২৬ এপ্রিল ২০১৯

আসামের বন্দিশিবিরগুলোর ভয়াবহ চিত্র, আতঙ্কে ৯০ লাখ মুসলমান

মুসলমানদের তুলনায় অনেক কম হলেও বাঙালী হিন্দুদের একটা অংশের মধ্যেও রয়েছে আতঙ্ক -

আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করার কাজ শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে চলা এই প্রক্রিয়া আসামে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হবে।

আর জাতীয় নাগরিক পঞ্জী বা এনআরসি-র কারণেই আসামে বসবাসকারী বাংলাভাষী প্রায় ৯০ লাখ মুসলমান ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

সংখ্যাটা মুসলমানদের তুলনায় অনেক কম হলেও বাঙালী হিন্দুদের একটা অংশের মধ্যেও রয়েছে আতঙ্ক।

এনআরসি-র রাজ্য কোঅর্ডিনেটর প্রতীক হাজেলাকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে লেখা হয়েছিল যে, প্রায় ৪৮ লাখ মানুষ, যারা আসামে বসবাস করছেন, তারা নিজেদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

তবে মি. হাজেলা এই উদ্ধৃতিটি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন এবং যে সাংবাদিক ওই তথ্য মি. হাজেলার উদ্ধৃতি বলে লিখেছিলেন, তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার কথা বলেছেন।

তিনি বলেছেন যে, অবৈধভাবে আসামে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাটা ৫০ হাজারের কাছাকাছি হবে।

এখন প্রশ্নটা হল, যেসব মানুষকে ‘বিদেশী’ বলে চিহ্নিত করা হবে, তাদের ভবিষ্যৎ কী!

ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে যেহেতু বিদেশী বা বাংলাদেশী বলে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর কোনো চুক্তি নেই, তাহলে যে সব মানুষ কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতকেই নিজেদের দেশ বলে মনে করে এসেছেন, তাদের নিয়ে কী করা হবে।

সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে কোনো ঘোষণা নেই।

আসামের অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা ডিসেম্বর মাসে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে কেন নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করা হচ্ছে।

‘আসামে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করাই এর উদ্দেশ্য। এদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাংলাভাষী হিন্দুরা অসমীয়া মানুষদের সঙ্গেই থাকতে পারবেন,’ জানিয়েছিলেন মি. বিশ্বশর্মা।

এটাই বিজেপির নীতির সঙ্গে খাপ খায়।

কেন্দ্রীয় সরকারও প্রত্যেক হিন্দুকে ভারতীয় হওয়ার একটা অধিকার দেয়ার জন্য বিল পেশ করেছিল।

তবে আসামের বেশিরভাগ নাগরিক এর বিরোধিতা করছেন।

যাদের বিদেশী বলে চিহ্নিত করা হবে, তাদের অবস্থাটা কী হতে পারে, তার একটা আন্দাজ আমরা পেতে পারি সেই সব মানুষের পরিস্থিতির দিকে তাকালেই, যাদের আসামের বিদেশী ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যেই বিদেশী বলে চিহ্নিত করেছে।

বিদেশী বলে চিহ্নিত এইসব মানুষদের রাজ্যের বিভিন্ন জেলের মধ্যেই গড়ে তোলা বন্দীশিবিরে রাখা হয়েছে। বেশ কিছু মানুষ তো এমনও রয়েছেন, যারা গত এক দশক ধরে এভাবে বন্দীশিবিরে রয়েছেন। ছাড়া পাওয়ার কোনো আশা সম্ভবত তারা আর দেখেন না।

এইসব বন্দীশিবিরগুলোতে মানবাধিকার সংগঠন বা মানবাধিকার কর্মীদের যাওয়া নিষেধ। তাই এইসব শিবিরের মানুষদের অবস্থা কখনই সাধারণ মানুষের সামনে আসেনি।

গতবছর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যখন আমাকে সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষকের পদে নিয়োগ করতে চায়, তখন সেটা গ্রহণ করেছিলাম আমি।

এরপরে আমার প্রথম কাজই হয়েছিল আসামের এইসব বন্দীশিবিরগুলো ঘুরে দেখার আবেদন জানিয়েছিলাম।

এবছরের ২২ থেকে ২৪ জানুয়ারি আমি আসামে গিয়েছিলাম। গোয়ালপাড়া আর কোকড়াঝাড়ের জেলের মধ্যেই যে বন্দীশিবির রয়েছে, সেগুলো ঘুরে দেখি। ওখানে বন্দীদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলি।

মানবিক আর আইনগত - দুই দিক থেকেই এই বন্দীশিবিরগুলোর এক ভয়াবহ চিত্র দেখতে পেয়েছিলাম আমি।

বারে বারে মনে করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও মানবাধিকার কমিশন, বা কেন্দ্র অথবা রাজ্য সরকারগুলো আমাকে এই তথ্যটাও জানায়নি যে বন্দী শিবিরগুলো নিয়ে আমি যে রিপোর্ট দিয়েছিলাম, তার পরিণতি কী হল!

আর এর পরে যখন এনআরসি-র প্রক্রিয়া শেষ হলে যখন লাখো মানুষকে বিদেশী বলে চিহ্নিত করা হবে, তখন পরিস্থিতিটা কী হবে, সেটা আন্দাজ করতে পারছি ভালো মতোই।

এই অবস্থায় আমার সামনে একটাই রাস্তা খোলা ছিল যে সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষকের পদ থেকে আমি সরে দাঁড়াই আর বন্দীশিবির নিয়ে আমি যে রিপোর্ট জমা দিয়েছিলাম, সেটা সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিই।

এই সব বন্দীশিবিরগুলোতে আটক রয়েছেন যেসব অবৈধ বিদেশী বলে চিহ্নিত মানুষরা, তাদের বেশিরভাগকেই ন্যূনতম আইনি সহায়তা দেয়া হয় না। অনেকের ক্ষেত্রেই বিদেশী ট্রাইব্যুনালে এসব মানুষ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। বেশিরভাগ মানুষকেই নজরবন্দী করে রাখা হয়েছে এই কারণে যে, তারা ট্রাইব্যুনাল বার বার নোটিশ পাঠিয়ে হাজিরা দিতে বললেও তারা সাড়া দেননি, ট্রাইব্যুনালে হাজির হননি।

তবে আমাকে বন্দীশিবিরের বেশিরভাগ মানুষই জানিয়েছেন যে, ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দেয়ার জন্য কোনো নোটিশই তারা পাননি।

একটা মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার কারণে আমরা ধর্ষণ বা খুনের মতো কঠিন অপরাধে অভিযুক্তদেরও আইনি সহায়তা দিয়ে থাকি, স্বপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু অবৈধ বিদেশী নাগরিক চিহ্নিতকরণের মামলায় অপরাধ না করা সত্ত্বেও বহু মানুষ বন্দীশিবিরে কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন মামলা লড়ার জন্য সাহায্য পাচ্ছেন না বলে!

সাধারণ জেলের মধ্যেই একটা অংশে এসব বন্দীশিবির তৈরি হয়েছে। অনেক কয়েদীকে তো বছরের পর বছর বন্দী থাকতে হচ্ছে। এদের না দেয়া হয় কোনও কাজকর্ম, না বিনোদনের সামান্যতম সুযোগ। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করারও কোনো সুযোগ নেই এদের। কদাচিৎ কখনো হয়তো কারো কোনো আত্মীয় জেলে দেখা করতে আসেন।

এদের তো বন্দীশিবির থেকে ছাড়া পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমার চোখে পড়ছে না।

অন্যান্য জেলের কয়েদীদের অন্তত হাঁটাহাঁটি করার, বা খোলা আকাশের নিচে সময় কাটানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু বিদেশী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে যাদের, তাদের সেই সুযোগও নেই। দিনের বেলাতেও তাদের ব্যারাকের মধ্যেই কাটাতে হয়। কারণ অন্য কয়েদী, অর্থাৎ ভারতীয় নাগরিকদের সঙ্গে মেলামেশা করার অধিকার দেয়া হয় না তাদের।

জেলগুলোতে যখন পরিদর্শনে গেছি, তখন দেখেছি যে পুরুষ, নারী আর ছয় বছরের বেশি বয়সী শিশুদের পরিবারের থেকে আলাদা করে রাখা হয়। অনেকেই আছেন, যারা নিজের জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে অনেক বছর দেখা করতে পারেননি।

নিজের স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার আইনি অনুমতি না থাকলেও জেলের অফিসাররা মাঝে মাঝে দয়া করে নিজেদের মোবাইল ফোন থেকে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। আত্মীয়-স্বজনের অসুখবিসুখ বা মৃত্যু হলেও প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার অনুমতি পান না এরা। যুক্তিটা হল, প্যারোলে কিছুদিনের জন্য মুক্তি পাওয়ার অধিকার একমাত্র সাজাপ্রাপ্ত ভারতীয় বন্দীদেরই রয়েছে।

মানবাধিকার কমিশনের কাছে আমার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শটা ছিল যে, সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বন্দীশিবিরের বাসিন্দাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সাধারণ কয়েদীদের সঙ্গে এদের জেলের ভেতরে কোনো সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে বন্দী করে রাখা বা আইনি সহায়তা না দিয়ে আটক রাখা, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করতে না দেয়া আর সর্বোপরি সম্মানের সঙ্গে জীবনধারণের অধিকার সম্পূর্ণভাবে বেআইনি।

আন্তর্জাতিক নিয়মে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, বিদেশীদের জেলে বন্দী করে রাখা যায় না। তাদের সঙ্গে অপরাধীদের মতো ব্যবহার করা যায় না। মানবিক আর আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কোনোভাবেই তাদের পরিবারের থেকে আলাদা করে রাখা যায় না।

এই নিয়মের অর্থ হল, কোনো দেশে অবৈধভাবে যদি কেউ বসবাস করেন, তাদের খোলামেলা শিবিরে নজরবন্দী করে রাখা যেতে পারে। জেলে কখনই আটক করে রাখা যায় না। আর এইসব মানুষকে অনির্দিষ্টকালের জন্য জেলে বন্দী করে রাখা ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নিয়মাবলীর সরাসরি লঙ্ঘন।

আমাদের সংবিধান জীবনের যে অধিকার দিয়েছে, তা শুধুমাত্র ভারতীয় নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য নয়। যেসব মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাদেরও এই অধিকার পাওয়ার কথা।

বিদেশী বলে চিহ্নিত মানুষদের বিষয়ে সাংবিধানিক নিয়মনীতি আর আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ীই চলতে হবে ভারতকে।

আমাদের উচিত তাদের দিকে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।

অথচ এইসব বন্দীশিবিরগুলিতে বসবাসরত নারী, পুরুষ বা শিশুদের অবস্থা সাধারণ কয়েদীদের থেকেও করুণ। অনির্দিষ্টকাল ধরে এদের বন্দী করে রাখা হচ্ছে শুধুমাত্র এই কারণে যে তারা নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ যোগাড় করতে পারেননি। অথবা তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার সুযোগই দেয়া হয়নি।

এটা যে ভারত সরকারের ভাবমূর্তির ওপরে একটা ধাক্কা, তা নয়। ভারতের নাগরিকদের জন্যও এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক পরিস্থিতি।

(বিবিসি হিন্দী সার্ভিসে এটি লিখেছেন : হর্ষ মন্দার, মানবাধিকার কর্মী)


আরো সংবাদ

বিজিএমইএর ব্যাখ্যাই টিআইবি প্রতিবেদনের যথার্থতা প্রমাণ করে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার প্রস্তাব সংসদে নাকচ ঢাকায় সবজি আনতে কিছু পয়েন্টে চাঁদাবাজি হয় : সংসদে কৃষিমন্ত্রী বসার জায়গা না পেয়ে ফিরে গেলেন আ’লীগের দুই নেতা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডিফেন্স কোর্সে অংশগ্রহণকারীরা আজ জুমার খুতবায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বয়ান করতে খতিবদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান কাল এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনে বাধা নেই জিপিএ ৫ পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী সুপ্রভাত বাসের চালক মালিকসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট পান্না গ্রুপ এশীয় দেশের ঘুড়ি প্রদর্শনী শুরু পল্লবীতে বাসচাপায় পথচারীর মৃত্যুর ৬ মাস পর চালক গ্রেফতার

সকল




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al
hd film izle
gebze evden eve nakliyat