১৪ নভেম্বর ২০১৮

‘আমার বোন রোজা রাখা অবস্থায় আত্মহত্যার মতো পাপ কাজ করতে পারে না’

ইতি
ইতির মৃত্যু নিয়ে চলছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য - ছবি: সংগৃহীত

চাঁদপুরের শাহরাস্তির মালরা গ্রামের নববধূ মেহজাবিন সুলতানা ইতির মৃত্যুর ঘটনায় অবশেষে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মৃত্যুর ৯ দিন পর স্থানীয় এমপি ও জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে পুলিশ হত্যা মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি।

শুক্রবার রাতে নিহতের ভাই নূরে আলম স্বামীসহ চারজনকে আসামি করে শাহরাস্তি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল শাহরাস্তি পৌর শহরের আমির হোসেনের কন্যা মেহজাবিন সুলতানা ইতির বিয়ে হয় একরামুল হক রাজুর (২৭) সাথে। রাজু মেহের দক্ষিণ ইউপির মালরা মজুমদার বাড়ির আবদুল কুদ্দুছের মেঝ ছেলে। বিয়ের সময় পাত্রকে যৌতুক হিসেবে টাকা, স্বর্ণালংকার ও আসবাবপত্র দেয়ার কথা ছিলো।

মামলার বাদি নূরে আলম জানান, ‘বিয়ের পর থেকেই ইতির স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের জন্য নির্যাতন শুরু করে। এ নিয়ে বেশ ক’বার স্থানীয় ভাবে সালিশ বৈঠক হয়। অর্থনৈতিক সমস্যা থাকায় আমরা তাদের কাছ থেকে সময় চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা সময় না দিয়ে বিয়ের মাত্র ২ মাস ১৮ দিনের মাথায় যৌতুকের জন্য আমার নিষ্পাপ বোনটিকে মেরে ফেলেছে।’

নিহতের বড় বোন তাহমিনা জানান, ‘আমার বোন নফল রোজা রাখাবস্থায় আত্মহত্যার মতো পাপ কাজ করতে পারে না। ঘটনার সংবাদ পেয়ে আমরা দ্রুত গিয়ে তার লাশ নিচে দেখতে পাই। আত্মহত্যা করলে ফাঁস দেয়া অবস্থা থেকে কে তাকে নামিয়েছে সে তথ্য পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরো জানান, ‘ঘটনার দিন সন্ধ্যায় যৌথ পরিবারের সাথে ইফতারের সময় সে কিভাবে আত্মহত্যা করবে? ঘরের সব সদস্যের উপস্থিতিতে, দরজা খোলা অবস্থায় কিভাবে সে আত্মহত্যা করে? তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে অপপ্রচার করছে শ্বশুড়বাড়ির লোকজন।’

নিহতের বোন আরো জানান, ‘আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তার হাতে সরিষার তেল মালিশ ও পাশে তেলের বোতল খোলা অবস্থায় পাই। এছাড়া ঘরের একজন সদস্যও ঘটনার পর বাড়িতে ছিল না।’

তাহমিনা জানান, ‘ইতি শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় একটি মুঠোফোন নিয়ে যায়। যাতে সে ওই পরিবারের অত্যাচারের বিষয়গুলো রেকর্ড করে রাখতে পারে। এ নিয়ে তার স্বামী ও ভাসুর হাসানের সাথে ঝগড়া হয়। মুঠোফোন বাপের বাড়ি দিয়ে আসার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এমনকি তাকে হত্যার ও হুমকি দেয়া হয়।’

স্বামী মুঠোফোনের বিষয়টি জানার পর ভাসুর হাসানকে জানালে তিনি ঘটনার দিন বিকেলে মুঠোফোনটি আমাদের বাড়িতে দিয়ে দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অন্যথায় তাকে হত্যার হুমকি প্রদান করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বেশ কয়েকজন জানান, বিয়ের ঘটক শাহ আলম অর্থের লোভে অশিক্ষিত ছেলের সাথে শিক্ষিত ও মেধাবী ছাত্রীটিকে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। হত্যার ঘটনায় সে ছেলে পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত থেকে নিহতের পরিবারকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাকেও আইনের আওতায় আনা উচিত।

নিহত ইতির মা ফিরোজা বেগম জানান, ‘আমরা গরীব হওয়ায় অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। তারা মেয়েটিকে বাঁচতে দিলো না। কিছু প্রভাবশালী অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে আপসের প্রস্তাব করছে। তারা প্রতিনিয়ত আমার পরিবারকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। আমি ন্যায় বিচার চাই। হত্যার ঘটনায় এখনো কোন আসামিকে আটক করা হয়নি।

তিনি আরো বলেন, ‘হত্যাকারীদের শাস্তি হলে আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে। আমি স্থানীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম ও চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপারকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ওনাদের নির্দেশেই পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য হয়েছে।’

এদিকে স্বামীর পরিবার এটিকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে আসছে। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম ও পুলিশ সুপার শামছুন্নাহারের হস্তক্ষেপে ৩০ জুন শাহরাস্তি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহরাস্তি মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো: নাছির উদ্দিন জানান, আসামিরা পলাতক রয়েছে তাদেরকে গ্রেফতার করা যায়নি।

প্রসঙ্গত, গত ২৩ জুন সন্ধ্যায় করফুলেন্নেছা মহিলা ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহজাবিন সুলতানা ইতির বিয়ের ২ মাস ১৮ দিনের মাথায় স্বামীর বাড়িতে রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ওই রাতেই পুলিশ লাশ উদ্ধার করে একটি ইউডি মামলা দায়ের করে।


আরো সংবাদ