২৩ আগস্ট ২০১৯

সুনামগঞ্জে বজ্রাঘাতে চার বছরে মৃত্যু ১০২ জনের আতঙ্কিত হাওড়বাসী

-

সুনামগঞ্জে বর্ষা ও বন্যায় বজ্রাঘাতের আতঙ্কে আছেন অসহায় হাওরবাসী। সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলায় বিভিন্ন সময়ে চার বছরের ব্যবধানে বজ্রাঘাতে ১০২ জন নিহত হয়েছেন। গত ১৩ জুলাই তাহিরপুর উপজেলায় দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের মানিকখিলা গ্রামের বৌলাই নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মৃত মিরাজ আলীর ছেলে হারিদুল (৪৫) ও তার ছেলে তারা মিয়ার (১০) মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ১০ জুলাই জেলার জামালগঞ্জ উপজেলায় একটি স্কুল থেকে সাবিতুল নিজ সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে হেলিপ্যাড মাঠে বজ্রাঘাতে মারা যান বাবা সাবিতুল ও ছেলে অন্তর।
সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের অভিভাবকেরা হাদিউজ্জামান, শফিকুল ইসলামসহ অনেকেই হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে চিন্তায় আছেন। বর্তমান সময়ে বন্যায় ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মাঝেই হাওর পাড়ি দিয়ে তারা স্কুলে যাচ্ছে। যেকোনো সময় আরো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বিশেষ বিবেচনায় বন্যায় ও দুর্যোগকালীন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখার আহ্বান জানান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে কাছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৭ সাল পর্যন্ত জেলার দিরাইয়ে ১৭ জন, তাহিরপুরে ৯ জন, শাল্লায় ৮ জন, সুনামগঞ্জ সদরে ৭ জন, ধর্মপাশায় ৭ জন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ৬ জন, জগন্নাথপুরে ৪ জন, দোয়ারাবাজার ৪ জন, ছাতকে ২ জন, জামালগঞ্জে ২ জন, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ১জনসহ মোট ৬৮জন বজ্রপাতে মারা যান। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ৩৭ জন, ২০১৬ সালে ২০ জন ও ২০১৭ সালে ১১ জন ও ২০১৮ সালে বজ্রপাতে ২৪ জনসহ মোট ৯২ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ১৫ জুলাই ২০১৯ পর্যন্ত বজ্রাঘাতে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বজ্রপাতের আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক।
সুনামগঞ্জে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়া জন্য মানবসৃষ্ট পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বজ্রপাত সাধারণত হাইয়েস্ট, লংগেস্ট ও টলেস্ট বস্তর ওপর আঘাত করে। হাওর এলাকায় বজ্রপাত বেশি হওয়ার কারণ হলো সেখানে বজ্রপাত হলেও কোনো প্রটেকশন পাওয়া যায় না। ধানের ফলন বিলম্বিত হওয়ায় খোলা মাঠে ও হাওরে মাছ ধরার কাজে বেশি সময় কাটাচ্ছেন হাওরবাসী। এ ছাড়াও আবহাওয়া জ্ঞান সম্পর্কে অসচেতনতা ও উন্মুক্ত হাওর এলাকায় গাছপালার অভাব এবং সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের কারণে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে।
হাওর পাড়ের কৃষক জহিরুল ইসলাম, বাবলু মিয়াসহ এলাকাবাসী জানান, সুনামগঞ্জের শেষ প্রান্তে মেঘালয় পাহাড়ের অবস্থান। তাই স্থায়ীভাবে তৈরি মেঘ ও জলীয় বাষ্প সরাসরি পাহাড় অতিক্রম করতে পারে না। ফলে আকাশে একটি গভীর কালো মেঘমালা তৈরি হয়ে বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতে যারা মারা যান তাদের বেশির ভাগই হাওর এলাকার প্রান্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের লোকজন। তারা আরো জানান, আবহাওয়া ও বজ্রপাতের তথ্য না পাওয়া এবং সচেতনতার অভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ওই সব পরিবারে একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তিটিকে হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন পরিবারগুলোর সদস্যরা। তাই দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান হাওরবাসী।
কৃষকসহ সর্বস্তরের জনসাধারণের জীবন রক্ষার্থে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত নিরোধন যন্ত্র স্থাপন করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, আগে এত বজ্রপাত হতো না। হলেও বজ্রাঘাতে এভাবে মানুষ মারা যেত না।
বজ্রপাতের মূল কারণ প্রাকৃতিক পরিবেশের পরির্বতন ও মানবসৃষ্টসহ বিভিন্ন কারণ। আবহাওয়া ও বজ্রপাতের কোনো তথ্য না পাওয়া এবং সচেতনতার অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাওরবাসী।
সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার বিভাগ উপ-পরিচালক এমরান হোসেন জানান, হাওর এলাকায় তালগাছসহ বিভিন্ন প্রকার গাছ লাগিয়ে বজ্রপাত প্রতিরোধে আমাদের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ইদানীং বজ্রপাতে বেশি মৃত্যু হওয়ার কারণ হলো ধান বিলম্বে পরিপক্ব হওয়ায় পুরো বজ্রপাত মওসুমে হাওরের খোলা আকাশের নিচে কৃষকসহ সর্বস্তরের মানুষ বেশি অবস্থান করেন এবং কোনো কোনো সময় বজ্রাঘাতে মারা যান। বজ্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য সবার সচেতনতা ও সতর্ক থাকতে হবে।

 


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet