২১ জুন ২০১৮

শীর্ষসন্ত্রাসী থেকে ছিঁচকে মাস্তান : চাঁদাবাজিতে নেমেছে সবাই

শীর্ষসন্ত্রাসী থেকে ছিঁচকে মাস্তান : চাঁদাবাজিতে নেমেছে সবাই - ছবি : সংগৃহীত

ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন সেক্টরে দেদার চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। শীর্ষসন্ত্রাসী থেকে ফুটপাথের ছিঁচকে মাস্তান; সবাই চাঁদাবাজিতে নেমেছে। পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলেছেন, চাঁদাবাজির কারণে পরিবহন সেক্টরে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোনো কোনো এলাকায় পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর ফুটপাথ থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চাঁদা হাতিয়ে নিচ্ছে সঙ্ঘবদ্ধ চক্র।

ঈদ এলেই ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিসহ সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে পরিবহন খাতে। এই খাতের চাঁদাবাজেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। রাস্তায় রাস্তায়, মোড়ে মোড়ে গাড়ি থামিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় করে। বিভিন্ন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে এই চাঁদা আদায় হয়। কোনো কোনো এলাকায় কিছু পুলিশ সদস্য বখরা নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, রাজধানীর সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী, গুলিস্তান, কমলাপুর, মিরপুরসহ সব ক’টি টার্মিনালে এখন চাঁদাবাজদের আনাগোনা। হিসাব করে নানা ফান্ডের নামে চাঁদা আদায় হচ্ছে প্রতিটি গাড়ি থেকে। এমনকি কোনো কোনো টার্মিনালে কমিউনিটি পুলিশের নামেও চাঁদা আদায় হচ্ছে। রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার এক পরিবহন কোম্পানির ম্যানেজার বলেছেন, ইফতারি বাবদ প্রতিটি গাড়ি থেকে ২০ টাকা হারে চাঁদা নেয়া হয়। কে বা কারা এই ইফতারি করছে তা জানারও অধিকার নেই কারো। ওই ম্যানেজার বলেন, এই টাকা যাচ্ছে চাঁদাবাজদের পেটে। উত্তরবঙ্গ থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আসতে ১৮ শ’ থেকে ২২ শ’ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে। মালিক-শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নামেই এই চাঁদা উত্তোলন হচ্ছে বলে অভিযোগ। একাধিক মালিক ও শ্রমিক বলেছেন, বগুড়ায় শ্রমিক ইউনিয়নের নামে আদায় করা হচ্ছে সাড়ে ৪ শ’ টাকা। একইভাবে রাজশাহীতে আদায় করা হচ্ছে সাড়ে ৪ শ’ টাকা। টাঙ্গাইল বাইপাস এলাকায় আদায় করা হচ্ছে ১৭০ টাকা।

এভাবে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চাঁদা আদায় হচ্ছে। খুলনা ও বরিশাল থেকে একটি গাড়ি ঢাকায় আসতে বিভিন্ন স্থানে এক হাজার টাকার ওপরে চাঁদা দিতে হয়। বরিশালের রূপাতলী, মেডিক্যাল মোড়, মাদারীপুর, শরীয়তপুর এবং ভাঙ্গায় চাঁদা দিতে হয়। বাড়তি টোল দিতে হয় ফেরিঘাটে। সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় হচ্ছে সিলেট টার্মিনালে। এই টার্মিনালের চাঁদাবাজদের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ রেখেছিলেন মালিক-শ্রমিকেরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সায়েদাবাদ, শিমরাইল, কাঁচপুর ব্রিজের দুই পাড়ে এবং তারাবো এলাকায় চাঁদা দিতে হয় বলে একাধিক পরিবহন শ্রমিক বলেছেন। কাচপুরের ওপারে এক শ’ টাকা, এপারে ৭০ টাকা, তারাবোতে এক শ’ টাকা চাঁদা দিতে হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। রাজধানীর টার্মিনালগুলো থেকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মালিক ও শ্রমিক বলেছেন, চাঁদা আদায় হয় মালিক ও শ্রমিকদের কল্যাণে। কিন্তু ওই টাকায় কারো কোনো দিন কল্যাণ হয়েছে বলে জানা নেই।

বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন সেক্টরে ঈদকে সামনে রেখে চাঁদাবাজি চলছে। কোনো কোনো এলাকায় পুলিশও চাঁদাবাজি করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, এই চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। না হলে পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণের নামে এই চাঁদাবাজি চললেও এই টাকা মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় হয় না। তিনি বলেন, চাঁদাবাজির কারণে এই সেক্টর স্থবির হয়ে পড়তে পারে। ঈদ এলেই ফেরিঘাট ও টোলপ্লাজায় বাড়তি চাঁদাবাজি শুরু হয়ে যায়। পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা তখন চরম বিপাকে পড়েন। 

তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে তিনটি সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে বলে মালিক-শ্রমিকেরা অভিযোগ করেছেন। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, ট্রাকস্ট্যান্ডে ঢুকতে এবং বের হতে গড়ে তিন শ’ টাকা চাঁদা দিতে হয়। কাওরানবাজার এলাকায় কয়েকটি গ্রুপ পাল্লা দিয়ে চাঁদাবাজি করছে। এখানে ট্রাক থেকে শুরু করে রিকশাভ্যান পর্যন্ত চাঁদাবাজির আওতায়। এখানে রাতভর চলে চাঁদাবাজি।

চাঁদাবাজদের গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি হচ্ছে রাজধানীসহ দেশের সব ফুটপাথ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথ থেকে যারা নিয়মিত অর্থ আদায় করছে তারা বরাবরই বহাল তবিয়তে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের সাথে পুলিশের কিছু সদস্যের সখ্য থাকায় ওই সব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন স্থানে লাইনম্যানরা চাঁদা উত্তোলন করে তা বিভিন্ন মহলে ভাগ করে দেয়। রাজধানীর এমন কোনো ফুটপাথ নেই যেখানে চাঁদাবাজি হচ্ছে না। চাঁদাবাজির প্রসার ঘটাতে লাইনম্যানরা রাস্তায়ও হকার বসিয়েছে। বাংলাদেশ হকার ফেডারেশনের সভাপতি ও হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম বলেছেন, ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণ করে লাইনম্যানরা। লাইনম্যান নামক চাঁদাবাজেরাই হকার বসায়। একজন হকার বসাতে পারলেই লাইনম্যানের বর্তমানে দিনে ১০০-২০০ টাকা উপার্জন। তিনি বলেন, চাঁদা এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ভুক্তভোগী হকারেরা বলেন, ফুটপাথে কারা চাঁদাবাজি করে পুলিশ তা জানে। কিন্তু পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে না। এমনকি, অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে। কিন্তু তার পরেও পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করছে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেলের ডিসি মাসুদুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে অবশ্যই পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।


আরো সংবাদ