১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আশাশুনিতে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করছেন গ্রামবাসী

আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহনিয়া পয়েন্টে পাউবোর ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করছেন গ্রামবাসী : নয়া দিগন্ত -

সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহনিয়া ও হরিষখালি পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মেরামত করছেন গ্রামবাসী। পাউবো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো প্রকার সাড়া না পেয়ে এলাকায় মাইকিং করে সবাইকে ডেকে এনে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গত শনিবার সকাল থেকে এই বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করা হয়।
কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদীবেষ্টিত আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। প্রতিনিয়ত এই নদ ও নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানি ঢুকে প্রতাপনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার খাল-বিল, চিংড়ি ঘের ও পুকুরের মিঠা পানির মাছ ও সবুজ বেষ্টনী ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর ফলে এলাকার ফলদ, বনজ ও ওষুধি বৃক্ষ এখন বিলুপ্ত প্রায়।
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২ এর আওতাধীন ৭/২ নম্বর পোল্ডারে আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহনিয়া ও হরিষখালি পয়েন্টে সহস্রাধিক মিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষা মওসুমের শুরুতেই নদ-নদীতে জোয়ার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই দু’টি পয়েন্টে বাঁধের ভাঙন আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে। কিন্তু পাউবো কর্তৃপক্ষ এ এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বাঁধ ভেঙে গেলে একজন ঠিকাদারের মাধ্যমে দায়সারা গোছের কাজ করে কোনো রকমে ভাঙন পয়েন্টটি মেরামত করা হয়। বছর না যেতেই আবার সেখানে ভাঙন দেখা দেয়ায় বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে নদীভাঙন থেকে কখনোই নিষ্কৃতি পান না প্রতাপনগর ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন জানান, তার ইউনিয়ন তিন দিক থেকে খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদবেষ্টিত হওয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রতি বছর এই ইউনিয়নের কোনো না কোনো জায়গার বাঁধ ভাঙা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ বার এ ইউনিয়নের কোনো না কোনো জায়গায় বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবশেষ আট মাস আগে চাকলা গ্রামের বাঁধ ভেঙে কয়েক শ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৫০০ বিঘা জমি বাদ দিয়ে একটি বিকল্প রিং বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি আটকানো হয়েছে। ফলে ওই ৫০০ বিঘা জমিতে বসবাসকারী দুই শতাধিক পরিবারের বসতভিটায় এখন জোয়ার-ভাটার খেলা চলছে। তার ইউনিয়নের বেশির ভাগ বেড়িবাঁধ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ফলে বর্ষা এলেই তাদেরকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করতে হয়। তিনি আরো বলেন, কুড়িকাহনিয়া গ্রামের ঋষিপল্লী থেকে রুইয়ারবিল পর্যন্ত প্রায় ৫০টি চেইন এবং হরিষখালি গ্রামের স্লুইসগেট থেকে আয়ুব আলীর মৎস্য ঘের পর্যন্ত প্রায় চার-পাঁচটি চেইন বাঁধ দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার অবহিত করার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বর্তমানে কুড়িকাহনিয়া ও হরিষখালি পয়েন্টে বেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই খারাপ। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে। এ জন্য কয়েক দিন ধরে ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন। পাউবো কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামতে উদ্যোগ না নেয়ায় আমি গ্রামবাসীকে নিয়ে স্বেছাশ্রমে বাঁধ মেরামতের সিদ্ধান্ত নেই। গত শুক্রবার ইউনিয়নের সব মসজিদে প্রচারের পাশাপাশি এলাকায় মাইকিং করে শনিবার থেকে গ্রামবাসীকে বাঁধ মেরামতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাই।
চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইউনিয়নবাসী গত শনিবার সকাল থেকে কুড়িকাহনিয়া ও হরিষখালি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজে অংশ নিয়েছেন। আমি ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে তাদের দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আশা করছি ২-১ দিনের মধ্যে কুড়িকাহনিয়া ও হরিষখালি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ কিছুটা হলেও মেরামত করা সম্ভব হবে। তিনি এই দু’টি পয়েন্টে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে পাউবো কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানান।
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ উজ্জামান খান জানান, তার বিভাগের আওতাধীনে আশাশুনি উপজেলার ৮০ কিলোমিটার বাঁধ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কোরবানির ঈদের আগে পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি ভাঙন পয়েন্ট পরিদর্শন করেছেন। একই সময় ক্ষতিগ্রস্ত ৫৮টি পয়েন্ট জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। এর মধ্যে ১৩টি পয়েন্ট মেরামতের জন্য দুই কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে। টাকা পেলে অগ্রধিকার ভিত্তিতে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামতের কাজ করা হবে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় পাউবো বিভাগ-২ এর অধীনে ৭/১, ৭/২ ও ১৩-১৪/১ এবং ১৩-১৪/২ নম্বর পোল্ডারের ভাঙনকবলিত এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেটি পাস হলে পর্যায়ক্রমে এলাকাভিত্তিক প্রয়োজনসাপেক্ষে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে।

 


আরো সংবাদ

সকল