১৪ নভেম্বর ২০১৯

রাজনীতির শিকার সাকিব!

রাজনীতির শিকার সাকিব! - ছবি : এএফপি

কালো মেঘ, ভারি বর্ষন, ঝড় এরপর টর্নেডো। গত কয়েকদিন বাংলাদেশের ক্রিকেটের উপর দিয়ে এগুলো সবই বয়ে গেছে। সর্বশেষ টর্নেডোর মধ্যদিয়ে ঘটেছে সমাপ্তি। কিন্তু যে ধ্বংসলীলা রেখে গেছে ওই টর্নেডো, তাতে এর রেশ কতবছর বয়ে বেড়াতে হবে সেটা সামনের পরিস্থিতিতে অনুধাবন করা যাবে। টর্নেডোর নাম ‘ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব না জানানো’। আর তাতে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ তথা বিশে^র অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেট।

বাংলাদেশের ক্রিকেট এ জন্য যে, এ দেশের ক্রিকেট যতটুকু সাফল্য পেয়েছে তা অর্জনে বেশী অবদান রেখেছে সাকিব আল হাসানের মাঠের পারফরমেন্স। সাফল্যের এই কারিগরকে যখন ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে ফেলে নির্বাসনে বা মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে, তখন দেশের ক্রিকেট কিভাবে ভাল কিছুর স্বপ্ন দেখবে? তার দুই বছরের শাস্তির মধ্যে এক বছর মাঠের বাইরে থেকে সব শর্ত ঠিকমত পালন করলে দ্বিতীয় বছরে খেলতে পারবেন। কিন্তু এই একটি বছর বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেট এ এক বছর খুবই ব্যস্ত সময় পার করবে। এ সময়টায় সাকিববিহীন বাংলাদেশ দল ‘জিম্বাবুয়ে’ হয়ে যায় কি-না সেটাই বড় শঙ্কার ব্যাপার। কারন সব ম্যাচেই সাকিব ও মাশরাফি ফ্রন্ট লাইনে থাকতেন। মাশরাফি অবসরের চিন্তা নিয়ে বসে আছেন। সাকিবের এ অবস্থা। তাহলে হাল ধরবে কে?

বিষয়গুলো দেশের ক্রিকেটাররাও অনুধাবন করেছেন। ফলে দলে সাকিবের অনুপস্থিতিতে জাতীয় দলের ও প্রথম শ্রেনীর লীগে খেলা ক্রিকেটররা সবাই মর্মাহত। দল সাফল্য পেলে সবাই অনুপ্রানিত হন, ব্যর্থ হলে সবাই মনমরা হয়ে যান। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করলো বাংলাদেশ টি-২০ স্কোয়াড।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের উত্থান ২০১৫ বিশ^কাপ থেকেই। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের ওই আসরে বাংলাদেশ নজর কাড়ে সবার। এরপর দেশে ফিরে যেন অন্য এক বাংলাদেশ। অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তারা। যাতে অগ্রনী ভুমিকায় সাকিব মাশরাফিরা। মাশরাফি ইনজুরি ও বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়েছেন সত্য। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে তার জনপ্রতিনিধির (সংসদ সদস্য) দায়িত্ব। ক্রিকেট থেকে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দূরে চলে যাচ্ছেন তিনি। এখনও ওয়ানডে ক্যাপ্টেন তিনি। কিন্তু সেটাও ছেড়ে দিতে চাইছেন। এরমধ্যেই হঠাৎ করে চলে এল সাকিব ইস্যু। এরপর ফ্রন্ট লাইনে থেকে দলকে পথ দেখাবেন কে?

সাকিবের অবর্তমানে টি-২০ ক্রিকেটের অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ ও টেস্টে মুমিনুল হক। কিন্তু তারা কী সত্যিকার অর্থে সাকিবের বিকল্প? সাকিব একের মধ্যে দুই শুধু না, তিন। ব্যাটসম্যান, বোলার ও দক্ষ অধিনায়ক। তার বিকল্প কোথায় মিলবে? কষ্টটা এখানেই। অন্যসব দেশে সব খেলোয়াড়ই প্রায় সমসাময়িক। কিন্তু বাংলাদেশে এমনটা নেই। মাশরাফির বিকল্প সবাই সাইফউদ্দিনকে ভেবেছিলেন। কিন্তু ইনজুরিতে তিনি মাঠের বাইরে। মাশরাফির ক্যাপ্টেন্সীর গুনটা তো গোটা বিশে^ই খুজে পাওয়া যাবেনা। সাকিব তো সাকিবই। সাকিব বিহীন বাংলাদেশ খেলতে হবে ভারতে পুর্নাঙ্গ সফর, সম্ভাব্য পাকিস্তান সফর, ফেব্রুয়ারী মাসে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সিরিজ যা পরিবর্তিত হয়ে জুনে হওয়ার কথা), জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ, আয়ারল্যান্ড সফর, শ্রীলঙ্কা সফর, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে দুই দফা সিরিজ এবং টি-২০ বিশ্বকাপ।

এখানে কোন সিরিজটা গুরুত্বহীন? কোন সিরিজে সাকিব ছাড়া সহজেই বের হয়ে আসা সম্ভবপর হবে আগামী এক বছরে? এরপর ফিরে তিনি নিজের ফর্ম কতটা ভাল করবেন সেটাও দেখার বিষয়। মোহাম্মাদ আশরাফুলের বেলায়ও এমন হয়েছে। আশরাফুল কী আর পেরেছেন জাতীয় দলে ফিরতে? ভারতের এক টুর্নামেন্টে জাতীয় দল থেকে তৎকালীন হাবিবুল বাশার সুমন, অলক কাপালী, শাহরিয়ার নাফিস সহ বিশাল একটা গ্রুপ যোগ দিয়েছিলেন বিসিবি থেকে পদত্যাগ করে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ধ্বংসের সে পায়তারা থেকে মুক্ত হতে সময় লেগেছিল। এবার সাকিব। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কত সময়ের প্রয়োজন হবে তা সময়ই বলবে।

সাকিব অন্যায় করেছেন, সেটা তিনি শুরু থেকেই মেনে নিয়েছেন। সহযোগিতাও করেছেন তদন্তে। কিন্তু সে তদন্তটা দু’বছর কী কারনে চলার প্রয়োজন হলো? সাকিব মেনে নিলে তো প্রমানেরও প্রয়োজন পড়েনা। সাকিবকে অনেক আগেই এ শাস্তিটা দিতে পারতো আইসিসি। সেটা যদি আরো এক বছর আগে হতো, তাহলে সাকিব এতদিন আগামী ওই সিরিজগুলোর জন্য তৈরী হয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু আইসিসি সেটা এমন এক মুহুর্তে দিয়েছে যাতে বাংলাদেশ অনেক খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে বাধ্য হয়। এটাও একটা বিশাল ক্রিকেট পলিটিক্স। আইসিসি কারা চালায় সেটা সবার জানা। তিন মোড়ল ভারত,অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড। এদের প্রভাবমুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। তাহলে তারা যা বলবেন, বা চাইবেন সেটাই তো হবে।

এটা ঠিক, আইসিসিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের গলার স্বরটা বড় করার সুযোগ নেই। সেটা তারা পারেন না। ক্রিকেট সংগঠক হতে হয়। বহির্বিশে^ বিভিন্ন বোর্ডের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হয়। যে পলিটিক্সে বাংলাদেশের অবস্থান শুন্যতে। ফলে এমন বহুকিছুতেই ভোগান্তিতে পড়তে হবে- বাংলাদেশের মত উঠে দাড়ানোর চেস্টা করা দলগুলোকে। এটা আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে। যে আগারওয়াল জুয়ার প্রস্তাব দিতে চাইছিলেন, তিনি যে মোড়লদের সাজানো নাটক ‘মঞ্চস্থ’ করতে আসেননি সেটার প্রমানটা কে দেবে? সাকিব তো সামান্যই। তার চেয়েও অনেক বড় মাপের ও উদীয়মান অনেক দেশের বড় বড় ক্রিকেটারের লাইফ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে ভারতের একজনের নামও কখনও কেউ শোনেনি, শুনবেও না! আগারওয়ালরা শুধু জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ সহ তিন মোড়লের বাইরে যারা তাদের ক্রিকেটারদের দমন করার জন্য?

সাকিবের বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক গনমাধ্যমে ঝড়। কিন্তু এটাও ঠিক, এগুলোতে কোনো লাভ নেই। আইসিসিতে বাংলাদেশের অবস্থান নড়বড়ে। কথা, প্রতিবাদ, হুমকি ওখানেই দিতে হবে। নতুবা এমন বহু নাটকীয় ঘটনা একের পর এক মেনে নিয়ে পথ চলতে হবে বাংলাদেশকে।


আরো সংবাদ