২০ মে ২০১৯

কৃষিকাজের মর্যাদা ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ

আধুনিক সভ্যতার বিকাশের ফলে বহু দেশে কৃষিকাজ আর আকর্ষণীয় পেশা নয়। চাষিদের সন্তানরাও প্রায়ই পূর্বপুরুষদের পথে যেতে প্রস্তুত নয়। ইন্দোনেশিয়ার এক নারী সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন।

আদর্শ কৃষিখামার
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ভিদা বেকাসি এলাকায় এক আদর্শ কৃষিখামার অবস্থিত। হেলিয়ান্তি হিলমান তার প্রতিষ্ঠাতা। আইনজীবী হিসেবেই তিনি ইন্দোনেশিয়ার চাষিদের অধিকারের জন্য লড়াই করেছিলেন। তিনি তাদের চিরাচরিত জ্ঞানের অত্যন্ত কদর করেন।

আদর্শ এই কৃষিখামারের প্রতিষ্ঠাতা হেলিয়ান্তি হিলমান বলেন, ‘‘রাশিচক্র ব্যাখ্যার ক্ষমতার কারণে তাদের কোনো ফসল নষ্ট হয় না। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেও নয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাশিচক্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস। যতকাল তারা রাশিচক্র ব্যাখ্যার ক্ষমতা রাখবেন, তারা ততকাল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব টের পাবেন না।''

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
এই আদর্শ খামারে ইন্দোনেশিয়ার তরুণ প্রজন্ম কৃষিকাজে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। সেখানে তারা সেই সব উদ্ভিদের চাষ সম্পর্কে জানতে পারেন, যেগুলি কয়েক'শো বছর ধরে ইন্দোনেশীয় রন্ধনপ্রণালীতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

শিক্ষানবিস চাষি হিসেবে সিতা নুরহাদিয়ান্তি মনে করেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতি, বিশেষ করে অতিরিক্ত সারের প্রয়োগ সম্পর্কে আমি সত্যি বেশ চিন্তিত। তাই আমি অরগ্যানিক পদ্ধতির কৃষিকাজ শিখতে চাই। বড় আকারের কৃষিকাজের বদলে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে চাষ করার বড় সুযোগ ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে। ফলে জীবনধারা ও সেইসঙ্গে স্বাস্থ্যের উন্নতি করা সম্ভব।''

মুহামাদ যোগীও শিক্ষানবিস চাষি হিসেবে সেখানে কাজ শিখছেন। তিনি বলেন, ‘‘নিজের ভিটেতে এখানকার মতো চাষের ধারা চালু করা আমার স্বপ্ন। এভাবে ভাইবোনদের খাওয়াপরা নিশ্চিত করে তাদের শিক্ষার ব্যয়ও বহন করতে চাই।''

হাতেনাতে কাজের পাশাপাশি কিছু পুঁথিগত বিদ্যাও পাওয়া যায়। ম্যানেজমেন্ট ও মার্কেটিং সংক্রান্ত জ্ঞানও তার মধ্যে রয়েছে। সবাই যাতে ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সেটাই হলো লক্ষ্য।

ইন্দোনেশিয়ার অনেক মানুষের কাছে কৃষিকাজ আর আকর্ষণীয় নয়। আয়ের মাত্রা ও সামাজিক স্বীকৃতি কম৷ ক্রেতার কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যায় ভরা।

চাষিদের নেটওয়ার্ক
জাকার্তা শহরে হেলান্তি এই প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। সেখানে তিনি তার জাভারা কোম্পানির নিজস্ব দোকান খুলেছেন। সেখানে শুধু আদিবাসী চাষিদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হয়। পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি চাষি তার নেটওয়ার্কে যুক্ত রয়েছেন। শহুরে মানুষ সেমিনারে অংশ নিয়ে চিরাচরিত কফি উৎপাদনের মতো বিষয় সম্পর্কে জানতে পারেন।

হেলিয়ান্তি হিলমান এ বিষয়ে বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ প্রতি বছর আমরা ৫ থেকে ১০ লক্ষ চাষি হারাচ্ছি। তাছাড়া প্রায় ৭০ শতাংশ চাষির বয়স সম্ভবত ৫৫র বেশি। তাই পেশা হিসেবে কৃষিকাজের গর্ব ও মর্যাদা আবার ফিরিয়ে আনার কাজ অত্যন্ত জরুরি। ব্যবসায়িক উদ্যোগ, খামার ও চাষিদের ব্র্যান্ডিং ও বাড়তি গুণাগুণসম্পন্ন পণ্য তৈরি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।''

দোকানের লাগোয়া কাফেতে ঐতিহ্যগত পদ রান্না করা হয় এবং তরুণ রাঁধুনীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সরাসরি কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ ইন্দোনেশিয়ার অনেক খামারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো দালাল না থাকায় চাষিরা বাড়তি আয় করতে পারেন। হেলিয়ান্তি হিলমান-এর ব্যবসার আদর্শে সামাজিক সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়।

আদর্শ কৃষিখামারের প্রতিষ্ঠাতা হেলিয়ান্তি হিলমান মনে করিয়ে দেন, ‘‘প্রথম কোম্পানি হিসেবে আমরাই চাষিদের সামাজিক সুরক্ষা বিমার মাসুল দিতে শুরু করি। বিশেষ করে নারিকেল চাষিদের জন্য সেটি খুব জরুরি। কারণ গাছে ওঠা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। প্রত্যেক চাষি দিনে ৪০ থেকে ৫০ বার গাছে ওঠেন। বৃষ্টি হলে পিছলে যাবার ভয় রয়েছে। তাই আমাদের মনে হয়েছিল, যে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার বিমার সুরক্ষা দেওয়া ন্যায্য কাজ হবে।''

এই সামাজিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এর মধ্যেই ৮৫ জন কাজ করছেন। হেলিয়ান্তি নিজে প্রায়ই ইন্দোনেশিয়ার হাজার হাজার দ্বীপের কোনো একটিতে চলে যান। সেখানে তিনি চাষিদের প্রশিক্ষণ দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

হেলিয়ান্তি বলেন, ‘‘এই মনোভাব শিক্ষা ও গ্রামাঞ্চলে ব্যবসায়িক উদ্যোগের অংশ। তাই আমরা এমনকি স্মার্টফোন ব্যবহার করে খাবারের ছবি তোলার প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকি, যাতে তারা ইনস্টাগ্রাম বা অন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট করতে পারে। অর্থাৎ নিজেদের পণ্য সম্পর্কে বাইরের জগতকে জানানোর ক্ষেত্রেও আমরা সাহায্য করি।''

হেলিয়ান্তি নারকেলের সিরাপ ও ভাতের কেকের মতো ঐতিহ্যগত ইন্দোনেশীয় পণ্য খুব ভালোবাসেন। আরও বেশি মানুষও তার কদর করেন বলে তার বিশ্বাস। ডয়েচে ভেলে।


আরো সংবাদ