২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
দুই থানায় এক মাসে ৭৬ জন জন আটক

ইয়াবা জোয়ারে ভাসছে মিরসরাই

পাচার ও সেবনে জড়িয়ে পড়ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা
ইয়াবা জোয়ারে ভাসছে মিরসরাই। -

হাত বাড়ালে অতি সহজে ইয়াবা ট্যাবলেট মিলছে মিরসরাইয়ে। উপজেলাটি মাদকের অনেকটা স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি হচ্ছেনা। গত এক বছর ধরে এর ভয়াবহতা ভয়ঙ্কর আকার ধারন করেছে। এই নেশায় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের পাশাপাশি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা আসক্ত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি দেশে মাদকবিরোধী অভিযানে মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানায় ইয়াবা, মাদকদ্রব্য ব্যবসার সাথে জড়িত ও সেবনকারী গ্রেপ্তার হলেও গড়ফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় সরকারি দলের নেতাদের আশ্রয়ে এই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার থেকে নাফ নদী পার হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে ইয়াবা ট্যাবলেট। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে পাচারের সময় মিরসরাই-সীতাকুন্ড উপজেলার কোথাও না কোথাও ইয়াবা ট্যাবলেট ধরা পড়ছে।

মিরসরাই উপজেলার করেরহাট, আবুতোরাব, বারইয়ারহাট, মিঠাছড়া বাজারে গড়ে উঠেছে এর স্থানীয় বাজার। এখানে হাত বাড়ালেই মিলে ইয়াবা ট্যাবলেট। হেরোইন, ফেনসিডিলের পর এখন যুব সমাজ ভাসছে ইয়াবা জোয়ারে। বখাটে যুবকদের পর এখন ইয়াবা জ্বরে আসক্ত হয়ে পড়ছে সমাজের নামিদামি সম্ভ্রান্ত পরিবারে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও। সমাজে সুনাম রয়েছে এমন পরিবারের যুবক যুবতীদের অতিরিক্ত ইয়াবা আসক্তির কারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। সহজে হাতের কাছে পাওয়ায় উঠতি যুবক যুবতীদের কাছে অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যৌন উত্তেজক ইয়াবা ট্যাবলেট। অনেক ইউপি সদস্যও ইয়াবা বিক্রি ও সেবনের সাথে জড়িত রয়েছে। এক সময় শুধুমাত্র উচ্চবিত্ত সমাজে এই নেশাদ্রব্য ব্যবহারের অধিক্য দেখা গেলেও সহজলভ্যতার কারণে এখন মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নবিত্ত পর্যায়েও এর ব্যবহার বেড়েছে অতীতের তুলনায় কয়েকগুণ। তবে বর্তমানে মোট ইয়াবা সেবীর সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই উপজেলা যুব কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক বছরে উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে ইয়াবার আধিপত্য বাড়তে থাকে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে নাফ নদী হয়ে ইয়াবা সীমান্ত পার হয়ে কক্সবাজার থেকে সরাসরি গাড়ীতে করে আসে মিরসরাই। এখানে পাইকারী বিক্রেতার কাছ থেকে খুচরা ক্রেতারা কিনে নিয়ে তুলে দেয় মাদকসেবীদের হাতে। প্রতি পিছ ইয়াবা ট্যবলেট বিক্রি হতো ৭-৮শ' টাকায়, যা সাধারণ মাদকাসক্তদের হাতের নাগালের বাইরে ছিলো। সম্প্রতি এর দাম ২-৩শ' টাকায় নেমে আসায় মাদকাসক্তদের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরী এমনকি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অধিক হারে ইয়াবা আসক্তি বাড়ছে।

কিশোর-কিশোরী ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ভয়ঙ্কর নেশা ইয়াবার অধিক জনপ্রিয়তার কারন হিসেবে জানা যায়, সহপাঠী ও বন্ধুবান্ধবের কান কথায় প্রথমে ত্বকের সৌন্দর্য ও গ্লামার বাড়ানোর কৌতুহল মেটাতে প্রথমদিকে তরুণ প্রজন্ম ইয়াবা সেবন করলেও একসময় তা নেশার রূপ নেয়। একইসাথে বাড়ে যৌনতার প্রতি আসক্তিও। মাদকের খরচ যোগাতে টাকার জন্য এসব মাদকসেবীরা পা বাড়াচ্ছে অপরাধ জগতের সাথে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইয়াবাসেবীদের দৈনিক চাহিদার যোগান দিতে উপজেলার করেরহাট, বারইয়ারহাট, শান্তিরহাট, জোরারগঞ্জ, মিঠাছড়া,কমরআলী, বড়দারোগার হাট, শুক্কুরবারইয়ারহাট,গোলকেরহাট, আবুতোরাবসহ বিভিন্ন বাজার ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ইয়াবা বিক্রেতা সিন্ডিকেট রয়েছে। ইয়াবা সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীরা থানা-প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতা নিয়ে মাদকাসক্তদের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরী ও শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর ইয়াবা ট্যাবলেট। আপরদিকে পরিবহনজনিত নিরাপত্তা রক্ষার্থে ইয়াবা পরিবহন ও বিক্রয় সিন্ডিকেটের সুবিধার্থে ছাত্র-ছাত্রীদের যুক্ত করছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, উপজেলার ১ নং করেরহাট ইউনিয়ন থেকে ১৬ নং সাহেরখালী পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। এর সাথে অনেক জনপ্রতিনিধিও জড়িত রয়েছে। মিঠানালা ইউনিয়নের মামুন মেম্বারের ইয়াবা সেবনের ছবি ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এছাড়া ৪ নং ধুম ইউনিয়নের ৩ জন মেম্বার ইয়াবাব ট্যাবলেট বিক্রি ও সেবনের সাথে জড়িত রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ধুম ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় আশংকাজনক ভাবে মাদক বিক্রি ও সেবন বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে জোরারগঞ্জ থানার তালিকাভূক্ত ইয়াবা সম্রাট করেরহাটের জামাল উদ্দিন ফকির (৩০) কে গ্রেফতার করেছে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ। এসময় তার কাছ থেকে ২৩০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তার বিরুদ্ধে জোরারগঞ্জ থানায় ৭টি মাদক মামলা রয়েছে। এছাড়াও করেরহাট ইউনিয়নে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে মানিক মিয়া, ওছমান গনি, নুরুল আলম, বাবু। তাঁরা পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

এরআগে গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই মাদক সম্রাট আনোয়ার ও লিটন। গত ৬ জুন গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত করেরহাটের মাদক ব্যবসায়ী সাইফুল। বারইয়ারহাট পৌরসভায় আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতার সেল্টারে মাদক ব্যবসা চলছে। পৌরসভার মাছ বাজার, বাঁশ বাজার, ও জামালপুর কালিবাড়ি মন্দিরের আশপাশে দেদারসে মাদক ব্যবসা চলছে। সেখানে আওয়ামীলীগ-বিএনপির কয়েকজন মিলেমিশে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের ওমেরা গ্যাস কারাখানার আশপাশ ও গড়তাকিয়ায় ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় দুই যুবলীগ নেতা। মিরসরাই সদর ইউনিয়নে কিছমত জাফরাবাদ এলাকায় ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করছেন সেলিম নামের একজন। আবুতোরাব বাজারের বেশ কয়েকটি স্পটে ইয়াবা বিক্রি করছেন স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট। মঘাদিয়া ইউনিয়নে একাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কমরআলী এলাকায় সালাউদ্দিন নামের একজন ইয়াবার বাজার গড়ে তুলেছে। অভিযোগ রয়েছে পুলিশকে মাসোয়ারা দিয়ে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অথবা গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুর্বল মামলার কারণে জামিনে বেরিয়ে পুনরায় ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন অনেকে। তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এদিকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযানে গত মে মাসে মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ ৭৬ জনকে আটক করা হয়েছে। মিরসরাই থানায় ৭জন ও জোরারগঞ্জ থানায় ৬৯জন আটক হয়েছে। ১ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত মাদক সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৫০টি। জোরারগঞ্জ থানা সূত্রে জানা গেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে ১১ হাজার ৩শ ৭৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। ইয়াবাসহ আটক হয়েছে ৩৯ জন। মামলা দায়ের হয়েছে ২২টি। ফেনসিডিল উদ্ধার হয়েছে ১৭২ বোতল। মামলা হয়েছে ৩টি। আটক হয়েছে ৩ জন। চোলাইমদ উদ্ধার হয়েছে ৩২০ লিটার। মামলা হয়েছে ৯টি। আটক হয়েছে ১০ জন। গাঁজা উদ্ধার হয়েছে ৮ কেজি ৪০০ গ্রাম। মামলা দায়ের হয়েছে ১০টি। আটক হয়েছে ১৭ জন।

মিরসরাই থানা সূত্রে জানা গেছে, মে মাসে মিরসরাই থানায় মাদক মামলা হয়েছে ৬টি। আসামী আটক হয়েছে ৭জন। ইয়াবা ট্যাবলেট আটক হয়েছে ১১ হাজার ৬৮৯ পিস। ফেনসিডিল ১০ বোতল। গাঁজা ৫৩ কেজি ও চোলাই মদ ৪০ লিটার। এছাড়া গত ৩ মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাইয়ের বিভিন্ন অংশে র‌্যাব, পুলিশের হাতে অনেক ইয়াবা ট্যাবলেট ব্যবসায়ী আটক হয়েছেন।

মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী গা ঢাকা দিয়েছে। অনেকে উপজেলা ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে। পুলিশ তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিদের ধরতে অভিযান চালালেও খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা পুলিশের জালে ধরা পড়ছেন।

মিরসরাই থানার অফিসার ইনচার্জ সাইরুল ইসলাম ও জোরারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদুল কবির বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কোন ছাড় নেই। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত সেই যে দলেরই হোক না কেন তারা কোন ধরনের ছাড় পাবেনা।


আরো সংবাদ