বেটা ভার্সন

ছয় মাসে ৫০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হারিয়েছে ডিএসই

-

বছরের প্রথম ছয় মাসে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন হারিয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৪ লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। কিন্তু গত ১১ জুন লেনদেনশেষে পুঁজিবাজারটির মূলধন দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৮২২ কোটি টাকায়। সে হিসাবে উল্লিখিত সময়ে বাজার মূলধনের ৫১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা হারায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটি।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের শেষ অর্ধ্বেই পুঁজিবাজারে গতি ফিরতে শুরু করে। ওই বছরের ১৫ জুন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স অবস্থান করছিল ৪ হাজার ২৭৫ দশমিক ৪৭ পয়েন্টে। কিন্তু বাজেটসহ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পুঁজিবাজারে ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সময়সীমা বৃদ্ধির ঘোষণা গতি ফিরিয়ে আনে পুঁজিবাজারে। সেই থেকে টানা কয়েক মাস ঊর্ধ্বমুখী থাকে পুঁজিবাজার। বৃদ্ধি পায় লেনদেন ও সূচক। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কিছু পদক্ষেপে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ঊর্ধ্বমুখী পুঁজিবাজারে জোয়ার আসে। একই সময় বেশ কিছু সংস্কার কাজও হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পক্ষ থেকে।
১৫ জুন ৪ হাজর ২৭৫ দশমিক ৪৭ পয়েন্টে থাকা ডিএসইর প্রধান সূচকটি একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩৬ দশমিক ০৫ পয়েন্টে। সে হিসাবে ছয় মাসে ডিএসই সূচকের উন্নতি ঘটে প্রায় সাড়ে ৭০০ পয়েন্ট। একই সময় ডিএসই অন্য দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৩৬ ও ১২৮ পয়েন্ট।
২০১৬ সালের বাজার পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে ২০১৭ সালের প্রায় পুরোটা। ওই বছরের ৩১ আগস্ট ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটি প্রথমবারের মতো ৬ হাজার পয়েন্ট ছাড়ায়। একই বছরের ২৬ নভেম্বর সূচকটি এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৩৩৬ দশমিক ৮৮ পয়েন্টে পৌঁছে। বছরের বাকি সময় সূচকের ওঠানামা থাকলেও বাজার পরিস্থিতি অনেকটা স্থিতিশীল ছিল। ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি ডিএসই সূচক দাঁড়ায় ৬ হাজার ৩১৮ দশমিক ২৭ পয়েন্টে।
জানুয়ারির শেষ দিকে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থবছরের দ্বিতীয় ছয় মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। মুদ্রানীতিতে ব্যাংকগুলোর তারল্য নিয়ে করুণ চিত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে। তখন থেকেই পতন শুরু হয় পুঁজিবাজারে। দিনের পর দিন পতন ঘটতে থাকে পুঁজিবাজার সূচকের। একই সাথে কমতে থাকে বাজারটির লেনদেনও। ২১ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে ডিএসইর লেনদেন ছিল ২ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। সেখানে এক বছরের ব্যবধানে ১৮ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে ডিএসইর লেনদেন নেমে আসে ৩৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ৭০ শতাংশের বেশি লেনদেন কমে ডিএসইর।
এখানেই বাজারের পতনের শুরু। দুই নীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে দুই পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ ও মার্চেন্ট ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে একের পর সংবাদ সম্মেলন করলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ পতন চলতে থাকে জুন পর্যন্ত। আর এ সময় ডিএসইর প্রধান সূচকটি হারায় প্রায় হাজার পয়েন্ট। ৩ জানুয়ারি ৬ হাজার ৩১৮ পয়েন্টে থাকা ডিএসইএক্স সূচকটি গত ১১ জুন নেমে আসে ৫ হাজার ৩২৬ পয়েন্টে। বাজারের এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা বেশ ক’বার হই-হুল্লোড় করতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় তা সম্ভব হয়নি।
বাজার পরিস্থিতির চরম মুহূর্তে গত ৭ জুন অর্থমন্ত্রী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করে। বাজেটে দীর্ঘ দিনের দাাির করপোরেট ট্যাক্স কমানোর কথা থাকলেও প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরদিনের বাজার আচরণে। বাজেটপূর্ব দিনগুলোয় ঊর্ধ্বমুখী হওয়া পুঁজিবাজার আবার নতুন করে পতনের ধারায় ফিরে যায়।
তবে গত কয়েক মাসের বাজার আচরণে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট ছিল ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ব্যাপক দরপতন। অতীতে বিভিন্ন সময় পুঁজিবাজারে দরপতন ঘটে থাকলেও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর দরে তার খুব একটা প্রভাব পড়ত না। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম ঘটে। গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, এসিআই লিমিটেডসহ বেশির ভাগ ভালো কোম্পানি এবার মারাত্মক দর হারায়। পক্ষান্তরে অপেক্ষাকৃত কম মৌলভিত্তির বেশি কিছু কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে অস্বাভাবিকভাবে।
এছাড়া ২০১৭ সালের শেষ দিকে ব্যাংকিং খাতের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে শুরু করে, যা পুঁজিবাজারটির বাজার ম্যূলধনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। কিন্তু ব্যাংকের তারল্য সঙ্কটের বিষয়টি প্রকাশ পেলে এ খাতে ব্যাপক দরপতন শুরু হয়। এটাই মূলত বাজার মূলধনের বড় রকম অবনতি ঘটায়। পাশাপাশি গ্রামীণফোন ও স্কয়ার ফার্মার মতো বড় মূলধনের কোম্পানিগুলোর দরপতনই ডিএসইর বাজার মূলধনের এ অবনতি ঘটায়।

 


আরো সংবাদ