১৬ নভেম্বর ২০১৮

রোহিঙ্গাদের জীবনের ভঙ্গুরতা ও অসঙ্গতি তুলে ধরতে চলচ্চিত্র

রোহিঙ্গাদের জীবনের ভঙ্গুরতা ও অসঙ্গতি তুলে ধরতে চলচ্চিত্র - সংগৃহীত

রোহিঙ্গাদের নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র 'ম্যানতা রে' ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরষ্কার পেয়েছে। থাইল্যান্ডের নির্মাতা ফুট্টিফং আরোনপেং এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে থাইল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

থাইল্যান্ডের এক জেলে এবং থাই উপকূলের গ্রামে ভেসে আসা এক রহস্যময় ব্যক্তির মধ্যে বন্ধুত্ব এবং সম্পর্ক নিয়ে এ চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। উপকূলে ভেসে আসা রহস্যময় সে ব্যক্তিকে উদ্ধার করে নিজ বাড়িতে জায়গা দিয়েছিলেন থাইল্যান্ডের সে জেলে। কিন্তু সে জেলে যখন আবার মাছ ধরতে গিয়ে সমুদ্রে হারিয়ে যায়, তখন উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিটি জেলের বাড়ি, পেশা এবং তাঁর স্ত্রীকে নিজের করে নেয়।

চলচ্চিত্রকার ফুট্টিফং শিল্পাকর্ণ ইউনিভার্সিটিতে চারুকলায় পড়াশুনা করেছেন এবং এর আগে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সুনাম কুড়িয়েছেন। তাঁর একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'ফেরিস হুইল' ২০১৫ সালে পুরষ্কার জিতেছিল। এ মূল কাহিনী ছিল মিয়ানমার থেকে থাইল্যান্ডে পালিয়ে এসে বসবাসরত এক মা এবং তার মেয়ের গল্প।

চলচ্চিত্রকার বলেন, 'ম্যানতা রে' চলচ্চিত্রে থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সংগঠিত দুটো ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘটেছে ২০০৯ সালে, যখন থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী দেশটির উপকূল থেকে আশ্রয় প্রত্যাশী রোহিঙ্গা বোঝাই দুটো নৌকা ফিরিয়ে দিয়েছে।

সেসব নৌকায় থাইল্যান্ডের উপকূলের ভিড়তে না দেয়ায় অনেক অনেক রোহিঙ্গা সাগরে আটকা পড়ে। এদের মধ্যে পাঁচজন মারা যায় এবং কয়েকশ শরণার্থী নিখোঁজ হয়ে যাবার খবর পাওয়া যায়।

আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল ২০১৫ সালে। থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী একটি গণকবর খুঁজে পায়। সে গণকবরে বেশ কিছু রোহিঙ্গার মরদেহ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

পরবর্তীতে প্রমাণ মেলে যে সে জায়গাটি একটি নির্যাতন কেন্দ্র ছিল যেখানে মানব পাচারকারীরা মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে মানুষজনকে রাখা হতো।

চলচ্চিত্রটির নির্মাতা বলেন, ‘সে আগন্তুকের প্রতি জেলের যে ক্ষোভ ছিল সেটা আমি বুঝতে পারি। আবার একই সাথে আমি এটাও বুঝি যে আগন্তুক সে ব্যক্তি তার বন্ধুর জীবন এবং সম্পদ দখল করতে চায় নি। কিন্তু এ বিষয়টি কিভাবে ঘটেছে সেটি আমি বুঝতে পারি না।’

চলচ্চিত্র নির্মাতা বলেন, কোন ব্যক্তিকে নিন্দা করা কিংবা তার বিচার করা এ চলচ্চিত্রে উদ্দেশ্য নয়। তিনি এর মাধ্যমে শুধু মানুষের জীবনের ভঙ্গুরতা এবং অসঙ্গতি তুলে ধরতে চেয়েছেন।

২০১৫ সালে গণকবর আবিষ্কৃত হাবার পর থাইল্যান্ডের একটি আদালত মানব পাচারের সে ঘটনায় বিচারের রায় প্রদান করে।এ মামলায় অভিযুক্তদের কাছে রায় পড়ে শোনানোর জন্য আদালতের ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। আদালতের রায়ে থাইল্যান্ড সেনাবাহিনীর সাবেক এক ল্যাফটেন্যান্ট জেনারেলকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

গত এক বছরে অন্তত ৭ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে গেছে। গতমাসে জাতিসঙ্ঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনে সে ঘটনার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শীর্ষ পাঁচ কর্মকর্তাকে গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মিয়ানমার সরকার জাতিসংঘের সে তদন্ত রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। মিয়ানমারের তরফ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে যে রাখাইন অঞ্চলে জঙ্গি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছে।

 

রোহিঙ্গা শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা

হুমায়ুন কবির জুশান উখিয়া (কক্সবাজার), ১৬ জুলাই ২০১৮

রোহিঙ্গা শিশু কলিম উল্লাহর বয়স ১০ পেরোয়নি। সে চোখের সামনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গুলি খেয়ে মরতে দেখেছে বাবাকে। নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছে মাকে। ৯ মাস আগে রাখাইন রাজ্যে সামরিক জান্তা ও মগদের আক্রমণের শিকার হয়ে মায়ের সাথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সে। এরপর আশ্রয় নেয় কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সব হারানোর দগদগে স্মৃতি নিয়ে বাংলাদেশে এসে আপাতত স্বস্তির দেখা মিলেছিল। তবু ভয় আর অজানা শঙ্কায় নির্যাতনের স্মৃতি নিয়ে মায়ের সাথে ছায়ার মতো সময় কাটিয়েছে আশ্রয় ক্যাম্পে। 

তবে বাংলাদেশে আসার পর থেকে লেখাপড়া, খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে শুরু করেছে কলিম উল্লাহ ও তার মতো অন্য সব রোহিঙ্গা শিশু। উখিয়ার কুতুপালং আইওএম শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষিকা শাহিনা আক্তার ও মোহছেনা বেগম বলেন, প্রতিদিন এ সব রোহিঙ্গা শিশুকে ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি বার্মিজ ভাষাও শেখানো হচ্ছে। কারণ মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে তারা যেন নিজেদের ভাষাতেও কথা বলতে পারে। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠেছে।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার সমাজসেবার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো: এমরান খাঁন বলেন, উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩৬ হাজার ৩৭৩ জন এতিম শিশু শনাক্ত করা হয়েছে। এ সব শিশুর লেখাপড়ার জন্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম, ব্র্যাক, মুক্তিসহ বিভিন্ন এনজিওর উদ্যোগে তিন শতাধিক স্কুল রয়েছে। এ সব শিশুকেন্দ্রে বার্মিজ ভাষাসহ বিভিন্ন ভাষা শেখানো হচ্ছে।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ সরকার, ইউএন অর্গানাইজেশন এবং দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গা শিশুদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এ সব শিশুর উত্তম সুরক্ষার জন্য তাদের নিজ দেশে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে লালনপালনের ব্যবস্থা করার কোনো বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কক্সবাজার অফিসের প্রধান সংযুক্তা সাহানি বলেন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের প্রতিটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য আইওএমের পক্ষ থেকে স্কুল ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। 

এ ব্যাপারে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নিকারুজ্জামান বলেন, উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিন শতাধিক স্কুল ও বিনোদনকেন্দ্র রয়েছে। এ সব স্কুল ও বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনা করছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসহ বিভিন্ন এনজিও। মিয়ানমারের শিক্ষকদের পাশাপাশি এতে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছেন স্থানীয় শিক্ষিত তরুণরা।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) রিপোর্টে জানা যায়, গত বছর ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক বাহিনীর আগ্রাসনের পর থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই শিশু। এ সব শিশুর লেখাপড়ার জন্য আইওএম, ব্র্যাক, মুক্তিসহ বিভিন্ন এনজিওর উদ্যোগে তিন শতাধিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিশুদের বিনোদনের জন্য ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ১২০টি বিনোদনকেন্দ্র। এ সব কেন্দ্রে ক্রীড়া ও নাটকসহ নানা ধরনের বিনোদন দিয়ে আনন্দে রাখা হচ্ছে এ শিশুদের।


আরো সংবাদ