১৭ আগস্ট ২০১৮

ফুটপাথে দিনে ৩ কোটি টাকা চাঁদাবাজি

ফুটপাথে দিনে ৩ কোটি টাকা চাঁদাবাজি - ছবি : সংগৃহীত

ফুটপাথে চাঁদাবাজি করছে অন্তত ৭০টি গ্রুপ। দিনে কম করে হলেও তিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে টাকা আদায়ে তৎপর রয়েছেন ৫ শতাধিক লাইনম্যান। ঈদ ঘিরে চাঁদাবাজিতে পিছিয়ে নেই মাঠপর্যায়ের পুলিশ-আনসার সদস্যসহ বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির কিছু নেতা। ইতোমধ্যেই এককালীন টাকা নিয়ে ফুটপাথে দোকান বসিয়ে ভাড়া দিয়েছে সঙ্ঘবদ্ধ এসব চাঁদাবাজচক্র। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও আইনের ফাঁক গলিয়ে ফের ফুটপাথ দখলসহ চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছেন।

হকার সূত্র জানায়, ঈদ সামনে রেখে প্রতিটি এলাকায় দৈনিক চাঁদার হার বেড়েছে কয়েক গুণ। এ ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথ, খাসজমি ও মালিকানা জমিতে মেলার নামে নতুন নতুন দোকান বসিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। মওসুমি হকার মিলিয়ে ঢাকায় বর্তমানে তিন লাখের মতো হকার রয়েছে বলে জানা গেছে। গড়ে প্রতি হকারের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে এক শ’ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ফুটপাথ থেকে ৫ শতাধিক ব্যক্তি নিয়মিত চাঁদার টাকা তুলছেন। চাঁদাবাজরা এলাকাভেদে ২ থেকে ৩ শ’ দোকানের একটি অংশকে নাম দিয়েছেন ‘ফুট’। চক্রাকারে ফুটের হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদার টাকা নিচ্ছেন চাঁদাবাজ গ্রুপের নিয়োজিত লাইনম্যানরা।

ঢাকা গভ. নিউমার্কেট সংলগ্ন ঢাকা নিউ সুপার (দক্ষিণ) মার্কেটে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গভ. ঢাকা নিউমার্কেটের ৩ নম্বর গেট সংলগ্ন নিউ সুপার মার্কেটের দোতলায় রয়েছে ঢাকা নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) বণিক সমিতির অফিস। এর সামনেই মার্কেটে আলো-বাতাস প্রবেশে গ্রিলঘেরা খোলা জায়গা। কিন্তু সমিতির কিছু অসাদু কর্মকর্তা মার্কেটের সব ক’টি প্রবেশপথ, খোলা জায়গা ও সিঁড়িকোঠাসহ সব মিলিয়ে দেড় শতাধিক ফুটপাথের দোকান বসিয়ে ভাড়া দিয়েছে। অফেরতযোগ্য এককালীন ঘোষণায় দোকানপ্রতি ২ লাখ টাকা আদায়সহ প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে নিয়মিত ভাড়া তুলছেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সাগর ও প্রচার সম্পাদক ফরমান মোল্লা। ওই নেতা মার্কেটের বিভিন্ন স্পটে গাড়িপার্কিং থেকেও ডিএসসিসির বিধি উপেক্ষা করে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রমজান শুরুর আগেই সমিতির নেতারা যৌথভাবে মার্কেটের নিচতলায় মাঝামাঝি খোলা জায়গার চার পাশে নতুন করে আরো ৮-১০টি দোকান বসিয়ে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া দিয়েছেন।

এ দিকে ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটের এক ব্যবসায়ী জানান, মিরপুর রোডের ধানমণ্ডি ও নিউমার্কেট অংশে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কিছু ক্যাডার ফুটপাথসহ মার্কেটের ফাঁকা জায়গায় দোকান বসিয়ে নিয়মিত চাঁদা তোলে। ছাত্রদের উৎপাত সারা বছর তো থাকেই, তবুও ঈদ এলে ছাত্রধারী এসব ক্যাডার আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কামরাঙ্গীরচর রসুলপুর ব্রিজ মার্কেটের দু’টি ব্যক্তিমালিকানা জমিতে অনুমোদন ছাড়াই জবর দখল করে ঈদ বাণিজ্য মেলার নামে প্রায় ৬০টি দোকান বসিয়ে ভাড়া দিয়েছেন স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিচয়দানকারী মাউচ্ছা দেলু, জাবেদুল ইসলাম জাবেদ ওরফে সমিতি জাবেদ, মফিজ, খোকন, কামাল, অহিদুল, বাবু, হানিফ, সিদ্দিক, বাদশা, মঞ্জু, ফিরোজ, সুমন, মাসুদ, মামুন, মুসা, শাকিল, মনির ও সিরাজ তালুকদার। ইতোমধ্যে দোকানপ্রতি ৫ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন মওসুমি এসব চাঁদাবাজগ্রুপ।

লালবাগের নবাবগঞ্জ বেড়িবাঁধে মঙ্গলবার হলিডে মার্কেটের অন্তত ২ হাজার ফুট দোকান থেকে দোকানপ্রতি গড়ে আড়াই শ’ টাকা করে প্রতি সপ্তাহে ৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলেন শাসক দলের নেতা পরিচয়দানকারী হাফেজ সুমন, জাকির, শাহীন ওরফে অটোশাহীন, বারেক, সেলিম, বিপ্লব ও মোকলেস। এ ছাড়া চোরাই মোবাইল মার্কেট ও ভান্ডারী ফেরদৌসসহ কয়েকটি গ্যারেজ থেকে কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি শাহীন ফকির দৈনিক ৫ শ’ টাকা হারে মাসিক ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা গ্রহণ করেন। একই স্পট থেকে ওসির নির্দেশে গ্যারেজ মালিককে আরো বাড়তি ৮ হাজার টাকা করে সিরাজ নামে কথিত এক নেতাকে দিতে হয় বলে জানিয়েছেন ভান্ডারী ফেরদৌস। এ ছাড়া বংশাল ও কোতোয়ালিতে মেহেদীর নেতৃত্বে ফুটপাথের ৫ হাজার দোকান থেকে দৈনিক ১২০ টাকা হারে প্রতিদিন চাঁদা তুলছেন লাইনম্যান মিরাজ, জসিম, আলম ও ইউনুস। চাঁদার ভাগ পাচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তা বজলু, হুমায়ুনসহ থানা-ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা।

ফুটপাথ-সড়কে অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করার অভিযোগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মতিঝিল, পল্টন ও শাহবাগ থানায় ৭২ চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা করেন ডিএসসিসি সহকারী সম্পত্তি কর্মকর্তা মুহাম্মদ সামছুল আলম। মতিঝিলের এক মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম মোল্লা ফুটপাথে এখনো বহাল তবিয়তে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের পাশের মার্কেটে চাঁদা আদায় করছে তার সহযোগী শিবলু ও শাহজাহান মৃধা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বায়তুল মোকাররম জিপিও লিংক রোডে হলিডে মার্কেটে খোকন মজুমদার, আবুল হাসেম, মজিবর, পোটল, নসু, হারুন অর রশীদ ও তার সহযোগীরা, উত্তরগেট এলাকায় দুম্বা রহিম, সাজু চাঁদা তুলছেন। শাপলা চত্বরে আরিফ চৌধুরী, পল্টনে দুলাল মিয়া ও তার সহযোগী, গুলিস্তান আহাদ পুলিশ বক্স ও রাস্তায় আমিন মিয়া, সাহিদ ও লম্বা হারুন, জুতাপট্টিতে সালেক, গোলাপশাহ মাজারের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে ঘাউড়া বাবুল ও শাহীন টাকা তুলছেন।

ওসমানী উদ্যানের পূর্ব ও উত্তর অংশে লম্বা শাজাহান, গুলিস্তান খদ্দর মার্কেটের পশ্চিমে কাদের ও উত্তরে হান্নান, পূর্বে সালাম, আক্তার ও জাহাঙ্গীর, গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনের রাস্তায় লাইনম্যান সর্দার বাবুল, সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের উত্তর পাশের রাস্তায় জজ মিয়া, পূর্ব পাশের রাস্তায় সেলিম মিয়া, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে মো: আলী, আবদুল গফুর ও বাবুল ভুঁইয়া, শাহবাগে ফজর আলী, আকাশ, কালাম ও নুর ইসলাম, যাত্রাবাড়ীতে সোনামিয়া, তোরাব আলী, মান্নান টাকা তোলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জুরাইন-পোস্তগোলায় খায়রুল, সিরাজ তালুকদার ও গরু হানিফ, লালবাগে আবদুস সামাদ, চানমিয়া ও ফিরোজ, মিরপুরে-১-এ ছোট জুয়েল, আলী, বাদশা ও মিজান, মিরপর-১১ এ আবদুল ওয়াদুদ, শফিক ও হানিফ, গুলশানে হাকিম আলী, কুড়িলে আবদুর রহীম ও নুরুল আমিন, এয়ারপোর্টে আকতার, মনির, ইব্রাহিম, জামাল ও বাবুল, উত্তরায় টিপু, নাসির ও হামিদ।

গুলিস্তানের এক লাইনম্যান জানান, এক হাজার টাকা তুললে তাকে দেয়া হয় ২ শ’ টাকা। পুলিশ নেয় ৫ শ’, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা পান ৩ শ’ টাকা। প্রতি রাতে থানার ক্যাশিয়ার এসে ভাগের টাকা নিয়ে যান। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের টাকা পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে যারা চাঁদার টাকা গ্রহণ করেন, তাদের কোনো নেতাকর্মীর নাম প্রকাশে রাজি হননি ওই লাইনম্যান।
হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি আবুল কাশেম জানান, রাস্তা দখল করে ফুটপাথ বসিয়ে চাঁদাবাজির বিষয়ে বহুবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। মামলাও করা হয়েছে। কাজ হয়নি।
এ দিকে ডিএমপির মিডিয়া সেলের ডিসি মাসুদুর রহমান জানান, চাঁদাবাজদের ব্যাপারে কোনোই ছাড় নেই। চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।


আরো সংবাদ