২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রোহিঙ্গা নারী ক্যাম্প প্রধান নির্বাচিত

রমিজা বেগম। ছবি - আল জাজিরা।

রমিজা বেগমের বিজয়ী ভাষণ খুব আকর্ষণীয় বা দীর্ঘ ছিলো না। ‘এত মানুষের মাঝে কথা বলার এটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা’, ক্যাম্প লিডার নির্বাচিত হওয়ার পর একথাই বলছিলেন ২৬ বছর বয়সী রমিজা।

শালবাগান ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা অধিবাসীদের মধ্যে তিনিই প্রথম নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এটি কক্সবাজারের টেকনাফের সরকার নিবন্ধিত নয়াপাড়া ক্যাম্পের পাশে এর অবস্থান।

ইউএনএইচসিআর সর্বপ্রথম জুন মাসে শালবাগান ক্যাম্পের তিনটি ব্লকে এডভান্টিজ ডেভলপমেন্ট এন্ড রিলিফ এজেন্সি ও বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় কতৃপক্ষকে নির্বাচনের আয়োজন করে।

নয়াপাড়া ক্যাম্প-ইন-চার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, এই ক্যাম্পে বসবাসরত ১৬ হাজার রোহিঙ্গা, যারা প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হিংস্র নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় এক বছর আগে এ দেশে এসেছে তাদের নিজেদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আলোচনা করার জন্য এ নির্বাচনী ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, আমরা তাদের উপর কোন সিদ্ধান্ত আরোপ করতে চাই না।তাই আমরা সিদ্ধান্ত একটি দায়িত্বশীল প্রতিনিধি গঠনের সিদ্ধান্ত নেই যাতে তারা নিজেদের সমস্যা নিয়ে নিজেরা আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।  

শালবাগানে বসবাসরত রোহিঙ্গারা ১২টি ব্লক থেকে ১২ জনকে নির্বাচন করবে সেই সাথে তিনজন ব্লক লিডার যারা এক বছর দায়িত্ব পালন করবে।

তাদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের ভেতরের বিভিন্ন সমস্যা নিজেরাই সমাধানের চেষ্ঠা করবে। এছাড়া এনজিওগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখবে ও ক্যাম্প-ইন-চার্জের কোন কোন সিদ্ধান্ত দিলে তা বাস্তবায়ন করবে।

ক্যাম্পের ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যে কারোরই প্রার্থী হওয়ার সুযোগ ছিল। যারা সবার সাথে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম, কোন ধরণের অপরাধ রেকর্ড নেই ও অসামাজিক কোন কাজের সাথে যারা জড়িত নয় তারাই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পেরেছেন। 

ক্যাম্পে কার্যক্রম চালানো সকল এনজিওগুলোর সমন্বয়ক এসএম লিয়াকত আলী বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, শাসন ও যোগাযোগ’ এই চারটি বিষয় ছিল নির্বাচনের মুখ্য উদ্দেশ্য। যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরকে বিভিন্ন ধরণের আচরণ, বৈধ অধিকার, শাসন ও দায়িত্বশীলতা এবং জরুরি অবস্থায় কী করণীয় এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

এর আগে ক্যাম্পগুলোর প্রধানকে মাঝি বলা হত। কিন্তু ক্যাম্প মাঝি বিভিন্ন ধরণের অপরাধমূলক কাজের প্রমাণ পাওয়ায় এই ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়।

 

আরো দেখুন : আমরা সবাই রোহিঙ্গা : বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট

বাংলাদেশ সফররত জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম আজ কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালীর ট্রানজিট পয়েন্টে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেছেন। সংক্ষিপ্ত বৈঠকে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সেনা ও উগ্র বৌদ্ধদের নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে তারা নিজেদের ভূমিতে ফিরে যেতে চান বলে জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গারা বলেন, নাগরিক হিসেবে পূর্ণ অধিকার ছাড়া মিয়ানমার কখনো রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ হবে না। তাই সব অধিকার নিয়েই আমরা নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই।


পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস লিখেন, ‘আমি বাংলাদেশের কক্সবাজারে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের কথা শুনেছি। তারা ন্যায়বিচার চায় এবং নিরাপদে বাড়িতে ফিরে চান।’

অন্য এক টুইটার বার্তায় বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, ‘আমি রোহিঙ্গাদের সাহসিকতা মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত। তাদের সঙ্কট থেকে আমরা দূরে সরে যেতে পারি না। আমরা তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করছি। আজকে আমরা সবাই রোহিঙ্গা।’

 সোমবার সকাল ৯টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে অ্যান্তনিও গুতেরেস ও জিম ইয়ং কিম কক্সবাজার পৌঁছান। সেখানে থেকে তারা পর্যটন এলাকার হোটেল সায়মন বিচ রিসোর্টে গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং করেন।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান বলেন, জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট দুপুর ২টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং সেখানে তারা রোহিঙ্গাদের থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসা সেবা পর্যবেক্ষণ করেন। পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কুতুপালংয়ের ডি-৫ ব্লকে নির্যাতিত অর্ধশত রোহিঙ্গা নারী ও একশ পুরুষের সাথেও আলাপ করেন।

রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শনে তাদের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন।

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রধানের সাথে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), ব্র্যাক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধরিা কক্সবাজারে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ  নারী ও শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।

বর্তমানে কক্সবাজারে উখিয়া ও টেকনাফে ৩০টি আশ্রয়শিবির রয়েছে। এই আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৮। এর মধ্যে উখিয়ার ১২টি আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গা আছে সাত লাখ। এর মধ্যে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা। গত জুনের মাঝামাঝিতে সাত দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ধস ও বন্যায় দুজনের মৃত্যু হয়, আহত হয় ৩১ জন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় সাত হাজার রোহিঙ্গা।

এদিকে , বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার এখনো প্রস্তুত নয় বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক রেডক্রস। রেডক্রস প্রেসিডেন্ট পিটার মাউরার বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য সেখানে এখনো অনেক কাজ করা বাকী রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুতই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে মনে করেন না তিনি। এর আগে মিয়ানমার দাবি করেছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।


আরো সংবাদ