২১ জুলাই ২০১৯

ঝিনাইদহে সাধুহাটির মাঠে মাঠে পুকুর জলাবদ্ধতায় ফসলহানির আশঙ্কা

সাধুহাটি ফসলের মাঠে পুকুর খননের দৃশ্য : নয়া দিগন্ত -

ঝিনাইদহের সাধুহাটি এলাকার মাঠে মাঠে অবৈধ পুকুর খনন চলছে। খাল, বিল ও ফসলের মাঠে পুকুর কাটায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সাধুহাটি বীজ উৎপাদন খামারের ২২ একর বীজ ক্ষেতসহ পাশর্^বর্তী এলাকার কয়েক হাজার একর জমির আউশ, আমন, বোরো ও রবি ফসলের জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এলাকার কৃষক ও বীজ উৎপাদন খামারের কর্মকর্তা অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না। তারা পুকুর মালিক প্রভাবশালীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। ধান ও ফসলের জমি রক্ষার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
এলাকাবাসী জানায়, সাধুহাটি, মধুহাটি সাগান্ন ইউনিয়নসহ পাশর্^বর্তী এলাকার জমিগুলো তিন ফসলি। এসব এলাকার মাঠে মাঠে ধান, পাট, আখ, ছোলা মুগ, মসুরসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়ে থাকে। মাঠের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন বিল ও খাল দিয়ে বর্ষা মওসুমে নবগঙ্গা, ইছামতি ও চিত্রা নদীতে পানি নেমে যায়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সাধুহাটি সরকারি বীজ উৎপাদন খামারের নিচে নলবিলের বুকে, মাগুরাপাড়া ও নাথকুণ্ডু গ্রামের খালের মুখে, সাধুহাটির ছাইভাঙ্গা বিল ভেদুড়ের বিল, বংকীরা বিলসহ বিভিন্ন বিলের মাঝে এবং সরকারি-বেসরকারি উঁচু ফসলের জমিতে পুকুর ও ঘের কেটে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও লোভী ব্যক্তিরা একের পর এক পুকুর কেটে চলেছে। তাদের ক্ষমতার দাপট আর হুমকির কারণে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। অসহায় কৃষক ইচ্ছা না থাকলেও বাধ্য হয়ে প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে জমি লিজ দিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকের জমি ইতোমধ্যে অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে পুকুরের বিরূপ প্রভাবে।
এলাকাবাসী জানায়, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে জানানোর পরও কোনো প্রতিকার তারা পায়নি।
সাধুহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী নাজিরউদ্দিন জানান, পুকুর খননের প্রভাবে এলাকার মাগুরাপাড়া, পোতাহাটি, সাধুহাটিসহ এ ঞ্চলের ২০ থেকে ৩০টি মাঠ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাধুহাটি বীজ উৎপাদন খামারের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো: মজিবর রহমান জানান, বিলে ও মাঠে পুকুর খননের কারণে তার ফার্মের ১২ একর বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে আছে। পানি বাড়লে বর্ষাকালে ২২ একর তলিয়ে যায়। ফলে দেশের প্রথম ভিত্তিবীজ উৎপাদনকারী এ কৃষি খামার থেকে ২২ একর জমির বীজ সরবরাহ থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি আরো জানান, এ বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসক ও কৃষি বিভাগকে অবহিত করেছেন। তবে এখনো কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তিনি আরো জানান, কয়েক দিন আগে জেলা প্রশাসক সরোজকুমার নাথ তার দফতরের লোক ও পুলিশ পাঠিয়ে পুকুর কাটা বন্ধ করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পুকুর মালিক আবার সাধুহাটি কৃষিফার্ম সংলগ্ন জমিতে নতুন করে মেশিন লাগিয়ে রাতে পুকুর কেটেছে। তিনি সাধুহাটি ফার্ম ও কৃষি রক্ষার জন্য প্রশাসনসহ এলাকার মানুষকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করেছেন।
সাগান্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আল মামুন জানান, ওসব পুকুর ঘের কাটার কারণে তার এলাকার স্বাভাবিক ফসলের জমি পানিতে ডুবে যাচ্ছে। একই অভিযোগ, মাগুরাপাড়া গ্রামের প্রবীণ সমাজসেবক আব্দুল বারি মিয়া, কৃষক রফিকুল ইসলাম, মামুন শিয়ার আব্দুল মতিন, সাবেক চেয়ারম্যান বাকের আলী বিশ^াস, আবুল কােেসম বিশ^াস, মিজানুর রহমানসহ এলাকার শতাধিক ভূমি মালিকের।
পোতাহাটি গ্রামের কৃষক শামসুদ্দিন জানান, এ মাঠে নাথকুণ্ডুর এলাহী বক্স একজন সবচেয়ে উঁচু মাঠ বলে পরিচিত ঘোপের মাঠ, সেখানে পুকুর কেটেছে। ফলে ওই মাঠে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ১৯৭১ সালের আগ থেকে পুকুর কাটার আগ পর্যন্ত ও মাঠে আখ, পাট, ধান, ছোলা, মসুরসহ আউশ ধান চাষ হতো।
প্রভাবশালী আনার হোসেন নামের একজন। তিনি নলবিলের মাঝে বিশাল অট্টালিকা বানিয়ে ২০০ বিঘা জমিতে পুকুর কেঠে অন্যের ক্ষতি করে মাছের চাষ ও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দেখাদেখি অনেকেই এখন পুকুর ও মাছ চাষের দিকে ঝুঁকেছে। তিনি জেলা প্রশাসনের বিনা অনুমতিতে বিলে বিশাল প্রাসাদ তৈরি করেছেন। পাশে বিলের পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ করে মাছ চাষ করছেন। তিনি কারো কথা তোয়াক্কা করছেন না।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক সরোজকুমার নাথ জানান, জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কেউ জমির শ্রেণীর পরিবর্তন ঘটাতে পাবে না। তিনি ধানের মাঠে পুকুর খনন, খাল-বিলের বুকে ও সরকারের জমিতে পুকুর এবং ঘের কেটে পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ করে সাধারণ কৃষকের জমি ক্ষতি করার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন। তিনি আরো বলেন আমরা চারটি সার্ভে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছি। কমিটি কে কে কোথায় কোথায় অবৈধভাবে জমির ক্ষতি করে পুকুর কেটেছে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং ফসল চাষের নিশ্চিত পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। কোনোভাবেই কুকুর খননকারী প্রভাবশালীরা ছাড় পাবে না।


আরো সংবাদ

gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi