২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইয়াবা ব্যবসায় পুরো পরিবার : ব্যাংক অফিসার-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আটক

২ লাখ ৭ হাজার ১০০ ইয়াবাসহ রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের দুটি বাসা থেকে আটককৃতরা - সংগৃহীত

ওষুধ ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে রাজধানীতে ৫ জনকে আটক করেছে র‌্যাব। গতকাল রাতে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে দুই বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জামাদি, ফ্যান, ওয়াশিং মেশিন, এসি ইত্যাদির ভেতরে করে তারা ইয়াবা আদান প্রদান করতো বলে র‌্যাবকে জানিয়েছে।

আটকৃতরা হলেন, জহির আহাম্মেদ ওরফে মৌলভি জহির (৬০)। ফয়সাল আহাম্মেদ (৩১), মিরাজ উদ্দিন নিশান (২১), তৌফিকুল ইসলাম ওরফে সানি (২১), সঞ্জয় চন্দ্র হালদার (২০) ও মমিনুল আলম ওরফে মোমিন (৩০)।

র‌্যাব জানায় আটক, জহির আহাম্মেদ ওরফে মৌলভি জহিরের টেকনাফে ওষুধের দোকান আছে। কিন্তু এই ব্যবসার আড়ালে তিনি ইয়াবা ব্যবসা করেন। তাঁর সঙ্গে জড়িত তাঁর স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে, জামাতাসহ অন্যান্য স্বজন।

আজ বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জহির হলেন ইয়াবা চোরাচালান চক্রটির মূল হোতা। তিনি ও তাঁর বড় ছেলে জহিরুল ইসলাম ওরফে বাবু (২৮) পাঁচ-ছয় বছর ধরে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া করে ইয়াবা ব্যবসা করছেন। বাবু গত ২৫ এপ্রিল মাদকদ্রব্যসহ ধানমন্ডি এলাকা থেকে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে গ্রেপ্তার হন। এখন তিনি কারাগারে। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত জহিরের স্ত্রী, মেয়ে, বড় জামাতা আবদুল আমিন, জামাতার ভাই নুরুল আমিন। জহিরের সঙ্গে টেকনাফের বেশ কয়েকজন জড়িত। এই সিন্ডিকেটে আরও জড়িত পরিবহন খাতে কর্মরত কয়েকজন চালক ও সহকারী, দুটি কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মচারী, ঢাকার কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা। তাদের সদস্য সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ জন।

র‌্যাব জানায়, জহিরের ইয়াবা ব্যবসার সন্ধান পেয়ে র‍্যাব ২ অভিযানে নামে। অভিযানে গতকাল বুধবার রাতে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের দুটি বাসা থেকে ২ লাখ ৭ হাজার ১০০টি ইয়াবা উদ্ধার করে। মাদক বিক্রির ১৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকাসহ ছয়জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‍্যাব বলছে, উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের মূল্য প্রায় ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

সংবাদ সম্মেলনে মুফতি মাহমুদ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জহির জানান, এই সিন্ডিকেটের মিয়ানমারের প্রতিনিধি আলম ওরফে বর্মাইয়া আলম। তিনি মিয়ানমারের মংডুতে স্থায়ীভাবে বাস করছেন। টেকনাফেও বর্মাইয়া আলমের একটি বাড়ি রয়েছে। তিনি টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে নৌপথে মংডু থেকে ইয়াবা পাচার করে টেকনাফের নাজিরপাড়া, জালিয়াপাড়াসহ টেকনাফের বিভিন্ন এলাকার বাড়িতে ইয়াবা মজুত রাখেন। মজুত করা ইয়াবা জহির ও তাঁর জামাতা আবদুল আমিন, নুরুল আমিন ও মোমিন টেকনাফে বর্মাইয়া আলম কাছ থেকে সংগ্রহ করে থাকেন। পরে তাঁরা টেকনাফ বা কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী বিভিন্ন পরিবহন, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠান।

আটককৃতরা জানিয়েছে, বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জামাদি, যেমন: ফ্যান, ওয়াশিং মেশিন, এসি ইত্যাদির ভেতর ইয়াবা লুকিয়ে পরিবহন বা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠানো হতো। যাত্রীবাহী বাসে পরিবহনের সময় টেকনাফের দুই ব্যক্তি বাহক হিসেবে কাজ করতেন। মাঝেমধ্যে বহনকারী ছাড়া নির্ধারিত চালক ও সহকারীর মাধ্যমেও ঢাকায় ইয়াবা পাঠানো হতো।

উদ্ধারকৃত ইয়াবাগুলো সাত-আট দিন আগে দুটি চালানে কার্টনে এসি ও ফ্যানের ভেতরে ঢুকিয়ে ঢাকায় আনা হয়েছিল। এই সিন্ডিকেটের আবদুল আমিন ও তাঁর ভাই নুরুল আমিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় আছেন।

র‍্যাব বলছে, ফয়সাল আহাম্মেদ জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার পদে কর্মরত। তিন বছর ধরে ইয়াবা সেবন করে আসছেন এবং ধীরে ধীরে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

জিজ্ঞাসাবাদে মিরাজ উদ্দিন জানান, তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে প্রথম সেমিস্টারে পড়েন। গ্রেপ্তার করা মোমিন ও তাঁর বাড়ি একই অঞ্চলে হওয়ায় পরিচয় সূত্রে তিনি ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি ইয়াবা সেবনকারীও।

জিজ্ঞাসাবাদে তৌফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ঢাকায় একটি কলেজে ম্যানেজমেন্টে প্রথম বর্ষে পড়েন। তাঁর কলেজের বন্ধু গ্রেপ্তারকৃত মিরাজ উদ্দিন নিশানের সূত্র ধরে গ্রেপ্তারকৃত মোমিনের সঙ্গে পরিচয়। তিনি গত দেড় বছর থেকে ইয়াবা সেবন এবং ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত।

জিজ্ঞাসাবাদে সঞ্জয় চন্দ্র হালদার জানান, তিনি মাদারীপুর একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। তিনি এক বছর ধরে ইয়াবা সেবন করছেন এবং গ্রেপ্তারকৃত তৌফিকুল ইসলামের মাধ্যমে গ্রেপ্তারকৃত নিশানের সঙ্গে পরিচয় সূত্রে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি ইয়াবা সংগ্রহ করে শরিয়তপুরে খুচরা বিক্রি করে আসছিলেন।

 

৬০০০ পিস ইয়াবাসহ মাদক বিক্রেতা গ্রেফতার
চট্টগ্রামে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ এক মাদক বিক্রেতাকে গ্রেফতার করেছে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।
গ্রেফতারকৃতের নাম-ইকবাল হোসেন মামুন (২৭)। গ্রেফতারের সময় তার হেফাজত থেকে ৬০০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।
১৫ আগস্ট’১৮ রাত সাড়ে আটটার দিকে কোতোয়ালী থানাধীন পুরাতন রেলস্টেশন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে উল্লেখিত স্থানে ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিল।
গ্রেফতারকৃত ইকবাল কক্সবাজারের রামু থানার চরপাড়া অফিসের চর গ্রামের কবির আহমদের ছেলে। এ সংক্রান্তে তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা রুজু হয়েছে।

 

ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন খেলে কী হয়

বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত মাদক ইয়াবা। বলা হচ্ছে, দেশে ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ৭০ লাখের উপরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা সাময়িকীতে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের ৫৮ শতাংশ ইয়াবাসেবী। ২৮ শতাংশ আসক্ত ফেনসিডিল এবং হেরোইনে।

গবেষকরা বলছেন, অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে ইয়াবা জনপ্রিয় হতে শুরু করে ২০০০ সালের পর থেকে যখন টেকনাফ বর্ডার দিয়ে মিয়ানমার থেকে এই ট্যাবলেট আসতে শুরু করে। তারপর এটি খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। তার আগে নব্বই এর দশকে জনপ্রিয় ড্রাগ ছিল হেরোইন।

তারও আগে আশির দশকে ফেনসিডিল, সেটি নব্বই এর দশকেও ছিল।

ঢাকায় মুক্তি নামের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে বেডের সংখ্যা ১০০। এই কেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, চিকিৎসার জন্যে তাদের কাছে যতো রোগী আসেন তার ৮০ শতাংশই এখন ইয়াবাসেবী। হেরোইন ও ফেনসিডিলের চল এখনও আছে, কিন্তু সীমিত পর্যায়ে।

য়াবার জনপ্রিয়তার পেছনে দুটো কারণকে উল্লেখ করছেন চিকিৎসকরা।

একটি কারণ শরীরের উপর এর তাৎক্ষণিক প্রভাব
আর অন্যটি সহজলভ্যতা।
মুক্তির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান কনসালটেন্ট ড. আলী আসকার কোরেশী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ইয়াবা গ্রহণ করলে সেটি শুরুতেই মানুষকে চাঙ্গা করে তোলে। আর সব মানুষই নিজেকে চাঙ্গা দেখতে ভালোবাসে। একারণে তারা ইয়াবার দিকে ঝুঁকে পড়ে।"

"এটি অত্যন্ত ছোট্ট একটি ট্যাবলেট। ওয়ালেটে এবং নারীদের ভ্যানিটি ব্যাগেও এটি সহজে বহন করা যায়। অনলাইনে অর্ডার দিলে পৌঁছে যায় বাড়িতে। মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যোগাযোগ অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দেওয়া যায়। কিন্তু ফেনসিডিলের জন্যে বড় বোতল লাগে। সেটা বহন করা, খাওয়ার পর ফেলা অনেকের জন্যেই ঝামেলার। এছাড়াও এটি অনেক বেশি পরিমাণে খেতে হয়," বলেন মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেনটাল হেলথের সাইকোথেরাপির অধ্যাপক তিনি।

গবেষকরা বলছেন, মাদকাসক্তদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা কতো সেটা বলা কঠিন।

"মনে রাখতে হবে ছেলেরা যতো সংখ্যায় চিকিৎসা নিতে আসে, মেয়েরা কিন্তু অতোটা আসে না। সামাজিক কারণেই তাদের নেশা সংক্রান্ত সমস্যা পরিবার থেকে গোপন রাখা হয়। ফলে এটা বোঝা একটু কঠিন যে মেয়েরা কি পরিমাণে আসক্ত," বলেন মি. কোরেশী।

মনোবিজ্ঞানী ড. কামাল জানিয়েছেন, মেয়েদের ইয়াবার নেশা শুরু হয় ঘুমের বড়ি থেকে। নানা ধরনের মানসিক যন্ত্রণার কারণে তারা যখন রাতে ঘুমাতে পারে না তখন তারা ঘুমের বড়ির আশ্রয় নেয়। তারপর ধীরে ধীরে ইয়াবার মতো অন্যান্য মাদকেও আসক্ত হয়ে যায়।

কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের আইন অনুসারে হেরোইন হচ্ছে 'ক শ্রেণি'র মাদক আর ফেনসিডিল ও ইয়াবা 'খ শ্রেণি'র।

কোন ধরনের মাদক?
ইয়াবা হচ্ছে এমফিটামিন জাতীয় ড্রাগ- মেথাএমফিটামিন।

অনেকের মধ্যেই এটি সম্পর্কে ভুল ধারণা আছে। তারা মনে করেন, ইয়াবা ট্যাবলেটের মতো গিলে খাওয়া হয়। আসলে কিন্তু তা নয়।

হেরোইনের মতো করেই খেতে হয় ইয়াবা। এলোমুনিয়ামের ফয়েলের উপর ইয়াবা ট্যাবলেট রেখে নিচ থেকে তাপ দিয়ে ওটাকে গলাতে হয়। তখন সেখান থেকে যে ধোঁয়া বের হয় সেটা একটা নলের মাধ্যমে মুখ দিয়ে গ্রহণ করা হয়। তখন সেটা মুহূর্তের মধ্যেই সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রে গিয়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

ইয়াবাকে বলা হয় 'আপার ড্রাগ' কারণ এটি গ্রহণ করলে শুরুতে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

হেরোইন ও ফেনসিডিল হচ্ছে ইয়াবার বিপরীতধর্মী ড্রাগ। এগুলো নারকোটিক এনালজেসিক। অর্থাৎ ব্যথানাশক ওষুধ। এটিকে বলা হয় 'ডাউনার ড্রাগ' কারণ এটি খেলে সে ঝিম মেরে থাকে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এই দুটো একই ধরনের মাদক। হেরোইন হচ্ছে ওপিয়ামের একটি প্রাকৃতিক ডেরিভেটিভ আর ফেনসিডিল সিনথেটিকের। এই দুটো ড্রাগের মধ্যে যে রাসায়নিকটি থাকে সেটি হচ্ছে কোডিন ফসফেট। হেরোইনের মধ্যে এটি একটু বেশি পরিমাণে থাকে।

কোডিন ফসফেট খেলে মানুষ স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করে। নিজেকে রাজা বাদশাহ ভাবতেও অসুবিধা হয় না।

শরীরের উপর প্রভাব
মুক্তির চিকিৎসক আলী আসকার কোরেশী বলেন, " ইয়াবা খেলে শরীরে উত্তেজনা আসে। ফলে ঠিকমতো ঘুম হয় না। এক নাগাড়ে দুই তিনদিনও না ঘুমিয়ে জেগে থাকতে পারে। মনে করে যে সে ভীষণ কাজ কর্ম করবে কিন্তু আসলে কোন কাজই হয় না। কেউ হয়তো মনে করে যে আমি আজকে রাতে পড়ে কাল পরীক্ষা দেব, কিন্তু সে সারা রাত ধরে একটা পাতাও উল্টাতে পারে না, এক পাতাতেই বসে থাকে।"

আবার যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন আবার এক নাগাড়ে দুই তিনদিন ঘুমাতে থাকে।

অন্যদিকে, ফেনসিডিল ও হেরোইন খেলে শরীরে ঘুম ঘুম ভাব আসে। তন্দ্রার মতো হয়। "একটা জায়গায় বসে তারা ঝিমুতে থাকে। সিগারেটের পর সিগারেট, চায়ের পর চা খেতে থাকে। এবং তখন সে কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে।"

মোহিত কামাল বলছেন, "যতো মাদক আছে সেগুলোর সবই মানুষের 'মস্তিষ্কের পুরষ্কারতন্ত্রের' মাধ্যমে কাজ করে। কারণ উদ্দীপ্ত হলে মানুষ একই কাজ বারবার করতে বাধ্য হয়। ব্রেনের ভেতরে ডোপামিন নিঃসরণ ঘটে। সেটা শরীরের ভেতরে একটা উত্তেজনা তৈরি করে। সব মাদকের বেলাতেই মোটা-দাগে প্রভাবটা এরকম।"

"যখন নেয় তখন শরীরে একটু ফুরফুরা ভাব কাজ করে। কিন্তু যখন নেয় না তখন শরীরে ব্যথা করে। মাংসপেশিতে ব্যথা হয়। হাড়ের ভেতরে শিরশির করতে থাকে। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তারা আবারও মাদক নিতে বাধ্য হয়," বলেন তিনি।

ইয়াবায় শরীর চাঙা হয়
রাতের পর রাত জেগে থাকা যায়
যৌন উদ্দীপনা বেড়ে যায়
হেরোইন ও ফেনসিডিল খেলে শরীর ঝিম মেরে থাকে
তখন বিচরণ করে কল্পনার রাজ্যে
তিনি বলেন, "যেখানে যাকে যেভাবে মোটিভেশন করা দরকার তার কাছে সেভাবেই ইয়াবা তুলে দেওয়া হচ্ছে। যেমন শিক্ষার্থীদেরকে বলছে যে, এটা খেলে তুমি রাত জেগে পড়তে পারবে। কেউ মোটা হলে তাকে বলা হচ্ছে শরীর শুকিয়ে যাবে। গানের শিল্পীকে বলছে, ইয়াবা খেলে গলার কাজ ভালো হবে।"

চিকিৎসকরা বলছেন, ইয়াবার কারণে পুরোপুরি বদলে যায় মানুষের জীবন ধারা। এই পরিবর্তনটা হয় খুব দ্রুত গতিতে। "দিনে সে ঘুমাচ্ছে, রাতে জেগে থাকছে। পরপর কয়েকদিন সে ঘুমাচ্ছে না কিন্তু আবার একটানা ঘুমাচ্ছে। ফলে মেজাজ অত্যন্ত চরমে উঠে যাচ্ছে," বলেন মি. কোরেশী।

তিনি বলছেন, কয়েকদিন পর দেখা যায় পরিবারের সবার সাথে তার ঝগড়াবিবাদ গণ্ডগোল লেগে যায়। আশেপাশের আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের সাথেও তার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে। তার মনে হয় সবাই খারাপ। তিনি একাই শুধু ভালো।

"কিছুদিন পর দেখা যায় যে প্যারানয়েড হয়ে গেছে। সে ভাবতে থাকে যে সবাই তার শত্রু বা সবাই তার পেছনে লেগেছে। সে সন্দেহ করতে শুরু করে যে তাকে কেউ মেরে ফেলবে, বিষ খাওয়াবে। তারপর ধীরে ধীরে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।"

মোহিত কামাল বলেন, "ইয়াবা খেয়ে শিক্ষার্থীরা রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকলেও কোন লাভ হয় না। কারণ পড়ালেখায় তার মনোযোগ থাকে না। মোটা মানুষকে ইয়াবা চিকনও করে না। এটা খেলে তার খিদে কমে যায়। তখন সে কম খায়। তার পেশীকে ক্ষয় করে ফেলে। মাংসপেশি শুকিয়ে গেলে একটু শুকনা মনে হয়, গাল ভেঙে যায়। কিন্তু চিকন হওয়ার তথ্য পুরোপুরি ভুল।"

স্বাস্থ্য ঝুঁকি
অনেকে ইয়াবা গ্রহণ করে যৌন উদ্দীপক হিসেবে। প্রথম দিকে সেটা কাজ করে যেহেতু এটা খেলে শারীরিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তার যৌন ক্ষমতা একেবারেই ধ্বংস হয়ে যায়। শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যায়। মেয়েদের মাসিকেও সমস্যা হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার, কিডনি থেকে শুরু করে শরীরে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ইয়াবা খেলে উচ্চ রক্তচাপ হয়। লিভার সিরোসিস থেকে সেটা লিভার ক্যান্সারেও পরিণত হতে পারে।

যৌন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়
ফুসফুসে পানি জমে
কিডনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়
লিভার সিরোসিস থেকে ক্যন্সারও হতে পারে
মেজাজ চড়ে যায়, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, নিষ্ঠুর হয়ে যায়
রক্তচাপ বেড়ে যায়
সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়
মানসিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়
মোহিত কামাল বলেন, "ইয়াবা খেলে মস্তিষ্কের সরু রক্তনালী ছিঁড়ে যেতে পারে। মস্তিষ্কে রক্তপাতও হওয়ার ঘটনাও আমরা পেয়েছি। ব্রেইন ম্যাটার সঙ্কুচিত হয়ে যায়। সেটা যদি ১৫০০ গ্রাম থাকে সেটা শুকিয়ে এক হাজার গ্রামের নিচে নেমে যেতে পারে। জেনেটিক মলিকিউলকেও নষ্ট করে দিতে পারে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মও স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে থাকে।"

চিকিৎসকরা বলছেন, ইয়াবা খেলে শরীরে একটা তাপ তৈরি হয় যা কিডনিরও ক্ষতি করতে পারে। যেহেতু এটিকে ধোঁয়া হিসেবে নেওয়া হচ্ছে তাই ফুসফুসে পানিও জমে যেতে পারে।

"রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নিষ্ঠুর নির্মম হয়ে যায়। আমাদের ব্রেনের ফ্রন্টাল একটি লোপে যেখানে বিচার বিবেচনার বোধ তৈরি হয়, যেখানে আমরা সিদ্ধান্ত নেই, পরিকল্পনা করি সে জায়গাটা কাজ করতে পারে না। ফলে মানুষ পাষণ্ড হয়ে যায়, হিংস্র হয়ে যায়। মায়ের গলায় ছুরি ধরে টাকার জন্যে। মা বাবার বুকে বসে ছুরি চালাতে তার বুকও কাঁপে না," বলেন ড. কামাল।

স্বাস্থ্যের অবনতি হয়
ভিটামিনের অভাব দেখা দেয় শরীরে
যৌন ক্ষমতা হারিয়ে যায়
ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ
চিকিৎসকরা বলছেন, ফেনসিডিল ও হেরোইনের বেলাতেও দ্রুত গতিতে স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। কারণ তারা ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে পারে না। তাদের খাওয়ার প্রয়োজনও খুব একটা পড়ে না। কারণ হেরোইন কিম্বা ফেনসিডিল খেলে ক্ষুধা কেটে যায়। ফলে তাদের সাধারণ পুষ্টি চাহিদাও পূরণ হয় না। যার কারণে তাদের শরীরে সব ধরনের ভিটামিনের অভাব দেখা দিতে শুরু করে।

হেরোইন ও ফেনসিডিলের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু ইয়াবার ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে সময় লাগে না। "ইয়াবা হচ্ছে অনেক বেশি মানসিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল ড্রাগ যেখানে হেরোইন আর ফেনসিডিল শারীরিকভাবে নির্ভরশীল," বলেন ড. কোরেশী।

হেরোইন ও ফেনসিডিল গ্রহণ করলেও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। ড. কোরেশী বলেন, "এদুটো নেশাও প্রাথমিকভাবে যৌন উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এসবও যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। একজন ৩০ বছরের যুবক পরিণত হয় ৮০ বছরের বৃদ্ধ মানুষে।"

 


আরো সংবাদ