১৬ জুন ২০১৯

মনু নদীতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি : ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম নদী পাড়ের মানুষ

রাজনগরের মনু নদীর বাঁধ রক্ষায় বালুর বস্তা ফেলার দৃশ্য :নয়া দিগন্ত -

মৌলভীবাজারে গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ মনু নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী পাড়ের মানুষের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ফলে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন মনু পাড়ের আদিনাবাদ, একামধু ও কালাইকোনা গ্রামসহ আশপাশের বাসিন্দারা। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত শনিবার দুপুর থেকে মনু ও ধলাই নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জানা যায়, গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং ভারতের কৈলাশহরে ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের কারণে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে মনু ও ধলাই নদীতে দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিগত বছরের মতো বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশের আশঙ্কা দেখা দেয়। এতে মনু পাড়ের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। মনু নদীর রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের কালাইকোনা এলাকায় এবং টেংরা ইউনিয়নের আদিনাবাদ এলাকার কয়েকটি স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিলে এলাকাবাসী রাত জেগে পাহারা দিয়েছেন। বাঁধে বস্তা ফেলে কোনো মতে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনও ভাঙন ঠেকাতে সাহায্য করেছে। গত রোববার আদিনাবাদ এলাকার সম্ভাব্য ভাঙন এলাকায় পানি ছুঁই ছুঁই করছে।
গ্রামের ফারুক মিয়া (৫৯), মকলু মিয়া (৫০) ও ফটিক মিয়া (৬০) জানান, বর্ষা এলেই আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটাতে হয়। এলাকার জনপ্রতিনিধিরা বর্ষায় সান্ত্বনা দেন। তারা সাময়িকভাবে বাঁধ মেরামত করান। বাঁধ নিয়ে স্থায়ী চিন্তা করা হয় না। ব্লক না ফেলে শুধু মাটি দিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না। তারা জানান, এবার মানুষ বেশি আতঙ্কিত ছিল গত বছরের কথা স্মরণ করে। গত ঈদুল ফিতরের সময় মনু নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করেছিল রাজনগর উপজেলার কয়েকটি গ্রাম এলাকায় এবং মৌলভীবাজার শহরের একাংশে। তা ছাড়া মনু নদী খননের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা খুবই সামান্য বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে নদীপাড়ের মানুষের কাছে ভরাট হওয়া এই নদী প্রতি বর্ষায় মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দেখা দেয়।
জানা যায়, দীর্ঘ দিনের পলি জমে মনু নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন স্থান মারাত্মকভাবে চর জেগে ওঠে। এতে স্বল্পমাত্রার বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফুলে ফেঁপে ওঠে মনু। পানি ধারণের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় নদীর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচে বন্যা আক্রান্ত হয় তীরবর্তী এলাকার মানুষ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় মনু নদী অনেক গভীর ছিল। মনু নদীতে কম-বেশি নৌচলাচল ছিল। নৌপথে দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য আনা-নেয়া হতো নদীপথে। আশির দশকের প্রথম দিকে মনু নদীকেন্দ্রিক মনু প্রকল্পে গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় মনু নদীর পানি শুষ্ক মওসুমে সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য মৌলভীবাজার শহরতলির মাতারকাপন এলাকায় মনু ব্যারেজ স্থাপন করা হয়। ব্যারেজ স্থাপনের পর থেকে ব্যারেজের উজান ও ভাটিতে পলি মাটি জমে মনু নদী ভরাট হতে থাকে। শুষ্ক মওসুমে অনেক স্থানই শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়। ভরাট হওয়ার কারণে মনু নদীর গভীরতা কমে যায়। বর্ষায় বৃষ্টির পানি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্রায় বছরই বাঁধ ভাঙা বন্যার সৃষ্টি হয়।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র সংকর চক্রবর্তী জানান, মনু-ধলাই নদীতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ার মূল কারণ ভারতের কৈলাশহর ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই বৃষ্টির পানি এই নদ দিয়ে আসে। তিনি আরো জানান, শুক্রবার রাতে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের দুই জায়গায় ভাঙনের আশঙ্কা থাকলেও বস্তা ফেলে ঠেকানো হয়েছে। এখন পানি দুই নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধলাই ব্রিজের কাছে ৯৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং মনু ব্রিজের কাছে ৫৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।


আরো সংবাদ