১৬ ডিসেম্বর ২০১৯
মৌসুম শুরু হলেও উৎপাদিত লবণের মূল্য নিয়ে হতাশায় চাষিরা

বাঁশখালীতে পাইকারি লবণ প্রতিকেজি মাত্র ৪ টাকা ৫ পয়সা

লবণ উদ্বৃত্ত রয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন
বাঁশখালিতে গত মৌসুমে উৎপাদিত লবণ বিক্রির জন্য নৌকায় করে ঘাটে নিয়ে আসা হয়েছে। ছবিটি উপজেলার ছনুয়া এলাকা থেকে তোলা। - ছবি : এস এম রহমান

দেশের কয়েকটি এলাকায় লবণের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে চড়া দামে লবণ বিক্রির খবর পাওয়া গেলেও মঙ্গলবার বাঁশখালীতে গত মৌসুমে উৎপাদিত লবণ বিক্রি হয়ে প্রতিকেজি মাত্র ৪ টাকা ৫ পয়সা দরে। এদিকে, গত মৌসুম শেষ হয়ে চলতি বছরের লবণ উৎপাদন শুরু হলেও বছর জুড়ে উৎপাদিত লবণের অস্বাভাবিক দর পতনে হতাশায় ভুগছেন চাষিরা।

১৫ নভেম্বরের পর থেকে দেশে নতুন বছরের লবণ উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে, এবার লবণের চাহিদা রয়েছে ১৮ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন ও লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়ে ১৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। অপরদিকে গত বছরে উদ্বৃত্ত লবণ রয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। সে হিসাবে উদ্বৃত্ত লবণে আরো তিন মাস অনায়াসে চলবে বলে মঙ্গলবার রাতে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন বিসিক লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ আহামদ।

মঙ্গলবার থেকে বিকাল পর্যন্ত বাঁশখালীতে গত মৌসুমে উৎপাদিত লবণ বিক্রি হয়েছে প্রতিমণ (৪৭/৪৮/৫০ কেজি ধরে) বিক্রি হয়েছে ১৯০ টাকা করে। সে হিসাবে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাইকারি লবণ বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪ টাকা ৫ পয়সা মাত্র।

বাঁশখালী লবণ চাষি মো: বেলাল হোসাইন বলেন, মৌসুমের গত বছর মৌসুমের শুরুতে উৎপাদিত লবণের পাইকারি দাম কিছুটা বেশি পেলেও মৌসুম জুড়ে লবণের দাম নিয়ে হতাশায় রয়েছে উপকূলের হাজার হাজার লবণ চাষি। তিনি সোমবার প্রতিমণ ১৯০ টাকা করে ৮৬১ মণ লবণ বিক্রি করেছেন।

একই এলাকার লবণ চাষি আমির হোসাইন বলেন, মঙ্গলবার প্রতিমণ লবণ মাত্র ১৯০ টাকা দরে বিক্রি করেছি।

বিসিক লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ আহামদ নিশ্চিত করে বলেছেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে গত কয়েক মাস ধরে চাষিরা প্রতিমণ লবণ ১৮০-১৯০ টাকার উপর বিক্রি করে আসছেন। মঙ্গলবার প্রতিমণ মাত্র ১৯০ টাকার করে বিক্রি হয়েছে।

উপকূলের চাষিরা জানায়, গত মৌসুমের উৎপাদিত লবণ অবিক্রিত রয়ে গেছে, হাজার হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদিত লবণের অস্বাভাবিক দর পতন হলেও পেটের তাগিদে চাষিরা বাধ্য হয়ে কম দামে লবণ বিক্রি করে পেট চালাচ্ছে।

লবণ শিল্পকে রক্ষায় চাষিরা বিদেশ থেকে অবাধে লবণ আমদানী বন্ধ করাসহ লবণ চাষে প্রণোদনা ও সরকারিভাবে উৎপাদিত লবণ ক্রয়ের দাবি করেছেন। নাহয় দেশের লবণ শিল্প ধ্বংস হয়ে পড়বে বলে চাষিরা মনে করেন।

জানা গেছে, গত মৌসুমে ৫৯ হাজার ৫৬৪ একর মাঠে লবণের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ১৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোতি লবণ উৎপাদন হয়।

বিসিক লবণ প্রকল্পের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শামিম আলম বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত পূর্বে উৎপাদিত লবণ বিক্রি হয়েছে প্রতিমণ মাত্র ১৯০ টাকা করে।

জানা গেছে, দেশের বঙ্গোপসাগর উপকূলের চট্টগ্রামের বাশঁখালী ও আনোয়ারা উপজেলা এবং কক্সবাজার জেলা জুড়েই লবণ উৎপাদন হয়ে আসছে। সরকারি হিসাবে প্রতিবছর নভেম্বরের ১৫ থেকে পরবর্তী বছরের মে মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত লবণ উৎপাদন মৌসুম ধরা হয়। এই সাত মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল হয়েই বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার চাষি তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের লবণ উৎপাদন করে আসলেও সেই চাষিদের কোনো খবর কেউ রাখে না।

চাষিরা জানায়ম পাইকারি লবণের দাম একেবারে কমে গেলেও পাইকাররা করছে আরো জুলুম। তারা লবণের ঘাটতির নাম করে প্রতিমণে ৮ থেকে ১০ কেজি লবণ বেশি নিচ্ছেন। তারা বলেন, একে তো লবণের দাম কম তার উপর প্রতিমণে ফড়িয়া বা দালালরা লবণের ঘাটতির নামে অতিরিক্ত লবণ নিয়ে চাষিদের আরো ঠকাচ্ছেন।

এ কারণে চাষিরা চান, উৎপাদিত লবণ সরকারিভাবে ক্রয় করা হলে তারা অন্তত উৎপাদিত লবণের প্রকৃত মূল্য পেতেন।

বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতি জানিয়েছেন, গত বছর (২০১৮) গ্লোবাল লবণের (সোডিয়াম সালফেট) চাহিদা ছিল এক লাখ থেকে এক লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। তার বিপরীতে আমদানি করা হয় প্রায় সাড়ে ৯ লাখ মেট্রিক টন। আর শিল্প লবণের (কসটিক সোডা উৎপাদনের জন্য) চাহিদা ছিল প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ মেট্রিক টন। আর আমদানি করা হয়েছে প্রায় সাত লাখ মেট্রিক টনের উপরে।

শিল্প কারখানার ব্যবহারের বিপরীতে আমদানিকৃত লাখ লাখ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত লবণই জনস্বাস্থ্য ও আইনের তোয়াক্কা না করে অসাধু চক্র প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করায় একদিকে মাঠ পর্যায়ে উৎপাদিত লবণের দরপতন শুরু হয়, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে।

দেখুন:

আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik