২৩ মার্চ ২০১৯

নারায়ণগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হত্যার নেপথ্য

নারায়ণগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হত্যার নেপথ্যে আর্থিক বিরোধ - সংগৃহীত

আর্থিক লেনদেনের বিরোধের জের ধরেই নারায়ণগঞ্জ শহরের কালীরবাজার এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষকে হত্যা করা হয়েছে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। আর এ নৃশংস হত্যাকান্ডে জড়িত প্রবীরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃত পিন্টু দেবনাথ ও তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিক বাবু। পুলিশ বলছে, পাওনা টাকা চাওয়া ও হিসাব নিয়ে বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবেই প্রবীরকে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের বক্তব্যের সাথে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছেন নিহতের বড় ভাই। তার দাবী, ব্যবসায়ীকে লেনদেন থাকতে পারে। কিন্তু পাওনা টাকা কিংবা এ ধরনের বিরোধের ঘটনা নেই।

সোমবার রাতে প্রবীর ঘোষের টুকরো টুকরো লাশ উদ্ধারের পর গতকাল দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মঈনুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূরে আলম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরফুদ্দিন প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পুলিশের তাদের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে প্রবীর ঘোষের এক ভাই সৌমিক ঘোষ ইতালী প্রবাসী। সেখান থেকে মোটা অংকের টাকা পাঠানো হয় প্রবীর ঘোষের কাছে। দীর্ঘদিন ধরে ওই টাকা লেনদেন হতো প্রবীর ও পিন্টুর মধ্যে। সম্প্রতি সৌমিক ঘোষ যখন দেশে আসে তখন থেকেই নিখোঁজ ছিল প্রবীর। সৌমিক দেশে আসার আগেই টাকার জন্য পিন্টুকে চাপ দিতে থাকে প্রবীর।

এসব নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। পরে পরিকল্পনা করেই প্রবীরকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে পিন্টু ও তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিক। প্রাথমিকভাবে এও ধারণা করা হচ্ছে পিন্টু যে বাসাতে থাকে সে বাসার ফ্লাটেই প্রবীরকে হত্যার পর ওই বাসার নিচে সেপটিক ট্যাংকে লাশ ব্যাগে করে ফেলে দেওয়া হয়। পরে পালিয়ে বাপেন কুমিল্লা সীমান্তবর্তী এলাকাতে চলে যায়। সেখান থেকে প্রবীরের মোবাইলের সীম ব্যবহার করে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্নজনের কাছে ম্যাসেজ পাঠায় বিষয়টি ভিন্ন দিকে নেওয়ার জন্য। তখন প্রবীরের সেই মোবাইল নাম্বারটি বন্ধ করে ফেলে বাপেন। পরবর্তীতে বাপেন শহরের কালীরবাজার চলে আসে।

সেখানে এসে মোবাইল সীম পরবর্তনের পর ট্র্যাকিংয়ে বাপেন ধরা পড়ে। সোমবার সকালে বাপেন ও প্রবীরকে আটক করা হলে বেরিয়ে আসে মূল তথ্য। বাপেনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রবীরের মোবাইল ফোন। এদিকে প্রবীর নিখোঁজের সময়ে পরিবারের কাছে বিভিন্ন সময়ে বিকাশ নাম্বার পাঠিয়ে একটি প্রতারক চক্র হাতিয়ে নেয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। তবে পুলিশের নজরদারির কারণে ওই টাকা বিকাশ একাউন্ট থেকে তুলতে পারেনি চক্রটি। এ চক্রের সঙ্গে পিন্টু ও বাপেনের কোন সম্পর্ক আছে কী না সেটা নিয়ে তদন্ত চলছে।


নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, মূলত প্রযুক্তি ব্যবহার করেই বাপেন ও পিন্টুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কী কী কারণে প্রবীরকে হত্যা করা হয়েছে তার আরো আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা চলছে।

ভিন্নমত বড় ভাইয়ের
নিহতের বড় ভাই বিপ্লব ঘোষ জানান, সে ও প্রবীর একই দোকানে বসে। তাদের এটা পারিবারিক ব্যবসা। স্বর্ণ পলিস করতো পিন্টু। সে হিসেবেই জানাশোনা। প্রবীর কখনো ইতালী প্রবাসীর টাকা পিন্টুর কাছে ছিল পরিবারকে জানায়নি। বরং পিন্টু অল্প দিনে প্রচুর টাকার মালিক বনে গেছে কিভাবে সেটা জানা দরকার। কয়েকদিন আগেও পিন্টু নতুন একটি দোকান কিনেছিল। ব্যবসায়ীক কোন ঘটনায় প্রবীরকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ শুধু ইতালির টাকার কারণেই হত্যাকান্ড ঘটেছে সেটা সঠিক না। আর ১৮ জুনের পর ৯ জুলাই লাশ উদ্ধার হয়েছে। প্রথমে সদর মডেল থানা পুলিশকে জানালেও তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। বরং ৬ জুলাই তদন্তভার ডিবিকে দেওয়ার তিনদিন পরেই ক্লু উদঘাটন হয়েছে। পুলিশ এখানে ব্যর্থ।

প্রিয় বন্ধু যেভাবে ভয়ংকর ঘাতক, খুন হয় ফ্লাটেই
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রবীর ঘোষের মালিকানা ভোলানাথ জুয়েলার্সের পাশেই পিন্টুর একটি স্বর্ণের দোকান রয়েছে। তাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘ বছরের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় আরো গাড় হয়। গত কয়েক বছরে পিন্টু দেবনাথ আক্রান্ত হয় কঠিন রোগে। একবার হয় স্ট্রোক আবার হয় হার্ট অ্যাটাক। দুবারই পিন্টু দেবনাথের অবস্থা হয় সংকটাপন্ন। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যখন পিন্টু দেবনাথ। ঠিক তখনই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধু প্রবীর ঘোষ। উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান ভারতের মাদ্রাজে। ওপেন হার্ট সার্জারী করা হয় সেখানে। সেই পিন্টু দেবনাথের বাড়ীর সেপটিক ট্যাংক থেকেই বন্ধু প্রবীর ঘোষের লাশ উদ্ধার। এ অবস্থা দেখে উপস্থিত সকলেই বলে উঠেছে বন্ধু বন্ধুকে এভাবে হত্যা করতে পারে। এমন কথা এখন আমলপাড়া এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ সকলের মুখে মুখে।

রিমান্ড
মঙ্গলবার গ্রেফতারকৃতদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফতাবুজ্জামানের আদালতে হাজির করা হলে আদালত শুনানী শেষে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের এসআই কামাল হোসেন এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

বিলাপ করে কাঁদছে পরিবার
ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষের পরিবারের খাওয়া ঠিকমত নেই গত ১৮ জুনের পর থেকেই। কারণ সেদিন থেকেই নিখোঁজ ছিল ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ। তাঁর সন্ধান দাবীতে ঘরের ভেতরে যখন কান্না তখন সেটা প্রকাশ পেয়েছিল সড়কেও। গত ৪ জুলাই প্রবীরের সন্ধান দাবীতে রাস্তায় নেমে এসেছিল প্রবীরের বাবা, মা, স্ত্রী আর দুই সন্তান। সেদিন তাঁদের হৃদয়বিদারক বক্তব্য আর চোখের নোনা জলে কেঁদেছিল সেখানে থাকা লোকজনও। শেষ পর্যন্ত সেই কান্নাই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়ালো তাদের জন্য। ২১ দিন পর জানা গেলে প্রবীর চলে গেছে না ফেরার দেশে। সোমবার রাতে লাশ উদ্ধারের পর পরিবারের আহাজারি যেন কিছুতেই থামছে না।

মঙ্গলবার দুপুরে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে প্রবীর ঘোষের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সকলে কাঁদছে বিলাপের সুরে।

কান্না জড়িত কণ্ঠে স্ত্রী রূপা ঘোষ বলেন, ‘আমার স্বামীকে তো আর ফেরত পাবো না। এখন আর আমার কথা বলে কী হবে। দুইটা মেয়েই সব সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করে তাদের বাবা কবে আসবে। কোথায় গেছে। বাসায় আসছে না কেনো। কোন উত্তর দিতে পারি না। ওদের কাছে বাবাই ছিল সব। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো।’

নিখোঁজ প্রবীর ঘোষের বাবা ভোলানাথ ঘোষ। বয়স প্রায় ৭০ বছর। মা দীপা রাণী ঘোষও প্রায় ৫০ বছর। দুইজনকেই চলাচলে কষ্ট হয়। বাড়িতে কান্নায় তারাও বার বার মূর্ছা যান।
মা দীপা রাণী ঘোষ বলেন, ‘আমাদের কেন এমন সর্বনাশটি করলে। আমার দুই নাতিকে কেমন করে এতিম করে দিল। কেন এমন হলো। আমরা তো কারো ক্ষতি করি নাই। কেন আমাদের এত বর্ড় সর্বনাশ হলো। আমরা এর বিচার চাই। আমি ওই খুনীদের ফাঁসি চাই। ফাঁসি না হলেও প্রবীরের আত্মা শান্তি পাবে না। আমাদের সব শেষ করে দিছে।’

ফ্লাশব্যাক
নিখোঁজের ২১ দিন পর সোমবার ৯ জুলাই রাত ১১টায় শহরের আমলপাড়া এলাকার পিন্টু যে বাড়িতে ভাড়া থাকতো সেই ৪ তলা ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রবীর ঘোষ কালীরবাজার ভোলানাথ জুয়েলার্সের মালিক। গত ১৮ জুন থেকে সে নিখোঁজ ছিল। তাঁর সন্ধান দাবীতে ২১ দিন ধরে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী, নিহতের স্বজন, বিভিন্ন সংগঠন ও পরিবারের লোকজন মানববন্ধন ও সমাবেশ করে আসছিল। এর মধ্যে নিহতের পরিবার প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও প্রদান করেছিল।

প্রবীর ঘোষ কালীরবাজার ভোলানাথ জুয়েলার্সের মালিক। গত ১৮ জুন থেকে সে নিখোঁজ ছিল। তাঁর সন্ধান দাবীতে ২১ দিন ধরে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী, নিহতের স্বজন, বিভিন্ন সংগঠন ও পরিবারের লোকজন মানববন্ধন ও সমাবেশ করে আসছিল। এর মধ্যে নিহতের পরিবার প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও প্রদান করেছিল।

 


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al