১২ ডিসেম্বর ২০১৯

অবিক্রিত পড়ে আছে ৭ লাখ টন লবণ

কক্সবাজারে অবিক্রিত লবণ - ছবি : নয়া দিগন্ত

চাষি খুঁজে পাচ্ছেন না লবণ চাষের জমির মালিকরা। প্রতি বছর মৌসুমের আগে চাষিরা জমির মালিকদের কাছে এলেও এবার তেমন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। ফলে হতাশ হয়ে পড়েছেন জমির মালিকরা। উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারে সোডিয়াম সালফেটের প্রভাব ও রেকর্ড পরিমাণ লবণ উদ্বৃত্ত থাকার পরও আমদানির কারণে চাষিরা এবার হতাশ। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে লবণ মৌসুম শুরু হলেও অনেক জায়গায় এখনো চাষি মাঠে নামেনি। দাম না পাওয়ায় মাঠ ও মিলে পড়ে রয়েছে প্রায় সাত লাখ মেট্রিক টন লবণ।

মৌসুম শুরু না হতেই অন্যান্য বছর চাষিরা জমি মালিকদের হাতে অগ্রিম টাকা দিলেও এ বছর তার উল্টো। ক্ষেত্রবিশেষে লবণমাঠ বিনা মূল্যে দিয়েও চাষি মিলছে না। এরই মাঝে দুই দিন আগে লবণের কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বলে যে অপপ্রচার হয়েছে, তাতে আরেকটি ধাক্কা খেল দেশীয় এই শিল্পটি।

সারা দেশের লবণের চাহিদার বেশির ভাগ মেটানো হয় কক্সবাজারের লবণ দিয়ে। বর্তমানে লবণের দাম না পাওয়ায় এখানকার লবণমাঠ মালিক ও চাষিদের করুণ দশা। সব মিলিয়ে লবণশিল্প করুণ অবস্থার মুখোমুখি। টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার একজন লবণমাঠ মালিক বলেন, আগে মৌসুম শেষ না হতেই পরের বছরের জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে যেতেন চাষিরা। আর এ বছর চাষিদের খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। সদরের ইসলামপুরের লবণমাঠ মালিক মনজুর আলম (দাদা) বলেন, অন্যান্য বছরের মতো এ বছর চাষিদের আগ্রহ নেই। দাম না পাওয়ায় সবাই হতাশ। যে লবণের মাঠের লাগিয়ত মূল্য ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা ছিল, তা এ বছর অর্ধেক দামে দিয়েও চাষি মিলছে না। তিনি বলেন, লবণশিল্প বাঁচাতে পণ্যটির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা দরকার।
বিসিক কক্সবাজারের উপমহাব্যবস্থাপক সৈয়দ আহামদ বলেন, মৌসুম শুরু হলেও বেশির ভাগ এলাকায় এখনো চাষিরা মাঠে নামেনি। লবণের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়ে চাষিদের আস্থা ফেরানো না গেলে তাদের নামানো কঠিন হবে।

ইসলামপুর লবণমিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম আজাদ বলেন, কষ্টে উৎপাদিত ফসলের দাম না পেলে কেন চাষিরা মাঠে নামবে? আগে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। চাষিদের আস্থা ফেরাতে পারলেই এই শিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব।

জানা গেছে, ৮০ কেজি লবণের বস্তা মাঠপর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সে হিসেবে চাষিরা কেজিতে দাম পাচ্ছে মাত্র ৪ টাকা; যা দিয়ে মজুরি বা উৎপাদন খরচও সামাল দিতে পারছেন না চাষিরা। অথচ বাজারে প্যাকেটজাত লবণ বিক্রি করা হয় প্রতি কেজি প্রায় ৪০ টাকা। উৎপাদনের পর থেকে বাজারে পৌঁছা পর্যন্ত অন্তত তিনটি হাত বদল হয় লবণের। প্রত্যেক হাতেই লাভের অংশ জমা পড়ে। কেবল চাষিদের দিয়ে যেতে হয় লোকসান।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজারের লবণশিল্প উন্নয়ন প্রকল্প কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ মৌসুমে বিসিকের চাহিদা ১৮ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন।

২০১৮-১৯ মৌসুমে কক্সবাজার জেলায় উৎপাদনযোগ্য লবণ জমির পরিমাণ ছিল ৬০ হাজার ৫৯৬ একর। চাষির সংখ্যা ২৯ হাজার ২৮৭ জন। এই মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ লাখ মেট্রিক টন। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন; যা বিগত ৫৮ বছরের লবণ উৎপাদনের রেকর্ড ছাড়িয়েছে।

লবণমিল মালিক, ব্যবসায়ী, চাষিদের মতে, দেশে লবণের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো ধরনের ঘাটতি নেই। বর্তমান যে পরিমাণ লবণ উদ্বৃত্ত রয়েছে তা দিয়ে আরো অন্তত দুই মাস চলবে। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী লবণের সঙ্কট দেখিয়ে দাম বৃদ্ধির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ দিকে ১৯ নভেম্বর কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সভায় সমিতির সভাপতি নুরুল কবির বলেছেন, বর্তমানে তাদের হিসাবে তিন লাখ মেট্রিক টনের ওপরে লবণ উদ্বৃত্ত রয়েছে। কিছু মিল মালিকের কারণে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সোডিয়াম সালফেটে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। বন্ড লাইসেন্স, কাস্টিং সল্ট ইত্যাদি নামে লবণ আমদানি করছিল একটা শ্রেণী। আমাদের কঠোরতায় ওই রকম লবণ আমদানি বন্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, লবণের জাতীয় চাহিদা নিরূপণে সবাইকে এক টেবিলে বসতে হবে। আমরা লবণ ব্যবসায়ী ঐক্যবদ্ধ হলে এই শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব।

লবণমিল মালিকদের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিসিকের অসাধু কর্তারা কারসাজি করে কালোবাজারিদের সুযোগ করে দেয়; যে কারণে বারবার দেশীয় লবণশিল্প মার খাচ্ছে। উদ্বৃত্ত থাকার পরও প্রতি বছর লবণ আমদানি করা হয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশ লবণমিল মালিক সমিতির শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা দেশে ২৪-২৫ লাখ মেটিক টন চাহিদা দেখিয়ে লবণ আমদানির অনুমতির জন্য গত ১৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছিলেন। অথচ দেশে লবণের চাহিদা সর্বোচ্চ ১৮ লাখ মেট্রিক টন। লবণমিল মালিক, ব্যবসায়ী, চাষিসহ সংশ্লিষ্টদের দাবিÑ দেশীয় লবণশিল্প বাঁচাতে সব লবণ আমদানি বন্ধ করতে হবে। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে মাঠে ফেরানো যাবে না চাষিদের। লবণের পরনির্ভর হবে দেশ, বাড়বে বেকারত্ব। সুডিয়াম সালফেটের আড়ালে যারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট, সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি করছে তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

বাংলাদেশ লবণ পরিষদের সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরী জানিয়েছেন, একটি সিন্ডিকেট লবণের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে লবণ আমদানি করতে চায়। এই চক্রটিকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয় যতই চেষ্ট করুক সুফল আসবে না।


আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik