২০ নভেম্বর ২০১৮

ফুটপাথের টাকায় কোটিপতি!

রাজধানীর ফুটপাতে চাঁদাবাজি করে অনেকেই কোটিপতি বনে গেছেন। - ছবি: সংগৃহীত

ফুটপাথের চাঁদার টাকা দিয়েই অনেকে আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। ঢাকায় আলিশান বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তাদের বিত্তবৈভবের উৎসই ফুটপাথ, যে কারণে ফুটপাথের হকারদের কেউ ইচ্ছা করলেই উচ্ছেদ করতে পারেন না। কথাগুলো বলেছেন পুলিশের একজন কর্মকর্তা।

ওই কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ফুটপাথ হকারমুক্ত করতে যেসব অভিযান হয়েছে তাতে তিনিও সম্পৃক্ত ছিলেন। ঢাকার দুই মেয়র নিজেরা সরাসরি মাঠে দায়িত্ব পালন করেও উদ্দেশ্য সফল হয়নি।

গত কয়েক দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, হকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। হকার সংগঠন সূত্র জানায়, আগে যেখানে দুই লাখ থেকে সোয়া দুই লাখ হকার ছিল, সেখানে এখন

হকার সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সরকারিভাবে এর কোনো হিসাব না থাকলেও সংগঠনগুলোর অনুমাননির্ভর এ সংখ্যার কিছু কম-বেশি হতে পারে। আগে যেসব ফুটপাথে হকার দেখা যায়নি, এখন সেসব এলাকায়ও হকারে কানায় কানায় ঠাসা।

ঢাকা সিটির দুই মেয়র নানাভাবে ফুটপাথ হকারমুক্ত রাখার চেষ্টা করলেও তাদের সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। এমনকি ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে হকার উচ্ছেদ নিয়ে গোলাগুলি পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু হকার উচ্ছেদ সম্ভব হয়নি। বুলডোজার দিয়ে অনেক এলাকায় ফুটপাথের অবৈধ দখলমুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেখানে আরো শক্তপোক্ত হয়ে হকার বসেছে। অনেক এলাকায় সেমিপাকা ঘর তৈরি করে সেখানে হকাররা ব্যবসা করে আসছে।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হকার উচ্ছেদের ওই সব অভিযানে তারও সম্পৃক্ততা ছিল। কিন্তু হকার উচ্ছেদ সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত হকারদের সাথে সিটি করপোরেশনের অলিখিত সমঝোতা হয়। যেখানে বিকেল ৪টার পর হকার বসতে দেয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পরে কয়েক মাস ঠিকঠাক ছিল। বিকেল ৪টায় হকার ফুটপাথে বসতেন। কিন্তু এখন ওই নিয়মটিও কেউ মানছেন না। সকাল থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাথ, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় রাস্তার ওপরও হকার বসে যায়।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, রাজধানীর অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি রয়েছেন যারা টাকা কামিয়েছেন ফুটপাথে চাঁদাবাজি করে। এসব হকারই তাদের টাকার জোগান দিয়েছে। এখন তারা আলিশান বাড়িতে থাকেন, দামি গাড়িতে চড়েন। এসব লোকের কারণে কোনো দিনই ফুটপাথ হকারমুক্ত হবে না। নানাভাবে নানাজনকে ম্যানেজ করে তারা ঠিকই ফুটপাথে হকার বসাবেন। একজন হকার বসাতে পারলেই দিনে ২০০ টাকা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও সেখানে কিছুই করার থাকে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাস্তায় যারা হকারদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন তাদের পেছনেও অনেক রাঘববোয়াল। লাইনম্যানরা চাঁদা আদায় করে নেপথ্যের ওই সব প্রভাবশালীদের পৌঁছে দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীতে তিন শতাধিক চাঁদাবাজ রয়েছে যারা ফুটপাথ দিয়ে সরাসরি টাকা নিচ্ছে। মিরপুর রোডের ধানমণ্ডি ও নিউমার্কেট অংশে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কিছু ক্যাডার ফুটপাথসহ মার্কেটের ফাঁকা জায়গায় দোকান বসিয়ে নিয়মিত চাঁদা তোলে। কামরাঙ্গীরচরে মাউচ্ছা দেলু, জাবেদুল ইসলাম জাবেদ ওরফে সমিতি জাবেদ, মফিজ, খোকন, কামাল, অহিদুল, বাবু, হানিফ, সিদ্দিক, বাদশা, মঞ্জু, ফিরোজ, সুমন, মাসুদ, মামুন, মুসা, শাকিল, মনির ও সিরাজ তালুকদার ফুটপাথের হকারদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। লালবাগের নবাবগঞ্জ বেড়িবাঁধে মঙ্গলবার হলিডে মার্কেটের অন্তত দুই হাজার ফুট দোকান থেকে দোকানপ্রতি গড়ে ২৫০ টাকা করে প্রতি সপ্তাহে ৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলেন শাসক দলের নেতা পরিচয়দানকারী হাফেজ সুমন, জাকির, শাহীন ওরফে অটোশাহীন, বারেক, সেলিম, বিপ্লব ও মোকলেস। বংশাল ও কোতোয়ালিতে মেহেদীর নেতৃত্বে ফুটপাথের ৫ হাজার দোকান থেকে দৈনিক ১২০ টাকা হারে প্রতিদিন চাঁদা তুলছে লাইনম্যান মিরাজ, জসিম, আলম ও ইউনুস।

ফুটপাথ-সড়কে অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করার অভিযোগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মতিঝিল, পল্টন ও শাহবাগ থানায় ৭২ চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেন ডিএসসিসি সহকারী সম্পত্তি কর্মকর্তা মুহাম্মদ সামছুল আলম। মতিঝিলের এক মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম মোল্লা ফুটপাথে এখনো বহাল তবিয়তে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের পাশের মার্কেটে চাঁদা আদায় করছে তার সহযোগী শিবলু ও শাহজাহান মৃধা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বায়তুল মোকাররম জিপিও লিংক রোডে হলিডে মার্কেটে খোকন মজুমদার, আবুল হাসেম, মজিবর, পোটল, নসু, হারুন অর রশীদ ও তার সহযোগীরা, উত্তরগেট এলাকায় দুম্বা রহিম, সাজু চাঁদা তুলছে। শাপলা চত্বরে আরিফ চৌধুরী, পল্টনে দুলাল মিয়া ও তার সহযোগী, গুলিস্তান আহাদ পুলিশ বক্স ও রাস্তায় আমিন মিয়া, সাহিদ ও লম্বা হারুন, জুতাপট্টিতে সালেক, গোলাপশাহ মাজারের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে ঘাউড়া বাবুল ও শাহীন টাকা তুলছে।

ওসমানী উদ্যানের পূর্ব ও উত্তর অংশে লম্বা শাজাহান, গুলিস্তান খদ্দর মার্কেটের পশ্চিমে কাদের ও উত্তরে হান্নান, পূর্বে সালাম, আক্তার ও জাহাঙ্গীর, গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনের রাস্তায় লাইনম্যান সর্দার বাবুল, সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের উত্তর পাশের রাস্তায় জজ মিয়া, পূর্ব পাশের রাস্তায় সেলিম মিয়া, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে মো: আলী, আবদুল গফুর ও বাবুল ভুঁইয়া, শাহবাগে ফজর আলী, আকাশ, কালাম ও নুর ইসলাম, যাত্রাবাড়ীতে সোনামিয়া, তোরাব আলী, মান্নান টাকা তোলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। জুরাইন-পোস্তগোলায় খায়রুল, সিরাজ তালুকদার ও গরু হানিফ, লালবাগে আবদুস সামাদ, চাঁনমিয়া ও ফিরোজ, মিরপুরে-১-এ ছোট জুয়েল, আলী, বাদশা ও মিজান, মিরপুর-১১ এ আবদুল ওয়াদুদ, শফিক ও হানিফ, গুলশানে হাকিম আলী, কুড়িলে আবদুর রহীম ও নুরুল আমিন, এয়ারপোর্টে আকতার, মনির, ইব্রাহিম, জামাল ও বাবুল, উত্তরায় টিপু, নাসির ও হামিদ।

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম নয়া দিগন্তকে বলেন, চাঁদাবাজদের কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ফুটপাথের হকারদের পুঁজি করে অনেকে কোটি কোটি টাকা কমিয়ে নিচ্ছেন। হকাররা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। চাঁদা না দিলে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া হয়।


আরো সংবাদ