১৬ নভেম্বর ২০১৯

চলছে ইলিশ শিকারের মহোৎসব

পটুয়াখালীর দুমকিতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পায়রা ও লোহালিয়া নদীতে চলছে মা ইলিশ শিকারের উৎসব। তবে 'রক্ষক যখন ভক্ষক' সেখানে অভিযান কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়!

মৎস্য বিভাগের স্পীড বোট চালক মোঃ জুয়েল তিনি নিজেই পাহারা দিয়ে নদীতে জেলেদের জাল দিতে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গত রোববার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত খেয়া ঘাটে অবস্থান করলে এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। সরেজমিনে দেখা যায়, স্পীড বোটে শুয়ে আছেন জুয়েল। পাশ দিয়ে নৌ-পুলিশের ট্রলার যাওয়ার সময় মোবাইল ফোনে জেলেদের সতর্ক করে দিচ্ছেন। তীরে নিরাপদ আশ্রয়ে আসতে সতর্ক সংকেত দিচ্ছেন। এর ১০ মিনিট পরেই দেখা গেলো ঘাটে জনৈক মহিলা এসে জুয়েল কে বলছেন যে তাদের কোন খোঁজ পেলেন? তার প্রশ্নের উত্তরে জুয়েল বললো সমস্যা নেই কথা হয়েছে তারা নিরাপদে আছেন।

স্থানীয়রা জানান, এই মহিলা হাজীরহাট বাজারের মৎস্য আড়ৎদার ও জেলে মোঃ রেজাউল মৃধার স্ত্রী। তার ঘরেই জুয়েল খাওয়া-দাওয়া করেন। রেজাউল এর সাথে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নদীতে জাল দেয়ায় সাহায্য করেন জুয়েল। তবে এবিষয়ে জুয়েলের কাছে জানতে চাইলে কোন সদুত্তর দিতে পারেনি তিনি। খাওয়া-দাওয়ার কথাটা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে বলেন, মাঝে মধ্যে খাই।

তিনি বলেন, আমাকে নিয়ে না ঘেটে বড় নেতাদের খোঁজ নেন, তাদের আশ্রয়েই জেলেরা নদীতে জাল দেয়। নেতাদের নাম জানতে চাইলে তিনি নাম বলতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, নাম বললে আমার সমস্যা হবে আমি নাম বলতে পারবোনা।

সকাল ৭টায় জুয়েলের সামনে নদীতে জাল ফেলা হলেও তিনি বলেন আমি একা নদীতে যেতে পারি নাঅ এখানে ফারুক চৌকিদার (গ্রাম পুলিশ) কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাল দেখা মাত্রই যেন আমাকে নিয়ে নদীতে নামেন। কিন্তু তিনি এখন বাসায় ঘুমাচ্ছে আমি একা কি করবো! সকাল ৭টা ২০ মিনিটের সময় ফারুক চৌকিদার ধীরে ধীরে হাটতে হাটতে ঘাটে আসেন। তাকে জাল দেয়ার বিষয়টি বলা হলে তিনি বলেন, মুই(আমি) কি করমু গাঙ্গে(নদীতে) জেলেগো কেনু (মাইর) খামু। সাইবেরা(কর্মকর্তা) যা কইবে হেইয়াই(তা) কি পালন করতে হইবে।

বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসার শঙ্কর কুমার বিশ্বাসকে অবহিত করা হলে তিনি মৎস্য কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে জানালে তাৎক্ষণিক ট্রলার চালিয়ে হাজিরহাট খেয়া ঘাটে আসেন। ধাওয়া করলে জেলেরা নৌকা ফেলে পালিয়ে গেলেও দুটি নৌকা থেকে বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল উদ্ধার করা হয়।

এছাড়াও প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই কতিপয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় মা ইলিশ শিকার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের আলগী এলাকার কয়েক ব্যক্তি জানান, প্রশাসনের লোকজন পায়রা নদীর যেসব পয়েন্টে টহল দেন, মূলত সেসব পয়েন্টে জেলেরা মাছ শিকার করেন না। আবার যেসব পয়েন্টে জেলেরা জাল ফেলে মা ইলিশ শিকার করেন, সেখানে প্রশাসনের লোকজন টহল দেন না। তাই ধারণা করা হচ্ছে, তাদের ম্যানেজ করেই জেলেরা নদীতে মা-ইলিশ শিকার করছেন।

শনিবার উত্তর মুরাদিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীরের এক বাড়ির ভিতর ১০-১৫ জন লোক দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যেতেই দৌড়ে পালিয়ে যায়। নদীতে জাল দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে ধারণা স্থানীয়দের। কিছুক্ষণ পরে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।

দেখা যায়, ছোট খালের ভিতরে ৫টি নৌকায় কারেন্ট জাল সাজানো যা কিছুক্ষণ পরেই নদীতে ফেলা হতো। স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, এখানে যাদের জাল দেখছেন তারা আসলে জেলে নন। এই সময়টা আসলেই তারা প্রশাসনের সাথে কন্টাক্ট করে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করেন।

দুপুর সাড়ে ১২টা। নদীতে বেশ কয়েকজন জাল ফেলেছেন এসময় হঠাৎ কোস্টগার্ডের স্পীড বোটের শব্দ পেয়ে জেলেরা কিনারে ছোট ছোট খালে অবস্থান নেয়। স্পীড বোটে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
স্থানীয় লোকজন জানায়, সব নৌকাগুলো নদীতে জাল ফেলে মুরাদিয়া ও আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের চরের ছোট ছোট খালে আশ্রয় নেয় এবং সময় হলে জাল উঠায়।

তারা আরও জানান, এ জেলেদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের কিছু অসাধু নেতাদের যোগসূত্র রয়েছে। ইলিশ প্রজননের এ নিষেধাজ্ঞার সময় সংঘবদ্ধ ওই রাজনৈতিক দলের চক্রটি লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করে আয় করে নেয়।

নেতাদের নাম জানতে চাইলে স্থানীয়রা বলেন, ‘সবাই তাদের নাম জানে। আমরা নাম বলে এলাকা ছাড়া হবো। বোঝেন না? কোস্টগার্ড ও প্রশাসন কিছু বলে না কেন? ওই নেতারাই কোস্টগার্ড আর পুলিশকে ম্যানেজ করে জেলেদের নদীতে নামিয়ে দিয়েছে। অবৈধভাবে শিকার করা ওই ইলিশ ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ এক ৫০০ টাকায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। তাই মৎস্য অভিযানের নামে চলছে অরাজকতা। রক্ষকগণ ভক্ষকের ভূমিকায়।

পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ: লতিফ আকন অভিযোগ করে বলেন, দুমকি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছাড়া সবাইকেই জেলেরা ম্যানেজ করেছেন। যার ফলে তাদের নদীতে জাল দিতে কোন সমস্যা হচ্ছে না। তবে এভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকাকালীন জেলেরা নদীতে মা ইলিশ শিকার অব্যাহত থাকলে ইলিশের প্রজনন ব্যহত হবে। তাই আমি রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার্থে উর্ধতন কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুমকি মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দিন বলেন, ম্যানেজ এর কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। নদীতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ যাবত আমাদের অভিযানে সাত জেলেকে আটক করা হয়েছে যাদের মধ্যে চার জনকে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা ও তিন জনকে এক বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল উদ্ধার করে ধ্বংস করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শঙ্কর কুমার বিশ্বাস বলেন, পায়রা ও লোহালিয়া নদী সার্বক্ষণিক আমাদের নজরদারিতে আছে। নদীতে মৎস্য কর্মকর্তাসহ থানা স্টাফ টহলরত আবস্থায় আছেন। তবে এর মধ্যেও যদি কেউ নদীতে জাল দেন তাহলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

তবে স্পীড বোট চালক জুয়েল হোসেনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযোগের প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। যদি কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায় তবে কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা।


আরো সংবাদ

যথাযথ মর্যাদায় ভেটারানস ডে উদযাপিত নাশকতা কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে : রেলমন্ত্রী বাবরি মসজিদ রক্ষায় মুসলিমদেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে : ইসলামী আন্দোলন কুমিল্লায় ২ কিশোর ও গেটম্যানের বুদ্ধিমত্তায় রক্ষা পেল যাত্রীবাহী ট্রেন রাষ্ট্রপতি দেশে ফিরেছেন সাভার উপজেলা আ’লীগের সম্মেলনে : হাসিনা-সভাপতি রাজিব-সাধারণ সম্পাদক প্রধানমন্ত্রী দুবাই এয়ারশোতে যোগ দিতে আমিরাত যাচ্ছেন আজ ঢাবি থেকে ২৬ জনের পিএইচডি লাভ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অবসর গ্রহণের সুযোগ নেই : মহানগর জামায়াত অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি জ্ঞাপনপত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রত্যাখ্যান তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলো কমিটি

সকল