২১ জুন ২০১৮

ফ্ল্যাটে টাঁকশাল! অবশেষে যেভাবে শিকার জালে

ফ্ল্যাটে টাঁকশাল! অবশেষে যেভাবে শিকার জালে - ছবি : সংগৃহীত

বাগেরহাটের কচুয়ার জাকির হোসেন। গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন কাজের সন্ধানে। উত্তরায় হাউজ বিল্ডিং এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন তিনি। ২০১৫ সালে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেলে পরিচয় হয় স্থানীয় রফিকের সাথে। একপর্যায়ে ভালো বেতনে কাজ করার প্রলোভন দিয়ে জাকিরকে নারায়ণগঞ্জে ডাকেন রফিক। সেখানে গিয়ে জাকির দেখতে পান জাল নোটের কারখানা। জাকির একটু আধটু করে শিখতে থাকেন জাল নোট তৈরি ও কারবারি। প্রথমে ১০ হাজার টাকা বেতন দেবেন আর কাজ শেখা হয়ে গেলে বেতন ৩০ থেকে ৪০ হাজার হবে এই চুক্তিতে কাজ শুরু করেন তিনি। এর কিছু দিনের মাথায় রফিক ও জাকির ধরা পড়ে গোয়েন্দাদের হাতে। ছয় মাস জেল খাটার পর জামিনে বেরিয়ে আবারো একই কাজ শুরু করে তারা। রাজধানীর শ্যামপুরে বৌবাজার এলাকায় একটি পাঁচতলার বাড়ির পাঁচতলার ফ্যাট ভাড়া নিয়ে এই জাল নোটের টাঁকশাল গড়ে তোলে এ চক্র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এই অসাধু কারবার ধরা পড়ে গোয়েন্দা পুলিশের জালে।
গোয়েন্দারা জানান, রফিক হচ্ছে ওই জাল নোট কারখানার মূল হোতা। তার টিমে পাঁচজন কাজ করেন। আর বাইরে টাকাটা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বেশ কয়েকটি টিম রয়েছে।

জাল নোট তৈরিকারী চক্রের এক সদস্য জানিয়েছেন, প্রতি এক শ’ পিস ১০০০ টাকার নোট অর্থাৎ এক লাখ টাকা তৈরি করতে তাদের খরচ পড়ে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। সেই টাকা তারা আবার ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে।

গতকাল দুপুরে ওই বাড়ির পাঁচতলার ফ্যাটে অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরি করা অবস্থায় গ্রেফতার করা হয় জাকির, রফিকসহ পাঁচজনকে। গ্রেফতার অন্যরা হলো- গাজী মিয়া (৪০), শাহিন আকন্দ (৩৫) ও জাল নোট বানানোর কারিগর শুক্কুর আলী রাজু (৩০)।
ওই ফ্যাটে দেখা যায়, যখন গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান চলছিল তখনো ওই ফ্যাটের দুই রুমে জাল নোট তৈরির কার্যক্রম চলছিল। কারবারিরা গ্রেফতার এড়াতে বা সাধারণ মানুষের চোখ এড়াতে ওই ফ্যাটে পরিবার নিয়েই বাস করত। একটি রুমে ঢুকে দেখা যায় মেঝেতে একটি ল্যাপটপ ও দু’টি কালো প্রিন্টার। পাশেই জাল নোট তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখা আছে। দেখা গেছে, একটি এ ফোর সাইজের সাদা কাগজে চারটি করে ১ হাজার টাকার নোট প্রিন্ট হয়। একটি প্রিন্টারে ১ হাজার টাকার জাল নোটের চারটি নোট প্রিন্ট হচ্ছে। অপর প্রিন্টারে ওই এক হাজার টাকার নোটের অপর সাইড প্রিন্ট হচ্ছে। এরপর কাঁচি দিয়ে মাপমতো কেটে বান্ডিল করা হচ্ছে জাল নোটের। এর আগে ওই সাদা কাগজে বিশেষ কায়দায় সিকিউরিটি লিস, নিরাপত্তা সূচক কিছু চিহ্ন ও সুতা সেঁটে দেয়া হয়। তারপর ওই কাগজ প্রিন্টারে দিলেই বেরিয়ে আসে অবিকল এক হাজার টাকার নোটের মতো জাল নোট। ওই সময় দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে অন্য তিনজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দারা।

জানা গেছে, টাকা তৈরির জন্য প্রথমে টিস্যু কাগজের এক পাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিচ্ছবি স্ক্রিনের নিচে রেখে গাম দিয়ে ছাপ দিতে হয়। এরপর ১০০০ লেখা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রামের ছাপ দেয়া হয়। এরপর অপর একটি টিস্যু পেপার নিয়ে তার সাথে ফয়েল পেপার থেকে টাকার পরিমাপ অনুযায়ী নিরাপত্তা সুতা কেটে তাতে লাগিয়ে সেই টিস্যুটি ইতঃপূর্বে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি জলছাপ দেয়া টিস্যু পেপারের সাথে গাম দিয়ে সংযুক্ত করে দিত। এভাবে টিস্যু পেপার প্রস্তুত করে বিশেষ ডট কালার প্রিন্টারের মাধ্যমে ল্যাপটপে সেভ করা টাকার ছাপ অনুযায়ী প্রিন্ট করা হতো। ওই টিস্যু পেপারের উভয় সাইড প্রিন্ট করা হতো এবং প্রতিটি টিস্যু পেপারে মোট চারটি জাল নোট প্রিন্ট করা হতো। এরপর প্রিন্টকৃত টিস্যু পেপারগুলো কাটিং গ্লাসের ওপরে রেখে নিখুঁতভাবে কাটিং করা হতো। পরে কাটিংকৃত জাল নোটগুলো বিশেষভাবে বান্ডিল করে এটি চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। এ চক্রটির কাছ থেকে টাকা তৈরির যে পরিমাণ খালি কাগজ ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে তা দিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার জাল নোট তৈরি করা যেত বলে জানিয়েছেন অভিযানে থাকা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (উত্তর) মশিউর রহমান।

তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারা দেশে জাল নোট তৈরি চক্রটির তৎপরতা অতিমাত্রায় বেড়ে যায়। তাই গোয়েন্দারা এ চক্রকে শনাক্তে তদন্তে নামে। তারই ধারাবাহিকতায় ওই ফ্যাটে অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরি চক্রের মূল হোতাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি বলেন, দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই অভিযানে ৪৬ লাখ জাল নোট জব্দ করা হয়েছে। যত কাগজ ও কালি উদ্ধার করা হয়েছে তা দিয়ে অন্তত আড়াই কোটি জাল নোট বানানো যাবে।

তিনি বলেন, ঈদ সামনে রেখে এই জাল নোটের চক্র যত টাকা বাজারে ছেড়েছে, তার পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রফিক আরো জানায়, প্রায় ১০ বছর হলো এই কারবার করছে সে। এর আগে আরো দুইবার ধরা পড়েছিল সে। প্রতি ১০ লাখ টাকা বানাতে খরচ হয় মাত্র সাত হাজার টাকা। আর প্রতি এক লাখ টাকা বিক্রি হয় মাত্র ১০ হাজার টাকায়। সেটি দ্বিতীয় ধাপে গিয়ে বিক্রি হয় ২২ হাজার টাকায়।

 


আরো সংবাদ