২৪ অক্টোবর ২০১৮

 ট্রাম্প-কিমের চুক্তিতে যা আছে

কিম জং উন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প - ছবি : সংগ্রহ

সিঙ্গাপুরে সেন্তোসা দ্বীপের ক্যাপেল্লা হোটেলে ট্রাম্প ও কিমের একান্ত বৈঠক ও পরে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পরই উভয় দেশের নেতারা একটি যৌথ চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। বিবিসি, রয়টার্স

দুই নেতা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার পর ট্রাম্প তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আজকে যা ঘটেছে তার জন্য আমরা খুবই গর্বিত। আমরা উভয়ই কিছু করতে চাই এবং করতে যাচ্ছি।’

ট্রাম্প-কিমের যৌথ ঘোষণার চারটি মূল পয়েন্ট চিহ্নিত করেছেন বিবিসি-

১. দুই দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়া নিজেদের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ার অঙ্গীকার করেছে।

২. কোরীয় উপদ্বীপে টেকসই এবং স্থিতিশীল শান্তি রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়া একসঙ্গে কাজ করবে।

৩. চলতি বছরের ২৭ এপ্রিলের পানমুনজোম ঘোষণা পুনর্নিশ্চিত করে কোরীয় উপদ্বীপকে পুরোপুরি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করতে উত্তর কোরিয়ার প্রতিশ্রুতি।

৪. যুদ্ধবন্দীদের উদ্ধারের অঙ্গীকার করেছে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যেই যা সনাক্ত করা হয়েছে তা অবিলম্বে পুনর্বাসনের অন্তর্ভুক্ত করাসহ উভয় দেশই পিওএম বা এমআইএ পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছে।

ট্রাম্প-কিমের  মধ্যকার মুখোমুখি বৈঠকটি ৪০ মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয়। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প ও কিমের ব্যক্তিগত বৈঠক মোট ৩৮ মিনিট স্থায়ী হয়েছে।

বৈঠকের পর স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় কিম সিঙ্গাপুর ত্যাগ করবেন বলে জানা গেছে । অন্যদিকে ট্রাম্প ও আজই নিজ দেশের উদ্দেশে রওয়ানা হবেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ।

আরো পড়ুন : ট্রাম্প-কিম: কার কী দাবি-দাওয়া

সিঙ্গাপুরে চলছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের মধ্যে শীর্ষ বৈঠক। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই বৈঠকে বসছেন দুই নেতা। দীর্ঘদিনের শত্রু দুটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠকের দিকে এখন দৃষ্টি বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষের। অনেকেই বলছেন, এই বৈঠকটিই হয়তো বিশ্বপরিস্থিতি পাল্টাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে।

গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তর কোরিয়ার যে, প্রকাশ্য বৈরিতা চলছে-তা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে গত কয়েক মাস। উত্তর কোরিয়া তাদের একের পর এক অস্ত্র পরীক্ষা অব্যাহত রাখে। যে কোন সময় কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধ লাগতে পারে- এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কিমের আগ্রাসী আচরণে ভীত হয়ে পড়ে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। আর যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহত রাখে দেশটিকে একঘরে করে রাখার প্রচেষ্টা। 

কিম জং উন তো তার সমরাস্ত্র পরীক্ষার কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘রকেট ম্যান’ হিসেবেই খ্যাতি পেয়ে যান। অবস্থান এমন পর্যায়ে পৌছে যে, দুই রাষ্ট্র নেতা ট্রাম্প ও কিম পরস্পরকে ব্যক্তিগতভাবেও হুমকি দিতে থাকেন। কিম জং উন ট্রাম্পকে ‘বুড়ো’ আর ট্রাম্প কিমকে  বলেন ‘বেটে ও খাটে’। কিম জং উন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি একবার এমনও বলেছেন, আগামী সপ্তাহে হামলার তারিখ ঘোষণা করবেন। আবার ট্রাম্প স্পষ্টই বলেছেন, পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হবে উত্তর কোরিয়াকে। কিম হুমকি দিয়ে বলেছেন উত্তর  কোরিয়ার পারমণবিক অস্ত্রের বাটন তার টেবিলেই থাকে। এর জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটনের পারমাণবিক বাটন উত্তর কোরিয়ার চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

এতসব হুমকির মধ্যেও এ বছরের শুরুর দিকে কিমের একটি বক্তৃতায় পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। কিম বলেন, তিনি সব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনায় বসতে আগ্রহী। কিমের এই ইচ্ছাকে ট্রাম্প স্বাগত জানালে ইতিবাচক মোড় নেয় পরিস্থিতি। এরপর পর্দার আড়ালে চলে দুই দেশের কর্মকর্তাদের কূটনেতিক প্রক্রিয়া। অবশ্য এই প্রক্রিয়ার সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলো দক্ষিণ কোরিয়া। অবশেষে মঙ্গলবার সফল হয় এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপে বৈঠকে বসেন দুই নেতা।
কার কী দাবি

দুই নেতার বৈঠকের দাবি দাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে অনেক দিন ধরেই চলছে আলোচনা। অবশ্য আলোচনা না বলে দরকষাকষি বলাই ভালো। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও সেই সাথে অন্যান্য বিধিবর্হিভূত ক্ষেপণাস্ত্রের অপসারণ। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার প্রত্যাশা তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে কোন পূর্বশর্ত ছাড়াই অস্ত্র কর্মসূচী বর্জন করে আলোচনায় আসবে উত্তর কোরিয়া। কিন্তু কিম জং উন তাতে রাজি হনি। মূলত তার দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে। তাই রাজি হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, কিম জং উন চাইছেন তার দেশের নিরাপত্তার গ্যারান্টি। অস্ত্র পরিত্যাগ করার পর উত্তর কোরিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র কোন আগ্রাসী পদক্ষেপ নেবে না সেই মর্মে নিশ্চয়তা।
এক্ষেত্রে লিবিয়ার উদারহরণ তো তার সামনেই ছিলো। ২০০৪ সালে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচী বর্জন করার সাত বছরের মাথায় পশ্চিমা জোটের হামলায় প্রাণ দিয়েছেন লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি।

অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও জড়িত আছে এর সাথে। উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিক দূরাবস্তা থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক চালু করার দেশটির অন্যতম লক্ষ্য। আবার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাদের এশীয় মিত্রদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যাতে উত্তরের কোন আগাসনের শিকার না হয় সেটিও নিশ্চিত হতে চাইছে ওয়াশিংটন।


আরো সংবাদ