১৪ অক্টোবর ২০১৯
আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দী

নুসরাতকে পুড়িয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ সিরাজ

নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশদাতা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও নিহত নুসরাত জাহান রাফি - ফাইল ছবি

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ কারাবন্দী সিরাজ উদদৌলা। রোববার আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দীতে বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি। রোববার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী ফেনীর একটি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন সিরাজ।

সূত্র জানায়, রোববার বিকেলে তাকে পিবিআই কার্যালয় থেকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জাকির হোসাইনের আদালতে হাজির করা হয়। জবানবন্দী শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন চট্টগ্রাম পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) বিশেষ পুলিশ সুপার মোঃ ইকবাল।

অভিযুক্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, ওই মামলার আসামী নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম ঘটনার আগে ফেনী কারাগারে সিরাজ উদদৌলার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এসময় তার বিরুদ্ধে দেয়া যৌন হয়রানির মামলা প্রত্যাহারে নুসরাত রাফি ও তার পরিবারকে চাপ দিতে নির্দেশ দেন তিনি। এতে রাজি না হলে তাকে (নুসরাতকে) পুড়িয়ে হত্যার পর আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতেও নির্দেশ দেন তিনি।

এর আগে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সরাফ উদ্দিন আহমেদ। আদালতের আদেশ অনুযায়ী শনিবার তাকে ফেনী কারাগার থেকে পিবিআই কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়। এর একদিনের মাথায় তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে নিজের ভূমিকা বিস্তারিত আদালতে তুলে ধরেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৭ মার্চ ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ‘যৌন হয়রানির’ অভিযোগ এনে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন রাফির মা শিরিন আক্তার। এরপর ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে রাফিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। পরে ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রাফি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এ ঘটনায় তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। অধ্যক্ষ সিরাজ এ মামলার প্রধান আসামী।

উল্লেখ্য, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা থেকে এ বছর আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন নুসরাত। তাকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ২৬ মার্চ ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন নুসরাতের মা। পরদিন অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ওই মামলা প্রত্যাহার না করায় গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পাঁচ দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকা নুসরাত মারা যান।

এ মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজসহ অন্তত ২১ জনকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। গ্রেফতারকৃতদের অধিকাংশই ওই মাদরাসার ছাত্র।

এদিকে বানূ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় দেয়া জবানবন্দীতে নুসরাত তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা পরা চারজন তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার কথা বলে যান। এরপর সন্দেহভাজন কয়েকজনকে পুলিশ ধরলেও ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মিলছিল না।

কয়েক দিনের মধ্যে ওই মামলার তদন্ত ভার পিবিআইয়ের হাতে যাওয়ার পর এই হত্যাকাণ্ডের মূল সন্দেহভাজন হিসেবে আলোচিত ওই মাদরাসার ছাত্র নূর উদ্দিন ও শামীম গ্রেফতার হন।

জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই কর্মকর্তারা বলছিলেন, নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার দুই দিন আগে কারাগারে গিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজের কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে আসেন নূর উদ্দিন ও শামীম। পরে সঙ্গীদের নিয়ে মাদরাসার একটি হোস্টেলে বৈঠক করে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করেন।

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাতকে পরীক্ষার হল থেকে ডেকে ছাদে নেয়া হয়। সেখানে তাকে মামলা তুলে নিতে বলা হলে নুসরাত তাতে আপত্তি জানান। তখন শামীম, অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপিসহ পাঁচজন নুরসাতকে ফেলে দিয়ে তার হাত-বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum