১৮ নভেম্বর ২০১৯

রাখাইনে বিদ্রোহী হামলায় ৯ পুলিশ নিহত

মিয়ানমার
নিহত পুলিশ সদস্যদের লাশ কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে - ছবি : এএফপি

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বিদ্রোহীদের হামলায় দেশটির পুলিশের অন্তত ৯ সদস্য নিহত হয়েছে। শনিবার মধ্যরাতে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তেজনা, সহিংসতায় বিধ্বস্ত দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশটি।

শনিবার ভোরের দিকে রাখাইনের রাজধানী সিত্তে থেকে এক ঘণ্টা পথের দূরত্বে অবস্থিত ইয়োতায়োকি গ্রামে পুলিশের ওপর হামলা হয়। বার্তাসংস্থা এএফপি প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ইয়োতায়োকি পুলিশ স্টেশনে ভেতরে মাটিতে লাশ ঢেকে রাখা হয়েছে। পাশে জমাটবাধা রক্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশটির পুলিশের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত, একজন আহত ও আরো একজন নিখোঁজ রয়েছেন। পুলিশের ফাঁস হওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ স্টেশন থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়ার পর ওই হামলা হয়।

মিয়ানমারের ইংরেজি দৈনিক দ্য ইরাবতি বলছে, তারা পুলিশের একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে। এতে দেখা যায়, আরাকান আর্মির প্রায় ১০০ জন ওই পুলিশ স্টেশনের দায়িত্বরত সবাইকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়।

কিন্তু পুলিশ তাদের এই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করলে গোলাগুলি শুরু হয়। পুলিশ স্টেশন থেকে সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায় আরাকান আর্মি।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রক্তাক্ত অভিযানের মুখে সাত লাখ ৪০ হাজারের বেশি সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের তদন্তকারী কর্মকর্তারা রাখাইনে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দেশটির সেনাবাহিনীর শীর্ষ জেনারেলদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

কিন্তু বর্তমানে রাখাইনে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী জাতিগত রাখাইন বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়নে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছিল এই বৌদ্ধরাই।

রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর অধিকতর স্বায়ত্ত্বশাসন ও অধিকারের দাবিতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়েছে বৌদ্ধ বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)।

আরো পড়ুন :
রোহিঙ্গামুক্ত রাখাইন গড়ার মতলব
নয়া দিগন্ত অনলাইন, ১০ জানুয়ারি ২০১৯
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য গরিব মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি। রাখাইনে একসময় এরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। দেশটির সবচেয়ে গরিব ও অবহেলিত এলাকাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। কিন্তু সেখানে কয়েক দশক ধরে চলছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে এই জাতিগোষ্ঠী নিধনের কাজ। ফলে দফায় দফায় মাতৃভূমি ছেড়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। বলা চলে, এখন রাখাইন প্রায় রোহিঙ্গাশূন্য।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধরা গত কয়েক বছরে তাদের হাজার হাজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে ও গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির পরও যে অল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে সেখানে শত নির্যাতনের মধ্যেও বসবাস করে আসছিল, তাদের বিরুদ্ধে এবার ঘোষণা দিয়ে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। যদিও সরকারের একজন মুখপাত্র গত সোমবার বলেছেন, গত সপ্তাহে চারটি পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায় জাতিগত রাখাইন বিদ্রোহীরা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, নির্মম নির্যাতন করে বাদবাকি রোহিঙ্গাকে বাস্তুচ্যুত করতে আরাকান আর্মির হামলাকে ছুতা হিসেবে ব্যবহার করছে মিয়ানমার বাহিনী। তা না হলে বাছ-বিচারহীন সাঁড়াশি অভিযান চালানোর ঘোষণা কেন দিলো দেশটির সেনাবাহিনী, তা বোধগম্য নয়। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক এজেন্সির তথ্য মতে, গত কয়েক সপ্তাহের সহিংসতায় রাখাইনে সাড়ে চার হাজারের মতো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

রাখাইনে সর্বশেষ সহিংসতা হয় গত শুক্রবার সেখানকার স্বাধীনতা দিবসে। ওই দিন ভোরে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে বুথিডং শহরে চারটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় জাতিগত রাখাইন বিদ্রোহীরা। এতে ১৩ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। অপর দিকে আরাকান আর্মি নিজেদের তিন যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলে দাবি করে। আরাকান আর্মির অভিযোগ, পুলিশ স্টেশন ব্যবহার করে সেনাবাহিনী ভারী গোলা ছোড়ে তাদের দিকে।

বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এ রাজ্যে সহিংসতা দীর্ঘ দিনের। সম্প্রতি সেখানে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের সাথে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির বেশ কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। আরাকানের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করছে সংগঠনটি।

রাখাইনে জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করে ২০১৭ সালে। তখন আরাকান আর্মির হামলায় নিহত হয় কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী। এর বদলা নিতে ওই বছরের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নৃশংস নির্যাতন শুরু করে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা। এ নির্যাতন থেকে জীবন বাঁচাতে কমপক্ষে সাত লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। সেনাবাহিনীর এ অভিযানকে জাতিনিধন ও গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছে জাতিসঙ্ঘ ও মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো।

আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ঘোষণা দিয়ে যে অভিযান, এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, এই অসিলায় রাখাইনে ফের যেন অসহায় রোহিঙ্গাদের ওপরে নির্যাতন চালানো না হয়। যদি মিয়ানমার সেনাবাহিনী এমন বর্বর কাজে আবার লিপ্ত হয়, তাহলে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেশটির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে করে নেইপিডোর নির্যাতনের খড়গে বাদবাকি রোহিঙ্গা তাদের ভিটেমাটিছাড়া না হয়।


আরো সংবাদ