২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রেড চিটাগাং ক্যাটলের বাজিমাত

রেড চিটাগাং ক্যাটল - ছবি : নয়া দিগন্ত

কোরবানিতে চট্টগ্রামবাসীর পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে রেড চিটাগাং ক্যাটল বা অষ্টমুখী লাল ষাঁড়। রেড চিটাগাং ক্যাটল দেখতে যেমন সুন্দর, এর গোশত খেতেও তেমনি সুস্বাদু। এ কারণে চট্টগ্রামবাসীর কাছে কোরবানি ছাড়াও বছরজুড়ে বিয়েসাদি ও চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানেও পছন্দের শীর্ষে থাকে লাল ষাঁড়। আর বিশেষ চাহিদার কারণে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া অঞ্চলে রেড ক্যাটল ষাঁড় ও গাভী লালনপালন করেন সাধারণ গৃহস্থ পরিবারের সদস্যরা। 

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি ঘরে এবারো কোরবানির ঈদকে টার্গেট করে লাল ষাঁড় লালন পালন করা হচ্ছে। লাল ষাঁড়ের পাশাপাশি লাল জাতের গাভী ও মিশ্রজাতের ষাঁড়ও লালনপালন করছেন গৃহস্থরা। 
জেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর চট্টগ্রাম জেলায় কোরবানির গরু বা ষাঁড়ের চাহিদা রয়েছে ছয় লাখ ৫৫ হাজার। আর এর অনুকূলে মজুদ রয়েছে পাঁচ লাখ ৮২ হাজার। এর মধ্যে ৩৫ হাজার রয়েছে রেড ক্যাটল ষাঁড়। 

সাতকনিয়ার পুরানগর এলাকার মুন্সি মিয়ার দুই ছেলে আবুল কাশেম ও আবু তাহের লাল ষাঁড় পালন করেছেন। এবার তারা দেশী মিশ্রজাতের ষাঁড়ও পালন করেছেন। অপর দিকে একই উপজেলার কালিইশ মাইঙ্গাপাড়ার ব্যবসায়ী আবুল বশর এবার একসাথে অষ্টমুখী লাল ও দেশী মিশ্রজাতের চারটি ষাঁড় পালন করছেন। ষাঁড়গুলোর গড় ওজন সাড়ে ছয় মণ থেকে সাত মণ। তিনি প্রতিটি ষাঁড় ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় বিক্রির আশা করছেন। এদিকে মইশামুড়া গ্রামের কালা মিয়ার বাড়ির কৃষক নুরুল ইসলাম বেশ কয়েক বছর ধরে অষ্টমুখী লাল ঘাঁড় ও গাভী পালন করে আসছেন। এবার তিনি কোরবানি উপলক্ষে একটি লাল ষাঁড় পালন করেছেন। এটি এখন প্রায় পাঁচ মণ ওজনের হয়েছে। তিনি আশা করছেন তার ষাঁড়টি এক লাখ ২০ হাজার টাকার ওপরে বিক্রি করতে পারবেন। 

জানা গেছে, বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতের গরুর মধ্যে রেড চিটাগাং ক্যাটলের বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর যেকোনো অঞ্চলের গরুর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এর শরীর, শিং, চোখ, ঠোঁট, চোখের ভ্রু, ক্ষুর ও লেজের রঙও লাল। তাই এই বিশেষ জাতের গরুকে লাল বা অষ্টমুখী লাল গরু বলে। একটি পূর্ণবয়স্ক লাল গাভীর ওজন হয় ২০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত। ষাঁড়ের ওজন হয় ৩০০ থেকে সাড়ে ৪৫০ কেজি পর্যন্ত। তা ছাড়া পূর্ণবয়স্ক একটি গাভী বাড়তি খাবার ছাড়াই সাত থেকে আট লিটার দুধ দিয়ে থাকে এবং প্রতি বছরই বাচ্চা দিতে সক্ষম। দেশীয় আবহাওয়া ও সাধারণ খাদ্য দিয়েই এই গরু পালন করা যায়। তাই এই গরুর মাধ্যমে দেশে বড় বড় খামার গড়ে তোলা সম্ভব। বর্তমানে বিভিন্ন জাতের গরুর খামার গড়ে উঠলেও দেশীয় জাতের এই লাল গরু আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে।

গরুর এই দেশীয় জাতটি সংরক্ষণ ও বংশ বিস্তারে সরকারের পক্ষ থেকে ২০০৬ সালে প্রাণী সম্পদ অধিদফতর ও প্রাণী সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট যৌথ উদ্যোগে সাড়ে ছয় শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি রেড চিটাগাং ক্যাটল জাত (আরসিসি) উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিল। ওই সময়ে লাল গরু সংরক্ষণ প্রকল্পে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। কিন্তু ২০১১ সালের জুনে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অদ্যবধি আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। 

জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রাণী সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট সর্বপ্রথম ২০০১ সালে অষ্টমুখী লাল গরু সংরক্ষণের কাজ শুরু করে। এর পরে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. ফজলুল হক ভূঁইয়ার তত্ত্বাবধানে এবং ইউএসডিএ নামের একটি বিদেশী এনজিওর সহায়তায় রেড চিটাগাং ক্যাটল সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় বিশেষ করে চন্দনাইশ, পটিয়া, আনোয়ারা, রাউজান ও সাতকানিয়া উপজেলায় এ গরুর উৎপত্তিস্থল বলে মনে করা হয়। 

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা: রিয়াজুল হক বলেন, রেড চিটাগাং ক্যাটল বাংলাদেশের একটি উন্নতমানের গবাদি পশুর জাত। এই দেশীয় সম্পদ রক্ষায় সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি লাল গরু সংরক্ষণ প্রকল্পের কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এই জাতের গরু লালন পালনে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। তিনি বলেন, বিশ^ব্যাংকের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি মেগা প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে। দেশের বিভিন্নœ জাতের গরু সংরক্ষণসহ দুগ্ধ উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশ সাধনই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, এবার চট্টগ্রাম জেলায় কোরবানির হাটে গরু মহিষ ভেড়া ও ছাগলের চাহিদা রয়েছে ছয় লাখ ৫৫ হাজার। তার মধ্যে মজুদ রয়েছে পাঁচ লাখ ৮২ হাজার। এর মধ্যে ৩৫ হাজার রয়েছে লাল ষাঁড়। তিনি বলেন, বিশ^ব্যাংকের মেগা প্রকল্পের আওতায় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে আরসিসি বীজ সংগ্রহের মাধ্যমে চট্টগ্রামের লাল গরুর জাতকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।


আরো সংবাদ