১৭ জানুয়ারি ২০২০

পুঁজিবাজারে সর্বশান্ত লাখ লাখ বিনিয়োগকারী

জরুরি বৈঠক ডেকেছে অর্থমন্ত্রণালয়
পুঁজিবাজারে সর্বশান্ত লাখ লাখ বিনিয়োগকারী - ছবি : সংগৃহীত

ভয়াবহ ধস নেমেছে পুঁজিবাজারে। অব্যাহত দরপতনে গতকাল দেশের দুই বাজারের সব সূচক নেমে গেছে ভিত্তি পয়েন্টের নিচে। এর পরও পতন থামবে কিনা তা জানা নেই কারো। প্রতিদিন বাজারের বড় পতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি প্রায় নিশ্বেস হয়ে গেছে। ফলে হতাশা আর ক্ষোভে মামলার ভয়কে উপেক্ষা করে মঙ্গলবার আবারও রাস্তায় নেমে আসেন তারা।

ডিএসইর সামনে বিক্ষোভ থেকে তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করেন।

আর বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারের আচরন স্বাভাবিক নয়। শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে তা বলা মুশকিল। বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাই পতনের মূল কারণ। সরকারের নানা আশ্বাসে ভরসা পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। শেয়ারবাজার ভালো হবে, হচ্ছে- এমন প্রতিশ্রুতি শুনে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী বাজারে বিনিয়োগ করে এখন প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। তার উপর ব্যাংক খাতে চলছে দুরাবস্থা। এতে তারল্য সংকটে পড়েছে বাজার। কোন কোন বিম্লেষক মনে করছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা, বাজারে সুশাসনের অভাব, ডিএসইর এমডি নিয়োগে জটিলতা ইত্যাদি বিষয়গুলোও পুঁজিবাজারকে গভীর খাদে নামানোর জন্য দায়ী।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোমবার লেনদেন শেষে ডিএসইএক্স সূচকটি ৮৯ পয়েন্ট কমে নেমে আসে ৫৬ মাস আগের অবস্থানে। তবে সূচক প্রায় ৫ বছরের কম হলেও অধিকাংশ শেয়ারের দাম ৯ বছর আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। সোমবার লেনদেন শেষে সূচকটির অবস্থান হয় ৪ হাজার ১২৩ পয়েন্ট। গতকাল আবারও ৮৭টি পয়েন্ট কমল সূচকটি। এতে ২০১৩ সালে জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ৪০৫৫ ভিত্তি পয়েন্টের নিচে নেমে আসলো। এছাড়া গত এক বছরের ব্যবধানে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে এক লাখ কোটি টাকা। গত বছরের ১৪ জানুয়ারি ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৪ লাখ ১৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। আর আজ দিন শেষে তা নেমে এসেছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকায়।

এবিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারে যে বড় দরপতন হচ্ছে এর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বিনিয়োগকারীরা হুজুগে শেয়ার বিক্রি করছেন। অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম এখন অনেক নিচে নেমে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড পাবলিক পলিসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, বাজারের ওপর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে যে তারা আর কোনো ভরসা পাচ্ছেন না। সর্বশেষ ডিএসইর এমডি নিয়োগ নিয়ে বোর্ড সভায় যে ঘটনা ঘটছে তা পত্রিকা মারফত আমরা জানতে পেরেছি। এগুলোও বিনিয়োগকরীদের মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে যে, যারা কারসাজি করে, যারা মার্কেট নষ্ট করে তারা খুব তৎপর। এরা নিজেদের লোকজন নিয়ে আসতে চাচ্ছে ডিএসইর ম্যানেজমেন্টে। এটা বিনিয়োগকারীদের জন্য অশনি সংকেত’ বলেন এই শেয়ারবাজার বিশ্লেষক। তিনি বলেন, এর সঙ্গে শেয়ারবাজারে সংকট তৈরি হওয়ার আরও অনেকগুলো কারণ আছে। যেমন- আমাদের মানি মার্কেটে তারল্য সংকট, সুদের হার বেশি, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট, সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে সুশাসনের প্রকট সংকট। কেন যেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, ডিএসই প্রতিযোগিতা করে দুঃশাসন নিয়ে আসছে বিনিয়োগকারীদের জন্য।

ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আমরা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছি। গ্রামীণফোনসহ জটিল বিষয়গুলো আমরা বৈঠকে তুলে ধরেছি। এসব বৈঠক সুফল বয়ে আনেনি। বাজারের মূল সমস্যাগুলো আমরা চিহ্নিত করতে পারলেও তার সমাধান হয়নি। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। গ্রামীণফোনের সমস্যার সমাধান হয়নি। এতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারের যে দরপতন হয়েছে, তাতে আমাদের কিছু করার ছিল না। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতা ছাড়া বাজারের এ পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণ কষ্টকর।

এদিকে মামলার ভয়কে দূরে ঠেলে শেয়ারবাজারের ভয়াবহ দরপতনের প্রতিবাদে আবারও মতিঝিলে অবস্থিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আগের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন বিনিয়োগকারীরা। মঙ্গলবার দুপুরে ‘বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ’র ব্যানারে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ থেকে বরাবরের মতো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানানো হয়।

এর আগে দরপতনের প্রতিবাদে দিনের পর দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ করায় গত ২৭ আগস্ট ডিএসইর পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। সাধারণ ডায়রিতে বলা হয়েছিল, ২৭ আগস্ট আনুমানিক দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বাংলাদেশ পুঁজিবাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে ৯-১০ জন লোক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের সামনে ব্যানার ও মাইকসহ বিক্ষোভ মিছিল করে। ফলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াত এবং অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পাদনে বিঘ্ন ঘটে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বেশ কিছুদিন ধরে তারা এ ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আসছে এবং পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পর্কে সম্মানহানিকর মন্তব্য করছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ মনে করে এ ধরনের কার্যকলাপ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ পুঁজিবাজারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে। ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলে সাধারণ ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিএসইর পক্ষ থেকে এই সাধারণ ডায়েরি করা হলে বন্ধ হয়ে যায় বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের বিক্ষোভ। তবে শেয়ারবাজারে চলতে থাকে দরপতন। দরপতনের ধারা সম্প্রতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করলে গতকাল আবার রাস্তায় নামেন তারা। এসময় বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী বলেন, বিএসইসির এই চেয়ারম্যানকে দায়িত্বে রেখে শেয়ারবাজার ভালো করা যাবে না। আমরা বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগ চাই। সেই সঙ্গে পুরো কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।

অর্থমন্ত্রীর বৈঠক : পুঁজিবাজারের অস্থিরতার মধ্যে এ নিয়ে ‘জরুরি’ বৈঠক ডেকেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী ২০ জানুয়ারি দুপুরে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপ-সচিব ড. নাহিদ হোসেনের সই করা এক চিঠি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে উশ্লেখ করা হয়েছে, পুঁজিবাজার উন্নয়নে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে অংশীজনের মতবিনিময় সভার প্রস্তাবনার যথাযথ বাস্তবায়নকাজ সমন্বয় ও তদারকির জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের গঠিত কমিটি এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনার জন্য আগামী ২০ জানুয়ারি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হবে। কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব মাকসুরা নূরের সভাপতিত্বে দুপুর ২টায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদ কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. মাসুদ বিশ্বাস, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।


আরো সংবাদ

একদিনের ক্রিকেটে নতুন রেকর্ড গড়লেন রোহিত শর্মা ‘সোনার বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে হবে’ ঢাকা সিটি নির্বাচনের তারিখের বিষয়টি ইসির : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি দীপু জাপার যুগ্ম মহাসচিব ময়মনসিংহে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত : ভৈরব-চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে ফিলিস্তিন এবার জন্ম নিল সবুজ রঙের কুকুর, হতবাক নেটদুনিয়া উচ্চতর গণিত বইয়ে ত্রুটি, বিপাকে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ দলটি অনেক বেশি ভয়ংকর : মিসবাহ উদ্ভট ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ৭ জনকে হত্যা, শরীরে বাইবেল বেঁধে নির্যাতন শনিবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচারণা চালাবেন ইশরাক

সকল