২১ জুলাই ২০১৯

বুড়িমারীতে ১০ বছরে সিলোকোসিস রোগে ৬৭ জনের মৃত্যু

পাথর ভাঙা মেশিনের বিরূপ প্রভাব
-

লালমনিরহাটের বুড়িমারীতে ১০ বছরে সিলোকোসিস রোগে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর কারণ হিসেবে শহরে অতিরিক্ত ধুলাবালুকে দায়ী করা হচ্ছে। স্থলবন্দর বুড়িমারীতে সানগ্লাস ও মাস্ক ছাড়া চলাচল করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে বিদেশী নাগরিকেরা এ স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মুখে পড়ছেন। বন্দর অতিক্রম করেই ধুলায় নাক মুখ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সার্বক্ষণিক ধুলায় অন্ধকার থাকে এ বন্দরের রাস্তা ঘাটসহ পুরো জনপদ।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা শহর থেকে বুড়িমারী স্থলবন্দরগামী পুরো মহাসড়কের দুই পাশে খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত পরিবেশে অসংখ্য পাথর ক্রাশ মেশিন বসানো হয়েছে। এতে স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থী, ওই এলাকায় কর্মরত চাকরিজীবী এবং পথচারীরা পড়েছেন বিপাকে। এরই মধ্যে এলাকা ছেড়েছেন অনেকেই।
বুড়িমারী হাসর উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তহমিনা আক্তার জানান, সানগ্লাস আর মাস্ক ছাড়া বিদ্যালয় আসা-যাওয়াই শুধু নয় ক্লাস করাও কষ্টকর। বিদ্যালয় থেকে ফিরেই পোশাক ধুয়ে দিতে হয়। তবুও সর্দি-কাশি সর্বদায় লেগেই থাকে।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক একজন সরকারি কর্মচারী জানান, শুধু ধুলার কারণে ওই এলাকার দায়িত্ব পালনে কেউ যেতে চান না। এক দিন গেলে আর যেতে ইচ্ছে হয় না। স্থলবন্দরের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে এসব পাথর ক্রাশ মেশিন সরানোর দাবি জানান তিনি।
পুরুষরা দৈনিক ৩০০ টাকা ও নারীরা ১৮০ টাকা মজুরিতে পাথর ভাঙার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন। বুড়িমারী এলাকায় যত্রতত্র গড়ে উঠা এসব পাথর ক্রাশ মেশিনে শত শত শ্রমিক কাজ করছেন মাস্ক বা বিশেষ পোশাক ছাড়াই। ফলে তারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন সিলোকোসিস রোগে। পাথরের সিলিকন মানবদেহে প্রবেশ করে লিভার ও ফুসফুসে জমাট বেঁধে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এ ভাবে মানবদেহে সিলোকোসিস রোগের জন্ম দেয়। পরে আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন পাথর ক্রাশ মেশিনের শ্রমিকেরা।
সর্বশেষ বুড়িমারী ইউনিয়নের উফারমারা ঠাকুরপাড়া এলাকার দুলাল হোসেন (৩৫) নামে একজন শ্রমিক সিলিকোসিস রোগে মারা যান। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন অনেকেই।
সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত ভিক্টোরিয়া মোজাইক ফ্যাক্টরির পাথর ভাঙাশ্রমিক আজানুর রহমান (৩০), আইয়ুব আলী (২৮) জানান, প্রথমে শ্বাসকষ্ট পরীক্ষা করে জানতে পারেন সিলিকোসিস রোগ হয়েছে। বহুদিন ধরে চিকিৎসা নিলেও কার্যত কোনো উন্নতি হচ্ছে না। দিন দিন এই রোগে আক্রান্ত শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের উদ্যোগে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির সহযোগিতায় ৬ নভেম্বর বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে এসব শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিস রোগে আক্রান্তদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরামর্শ প্রদান ও বিনামূল্যে ওষুধসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
ধুলাবালু না উড়তে পর্যাপ্ত পানি ব্যবহারে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করছেন না কোনো প্রতিষ্ঠানই। ফলে বুড়িমারী জনপদের প্রতিটি মানুষ সিলোকোসিসের মতো মারণ ব্যাধির ঝুঁকিতে রয়েছেন। জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে এসব পাথর ক্রাশ মেশিন সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ নিশাত জানান, ধুলা না উড়তে প্রতিটি পাথর ক্রাশ মেশিনে ও আশপাশ এলাকায় পর্যাপ্ত পানি ঢালার নির্দেশনা দেয়া হলেও অনেকেই মানছেন না। এসব মেশিন জনবসতিহীন স্থানে সরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় জায়গা খোঁজা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর কুতুবুল আলম জানান, যেসব পাথর ক্রাশ মেশিন পানি না ছিটিয়ে পাথর ভাঙছেন বা শ্রমিকদের মাস্ক সরবরাহ করছে না তাদের বিরুদ্ধে প্রায় সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।

 


আরো সংবাদ

gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi