২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ডিজিটাল জালিয়াতি করে কোটিপতি তারা

ডিজিটাল জালিয়াতি করে কোটিপতি তারা - সংগৃহীত

বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইসের মাধ্যমে এসএসসি, এইচএসসি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, ব্যাংকসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছে একটি চক্র। গত কয়েক বছর ধরেই ডিভাইস জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এ অসাধু চক্রের সদস্যরা। এতে সরকারী কর্মকর্তা, বিসিএসে উত্তীর্ণরাসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন জড়িদের প্রমাণ পেয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের অক্টোবর থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যদের ধরতে মাঠে নামে সিআইডি।

অভিযানের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নাটোরের ক্রীড়া কর্মকর্তা রাকিবুল হাসানসহ প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ২৮ জনকে গ্রেফতার করে তারা। তারই ধারাবাহিকতায় সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে ডিজিটাল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিকেএসপির সহকারী পরিচালক, বিএডিসির সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ রাজধানীর অগ্রণী স্কুল ও ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুলের দুই শিক্ষকসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। এছাড়া এতে বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্তরাও রয়েছে।

ঢাকা ও সিরাজগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। প্রতারক চক্রটি নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও আলিয়া মাদ্রাসায় প্রশ্নের উত্তর সমাধান করে বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে তা পরীক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করতেন। এ প্রতারক চক্রটি নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পিয়নের মাধ্যমে ফাঁস করতো বলে দাবি করেছে বলে গতকাল দুপুরে সিআইডি কার্যারয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানানো হয়।

সিআইডি জানায়, চক্রটি জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্নজনের কাছে প্রশ্ন সরবরাহ করে অন্তত ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
সিআইডি’র অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, গত পাঁচ দিনের সাঁড়াশি অভিযানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নয় জনকে আটক করা হয়। তারা হলেন- জালিয়াতি চক্রের মাস্টারমাইন্ড বিকেএসপি’র সহকারী পরিচালক অলিপ কুমার বিশ্বাস, বিএডিসি’র সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল, ৩৬তম বিসিএসে নন ক্যাডার পদে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত ইব্রাহিম ও ৩৮তম বিসিএসের প্রিলিতে উত্তীর্ণ আইয়ূব আলী বাঁধন, রাজধানীর অগ্রণী স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক গোলাম মোহাম্মদ বাবুল, পিওন আনোয়ার হোসেন মজুমদার, নুরুল ইসলাম, ধানমন্ডি গভ. বয়েজ স্কুলের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হোসনে আরা বেগম ও পিওন হাসমত আলী শিকদার।

নজরুল ইসলাম জানান, অলিপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যায়ে ভর্তি পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতির মূলহোতা। কয়েক বছরে সে জালিয়াতির মাধ্যমে তিন কোটি টাকার বেশি আয় করেছে। আর ইব্রাহিম, মোস্তফা ও বাঁধন বিসিএসসহ সকল নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির মূলহোতা। এরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেই নয়; মেডিকেল, ব্যাংকসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করত। এ ছাড়া বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষাতেও প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছিল। এই চারজনের প্রায় ১০ কোটি টাকার নগদ অর্থ ও সম্পদের সন্ধান পেয়েছে সিআইডি।

ভর্তি কিংবা নিয়োগ পরীক্ষায় মূলত দুই ভাবে জালিয়াতি হয়। একটি চক্র আগের রাতে প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস করত। আরেকটি চক্র পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র নিয়ে। জিজ্ঞাসাবাদে অলিপ, ইব্রাহিম, বাঁধন ও মোস্তফা জানায়, কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন ফাঁসের পর আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাবি’র এফ রহমান হলের দু’টি কক্ষে বসে অভিজ্ঞদের দিয়ে সমাধান করে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে তারা পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করত। এই চারজন মূলত ডিজিটাল ডিভাইস চক্রে জড়িত। আর বাকি পাঁচজন (শিক্ষক ও পিয়ন) পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করত। গত বুধবার গ্রেফতারের সময় পিয়ন হাসমতের কাছে ৩৯তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার কয়েক কপি প্রশ্নপত্র এবং ৬০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে।

মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও সরকারি চাকরিতে শতাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছে চক্রটি। জালিয়াতির মাধ্যমে যারা নিয়োগ পেয়েছে, তাদের বেশ কয়েকজনের তথ্যও আমরা পেয়েছি। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিআইডি জানায়, আটকদের মধ্যে ইব্রাহিমের ছিল বিলাসী জীবন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও খুলনার মুজগুন্নী এলাকায় সাড়ে ছয় শতাংশ জমির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণ করেছে। নড়াইলে রয়েছে ডুপ্লেক্স বাড়ি। চলাচল করত ৩৬ লাখ টাকার দামি গাড়িতে। রাজধানীতে রূপালী মানি এক্সচেঞ্জ নামে তার একটি অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। সে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের ছিল। তবে তার যোগ্যতা না থাকলেও জালিয়াতির মাধ্যমে ৩৬ তম বিসিএসে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয় সে।

মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল চক্রটির মূল উৎপাটন করা। সর্বশেষ অভিযানে ৯ জনকে আটকের মধ্য দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। এ মামলায় (প্রশ্ন জালিয়াতি চক্রের) গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৭। এই সুবিশাল চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ফলে আনাগত দিনে ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনা হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সিআইডি’র এই কর্মকর্তা।


আরো সংবাদ