্ছিল না। এ সময় খাদেম ফরিদউদ্দিনও জেগে ছিলেন। এ কারণে হানিফের লাশ সরাতে পারছিল না সাইফুল। রাত ১১টায় বাহারউদ্দিন ও ফরিদউদ্দিনকে সে জানায়, তার বাবা মারা গেছেন। তাকে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। এই বলে সে বের হয়ে যায়। 

৩ জুলাই কক্ষের ভেতরে গন্ধ পাওয়ার পর খাদেম ফরিদউদ্দিন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাহারউদ্দিন গন্ধ খুঁজতে খুঁজতে বারান্দায় একটি বস্তা পড়ে থাকতে দেখেন। আগে সেখানে কোনো বস্তা ছিল না। এরপর মসজিদ কমিটি বিষয়টি পুলিশকে জানায়। পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। 

এ ঘটনায় নিহত হানিফ শেখের শ্বশুর জাকির শেখ বাদি হয়ে লালবাগ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতারকৃত সাইফুলের বাবার নাম শফিকুল। তার বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ থানার মশাই গ্রামে। মামলার অন্য আসামিরা হলো ওই মসজিদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার শালন্দী গ্রামের বাহারউদ্দিন ও আরেক খাদেম মো: ফরিদউদ্দিন আহমেদ। তার বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুরে এবং নিউ মার্কেট জামে মসজিদের খাদেম আবুল কালাম আজাদ। মামলাটি প্রথমে লালবাগ থানা পুলিশ তদন্ত করে। এরপর পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয় পুলিশ সদর দফতর।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, হানিফ শেখকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে সাইফুল। হত্যার পর সে প্রথমে নোয়াখালীতে তার গ্রামের বাড়িতে যায়। সেখানে তার স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। এরপর সেখান থেকে চট্টগ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে এবং পরে চাচার বাসায় যায়। তবে কেউ তাকে রাখতে চায়নি। এর পর সে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তার ফুফুর বাসায় যায়। সেখান থেকেই সোমবার তাকে গ্রেফতার করে পিবিআই। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে যাওয়ার পর সাইফুল সেলুনে গিয়ে নিজের চেহারা পরিবর্তনের চেষ্টা করে। সে পাঞ্জাবি ছেড়ে টি-শার্ট পরা শুরু করে। দাড়ি কামাতে সেলুনে যায়। তখন নরসুন্দর তাকে দাড়ি কামানোর কারণ জানতে চাইলে সাইফুল জানায়, তার স্কিনে সমস্যা, তাই শেভ করতে হবে। এই বলে শেভ করে চলে আসে। 

এ ঘটনায় লালবাগ থানা পুলিশ বাহারউদ্দিন, ফরিদউদ্দিন ও আবুল কালাম আজাদকে গ্রেফতার করেছিল। তবে পিবিআই তাদের তদন্তে এদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি। হত্যাকাণ্ডে সাইফুল একাই জড়িত ছিল বলে জানিয়েছে পিবিআই।


আরো সংবাদ