২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মিয়ানমারের লজ্জা!

মিয়ানমারের লজ্জা! - সংগৃহীত

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান জায়েদ রাদ আল হোসেন তার দায়িত্ব ছাড়ার আগে মিয়ানমারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার শেষ প্রতিক্রিয়ায় চার বছরের দায়িত্ব পালনকালে তার দেখা নিপীড়নের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত মানাবাধিকার অপরাধকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টসম্পন্ন আখ্যা দিয়েছেন তিনি। রাখাইনে সংঘটিত নিপীড়ন হত্যাযজ্ঞসহ যাবতীয় ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধে সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে বলেছেন তাদের লজ্জা হওয়া উচিত।  

মিয়ানমার সেনাবাহিনী গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে থাকে মৌসুমী বাতাসে।

মানবাধিকার সংগঠনের স্যাটেলাইট ইমেজ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে শূন্যে ছুড়তে থাকে সেনারা। কখনো কখনো কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা। সে কারণেই সম্ভবত; অনেক কষ্ট সত্ত্বেও মিয়ানমারের চেয়ে এ শিবিরকেই নিরাপদ জায়গা মনে করেন রোহিঙ্গারা।

মিয়ানমার সরকারের দাবি আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার কারণেই রোহিঙ্গা সংকটের উদ্ভব। সম্প্রতি তারা আরসার বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। রাদ আল হুসেইন হাই কমিশনার হিসেবে মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া তার শেষ বক্তব্যে মিয়ানমারের শীর্ষ এক কর্মকর্তার দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

ওই কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, মিয়ানমার সরকার কেবল একটি একক জনগোষ্ঠীর নয়, সবার অধিকারের সুরক্ষা দিচ্ছে। এদিকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে রাখাইনে জাতিসঙ্ঘের স্বাধীন তদন্ত দাবি করা হলেও মিয়ানমার এতে রাজি হয়নি।

মিয়ানমারের সেই কথিত স্বাধীন তদন্তের প্রশ্নে বলতে গিয়ে রাদ আল হুসেইন মন্তব্য করেন, ‘চার বছর হাই কমিশনারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু উদ্ভট দাবি আমি শুনেছি। তবে ইতোমধ্যে মিয়ানমারের যে দাবির কথা বললাম, ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে তা একেবারে নতুন ধারার। কিছু লজ্জাতো থাকা উচিত স্যার, কিছুটা হলেও। আমরা বোকা নই।

মানবাধিকার পরিষদের ৩৮তম অধিবেশনের পর আর কোনো বৈঠক হচ্ছে না। দায়িত্ব ছাড়ার আগে এটাই জায়েদ হোসেনের শেষ বক্তব্য। তিনি বলেন, জাতিসংঘের যদি কোনো সদস্য রাষ্ট্র যদি তিনদিনের সহিংসতায় ৭ লাখ মানুষকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং তাতে কোনো আন্তর্জাতিক চাপ না আসে, তবে এই রুমে থাকা বাকিরাও এমনটা করতে পারে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে একটি উদাহরণ টেনে হাই কমিশনার বলেন, জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝে ৫৮ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত গেছে এবং তাদের বিভিন্ন অভিযোগে আটক করা হয়েছে। এরপর রাষ্ট্রপতি তাদের ক্ষমা করলেও বুথিয়াডং কারাগারে পাঠানো হয় তাদের। তবে একে বলা হয় ‘রিসিপশন সেন্টার’।

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের বাংলাদেশ সফর শেষ হওয়ার একদিনের মাথায় কমিশন থেকে এসব মন্তব্য আসলো। চূড়ান্ত অর্থে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে ভূমিকা রাখতেই জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব গুতেরেস শনিবার (৩০ জুন) দিবাগত রাতে ঢাকায় আসেন। সোমবার (২ জুলাই) তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যান। সেখানে থাকা অবস্থায় দুপুর ১২টার দিকে তার অফিসিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেওয়া হয়।

টুইটারে গুতেরেস লেখেন: ‘বাংলাদেশের কক্সবাজারে এসে আমি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে হত্যা ও ধর্ষণের যে বর্ণনা শুনলাম, তা অকল্পনীয়। তারা ন্যায় বিচার ও নিরাপদে দেশে ফিরতে চায়।’

গোপন নথি ফাঁস হওয়ায় ফেঁসে গেছে মিয়ানমার
ইরাবতি ও রয়টার্স 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘের দুই সংস্থার সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির গোপন খসড়াটি কে বা কারা ফেসবুকে ফাঁস করেছে তা জানার চেষ্টা করছে মিয়ানমার সরকার। এ নথি কি জাতিসঙ্ঘ সংশ্লিষ্ট কেউ ফাঁস করেছে কিংবা কূটনীতিকদের কেউ এ কাজ করেছেন নাকি সাংবাদিকরা তা ফাঁস করেছেন; তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র উ জ হতেকে উদ্ধৃত করে দেশটির সংবাদমাধ্যমে এই সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের বাঙালি মুসলিম আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে।

তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার একপর্যায়ে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে সেই চুক্তির আওতায় এখনো একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। এরমধ্যেই গত ৬ জুন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে জাতিসঙ্ঘ। তবে সেখানেও নাগরিকত্ব প্রশ্নটি উপেক্ষিত।

জাতিসঙ্ঘ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে বিস্তারিত প্রকাশ না করা হলেও গত ২৯ জুন তা অনলাইনে ফাঁস হয়। ‘ইয়াঙ্গুন ইনফরমার’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ৮ জুন স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতা চুক্তির কয়েকটি নথি ফাঁস করা হয়। দাবি করা হয়, এগুলোতে চুক্তির বিস্তারিত আছে।

ওই নথি পর্যালোচনা করে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, খসড়া চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের জাতিগত স্বীকৃতি মেলেনি। উপেক্ষিত হয়েছে তাদের নাগরিকত্বের দাবি।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র উ জ হতে’র কাছে ফাঁস হওয়া নথির সত্যতা নিয়ে জানতে চেয়েছিল দেশটির সংবাদমাধ্যম ইরাবতি। তবে ওই নথিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানান জ হতে। তিনি শুধু বলেন, কে বা কারা নথিগুলো ফাঁস করেছে তা জানতে তদন্ত করা হচ্ছে। তারা জানতে পেরেছেন, অনেক সাংবাদিক ওই পেজটি অনুসরণ করেন।  

জ হতে বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা করে দেখব যে ফেসবুক পেজটি জাতিসঙ্ঘ সংশ্লিষ্ট কেউ কিংবা কূটনীতিক অথবা সাংবাদিকদের কেউ তৈরি করেছেন কিনা। যদি তাদের কেউ এটা করে থাকেন, তবে সেটা হবে নীতিগত লঙ্ঘন। এর দায় তাদেরকে নিতে হবে। এটি একটি গোপন নথি।’

তিনি আরো জানান, এ নথি ফাঁসের ঘটনায় সরকারযথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ করবে এবং যদি জাতিসঙ্ঘের কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে জাতিসঙ্ঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করবে।

জ হতে স্বীকার করেছেন, এটাই প্রথম নথি ফাঁসের ঘটনা নয়। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির একটি ফাঁসকৃত কপিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়েছিল। এ ধরনের প্রবণতাকে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও জাতিসঙ্ঘের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকটির(এমওইউ) ফাঁস হওয়া অনুলিপি পর্যালোচনার পর রয়টার্স জানিয়েছে, সই হওয়া গোপন চুক্তিতে দেশটিতে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কিংবা সারা দেশে স্বাধীনভাবে চলাচলের কোনো প্রকাশ্য নিশ্চয়তা নেই।

শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সমঝোতা স্মারককে উদ্ধৃত করে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,এতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। নাগরিকত্বের প্রশ্নের মীমাংসা কী হবে তাও স্পষ্ট নয়। প্রত্যাবর্তনকারী সবাইকে যথাযথ পরিচয়পত্রের কাগজ ও তারা যাতে স্বেচ্ছায় মুক্তভাবে ফিরতে পারেন, মিয়ানমার সরকারকে তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

চুক্তির খসড়া অনুযায়ী রাখাইনে অন্যান্য অধিবাসীদের মতোই প্রচলিত আইন মেনে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার ভোগ করবেন ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা। তবে রাখাইন রাজ্যের সীমানার বাইরেও তারা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে কিনা, সেই নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি।

এমনকি বর্তমানে যে আইন ও নীতিমালা দিয়ে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাফেরার অধিকার রোধ করা হয়েছে, তা সংশোধনের প্রতিশ্রুতিও সেখানে নেই। রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানেও নিশ্চিত করা হয়েছে, ৮২ সালে প্রণীত যে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের কার্যত রাষ্ট্রহীন করে রাখা হয়েছে, তা পর্যালোচনার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। 

দেখুন:

আরো সংবাদ