১৯ আগস্ট ২০১৯

হারাগাছে দেড় দশক ধরে ঝুলে আছে ধুম নদীতে ব্রিজ নির্মাণকাজ

হারাগাছে ধুম নদীতে ব্রিজ নির্মাণ না হওয়ায় বাঁশের এই সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয় এলাকাবাসীকে :নয়া দিগন্ত -

দুই দফায় অর্থ বরাদ্দ হলেও দীর্ঘ ১৫ বছরেও নির্মাণ শুরু হয়নি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছের ধুম নদীর বিলের ওপর ব্রিজ। দুর্ভোগে দিশেহারা স্থানীয়রা ও বাঁশের সাঁকো পরিচালনা কমিটি নিজেরা চাঁদা তুলে ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে পিলার বসালে তাও করতে দেয়া হয়নি। বলা হচ্ছে ‘নির্মাণের ক্রেডিট’ ইস্যুতে বিড়ি শিল্পপতিদের আধিপত্য বিস্তারের জেরে নির্মাণের উদ্যোগ মাঠে গড়াচ্ছে না। তবে হারাগাছ পৌরসভা এবং সারাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ব্রিজটি নির্মাণের জন্য শিগগিরই টেন্ডারের আশার কথা বললেও উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার বলেছেন এ বিষয়ে কোনো আপডেট নেই।
সরেজমিন দেখা গেছে, কাউনিয়ার সারাই ইউনিয়ন ও হারাগাছ পৌরসভার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ধুম নদী বিলের দুই পাশের মানুষের ভোগান্তির চিত্র। ওই বিলের দুই পাশে রয়েছে ধুমেরকুঠি, ঠাকুর হারাগাছ, ঠাকুরদাস, মেনাজ বাজার, মায়ারবাজার, শিবসারাই, মিলনবাজার, হকবাজার, একতাবাজার, খানসামা, নাজিরদহ, পাইকার বাজার, সারের বাজার, চাঁদকুঠি, পল্লীমারির চরসহ প্রায় ৫০টি গ্রাম। এই গ্রামে বসবাস করেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। ওই বিলের উভয় পাশে রয়েছে ধুমেরকুঠি সিনিয়র মাদরাসা, হারাগাছ মডেল কলেজ, আলেফ উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়, নবিতন নেছা উচ্চবিদ্যালয়, হারাগাছ হাইস্কুল এবং ধামের পাড়, বাংলাবাজার ও মোল্লাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ প্রায় ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিলের ওপর কোনো ব্রিজ নির্মাণ না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে চাঁদা তুলে প্রতি বছর বাঁশের সাঁকো বানানো হয়। সেই সাঁকো দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রাইমারি স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীসহ প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মানুষ যাতায়াত করে। এতে দুর্ঘটনা এখানে হয় হরহামেশাই।
এলাকাবাসী জানান, যাতায়াতের ক্ষেত্রে তাদের দুর্ভোগের চিত্র জানিয়ে বিলের ওপর ব্রিজ নির্মাণের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করা হয়েছে। বহু আবেদন নিবেদনের পর ব্রিজটি নির্মাণের জন্য ২০০৩ ও ২০০৪ সালে দুই দফায় ২১ লাখ ও ৩৫ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ হয়। এ জন্য টেন্ডারও আহ্বান করা হয়। কিন্তু ব্রিজটি আলোর মুখ দেখছে না।
ঠাকুরদাস এলাকার মোজাম্মেল হক ও ধুমের কুঠি এলাকার আমীর আলী জানান, দুই ভরসা, শাহ আলম, মায়া সবাই চায় এককভাবে ব্রিজটি নির্মাণের ক্রেডিট নিতে। ফলে নানা অজুহাতে বন্ধ হয়েছে এই ব্রিজ নির্মাণের কাজ।
সারাই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও বাঁশের ব্রিজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুর মোহাম্মদ ও ধুমের কুঠি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির লিমিটেডের সভাপতি জহির উদ্দিন জানান, হারাগাছের শিল্পপতিদের দিকে তাকিয়ে না থেকে ২০০৪ সালে এলাকাবাসী চাঁদা দিয়ে ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। স্বেচ্ছাশ্রমে বিলে ১৫টি পিলারও বসানো হয়। কিন্তু পরে সে কাজ করতে দেয়া হয়নি। এখনো সেই পিলারগুলো দাঁড়িয়ে আছে। আমরা প্রতি বছর বাঁশের সাঁকো মেরামত করে যাতায়াতের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু এতে অনেক দুর্ভোগ।
তারা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই ব্রিজটি কেন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বিষয়টি আমাদের মাথাতেই ঢোকে না। হারাগাছের বিড়ি শিল্পপতিদের আধিপত্য বিস্তারের বলি হয়েছে এখানে ব্রিজ নির্মাণের কাজ।
ধুমেরকুঠি পূর্বপাড়া এলাকার বাসিন্দা সমাজভিত্তিক ভূমিহীন ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী উন্নয়ন সংস্থা রংপুরের মহাসচিব এবং জাসদের রংপুর জেলা কমিটির পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আজিজুর রহমান জানান, ওই ব্রিজ নির্মাণের দোহাই দিয়ে কাউনিয়া-পীরগাছা আসনে টিপু মুনশী তিনবার এমপি হন। এবার মন্ত্রী হলেন। ওই ব্রিজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হারাগাছ পৌরসভার মেয়র হিসেবে হাকিবুর রহমান মাস্টার এবং সারাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু পরে তারা এই ব্রিজটি নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেননি। বাঁশের সাঁকোই এখনো আমাদের ভরসা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে আমাদের চলাচল। প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে বিড়ি শ্রমিকেরা। তিনি বলেন, স্থানীয় বিড়ি শিল্পপতিরা আছেন এই ব্রিজ নির্মাণের ক্রেডিট নিতে। সে কারণে তারা নির্মাণের ক্রেডিট নিতে আধিপত্য ধরে রাখার কারণেই ব্রিজটি নির্মাণ হচ্ছে না।
সারাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম বলেন, ব্রিজটি না হওয়ার কারণে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। চলতি অর্থ বছরে না হলেও আগামী অর্থবছরে আশা করি টেন্ডার হবে।
এ ব্যাপারে হারাগাছ পৌরসভার চেয়ারম্যান হাকিবুর রহমান মাস্টার বলেন, ব্রিজটি নির্মাণে উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করি জুন মাসের মধ্যে এর একটা সুরাহা হবে।
তবে এ ব্যাপারে কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল আলম বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, আমরা যখনই যে আবেদন পেয়েছি তখনই প্রকল্প তৈরি করে ঢাকায় পাঠিয়েছি। ওই ব্রিজটির ব্যাপারেও আমরা ঢাকায় জানিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত ওই ব্রিজ নির্মাণের ব্যাপারে কোনো আপডেট নেই।


আরো সংবাদ

bedava internet