২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মুখোমুখি লড়াইয়ে কে জিতবেন : কিম না ট্রাম্প?

মুখোমুখি লড়াইয়ে কে জিতবেন : কিম না ট্রাম্প? - ছবি : সংগৃহীত

১৭৮৯ সালে বিপ্লবের এক বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন লিখেছিলেন, মৃত্যু ও কর ছাড়া আর কিছুই নির্ধারিত নয়। আগামীকাল মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সাথে ঐতিহাসিক বৈঠকের মাধ্যমে তার এই বাণীটিই হয়তো আবারো আপডেট করবেন আরেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকানরা যেমন আশা করছে তেমন আর কে আশা করছে যে, এ সাক্ষাতের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র ধ্বংসের ব্যাপারে একটি কার্যকর চুক্তি সই হবে? বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া এ বৈঠকের মাধ্যমে তার পুরনো অবস্থা থেকে বের হয়ে আসবে কি না, এটাই এখন সবচেয়ে বড় অথচ উত্তরবিহীন প্রশ্ন।

তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় নিশ্চিত, যখন ট্রাম্প কিমকে স্বাগত জানাবেন, নিশ্চিতভাবেই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার মুহূর্তের মতো একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের কৃতিত্ব দাবি করবেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি মনে করছেন, সিঙ্গাপুরের সান্তোসা দ্বীপে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ বৈঠকটি ডোনাল্ড ট্রাম্প শো হতে যাচ্ছে। এমনকি তিনি যা কামনা করছেন, তাতে যদি ব্যর্থও হন তাহলে তিনি অপর পক্ষকে হুমকি দেবেন। সাবেক এই টিভি উপস্থাপক চাইবেন, যেভাবেই হোক, সবার মনোযোগ যেন তার দিকেই থাকে। 

ট্রাম্পের অস্বাভাবিক ইগো এক্ষেত্রে একমাত্র সমস্যা নয় বরং উত্তর কোরিয়ার বিচ্ছিন্ন, উচ্ছৃঙ্খল এক নেতার সাথে বিশ্ব মঞ্চ এভাবে শেয়ার করে নেয়ার মাধ্যমে তিনি একটি বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছেন। জি-৭ এর সদস্যদের সাথে বাণিজ্য, ইরান ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে মতপার্থক্যের পর হোয়াইট হাউজ সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে বৈদেশিক নীতি নিয়ে এ জুয়া খেলছেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সমস্যার মোকাবেলায় যে কোনোভাবে হোক এক্ষেত্রে একটি সাফল্য ট্রাম্পের খুবই দরকার। উত্তর কোরিয়ার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে কাজে লেগে যেতেও পারে। 

২০১১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পরমাণু অস্ত্রের উন্নয়নে ব্যাপক জোর দেন কিম জং উন। গত বছর তিনি দাবি করেন, তার সর্বাধুনিক মিসাইলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম। এরপরই উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ২০১৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা মুন জায়ে ইনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন কিম। তিনি তার পূর্বসূরি পার্ক গিউন হাইয়ের অবস্থান থেকে সরে আসেন। ট্রাম্পের ‘পুরো উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার হুমকির মতো পার্কও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছিলেন উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে। 

গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকটি ছিল এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বা টার্নিং পয়েন্ট। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন এ সময় উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে এ টুর্নামেন্টে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাতে অনুরোধ করেন। তার এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি প্রতিনিধিদল পাঠান। তাদের সাথে পাঠান তার বোন কিম ইয়ো জংকে। ইয়ো জংয়ের কূটনীতি এ ক্ষেত্রে ভালো কাজ দেয় এবং তিনি সেখানকার মানুষের অন্তর জয় করে নেন। দুই কোরিয়ার যুদ্ধ থেকে চলে আসা দুই কোরিয়ার মধ্যকার শীতল সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে এ টুর্নামেন্টের মাধ্যমে।

ওই সময়ে থেকে এ পর্যন্ত কিম দুইবার মুনের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। উভয়বারই বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। এ ছাড়া তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকেও আমন্ত্রণ জানান। এ সময় তিনি কিছু পরমাণু পরীক্ষার স্থানের কাঠামো ধ্বংস করেন এবং মার্কিন নাগরিকরদের মুক্তি দেন। সেই সাথে তিনজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। এখন ট্রাম্পের পালা, তিনি হাজার মাইল দূর থেকে গিয়ে কিমের সাথে করমর্দন করবেন এবং বড়াই করবেন শতাব্দীর সেরা চুক্তি নিয়ে; কিন্তু সংবাদমাধ্যমগুলো পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যাচ্ছে, ইতোমধ্যে কিমের জয় এসে গেছে। 
ট্রাম্প-কিমের এই অস্থির সমঝোতার মধ্যেও একটি ঠাণ্ডা মাথার হিসেব রয়েছে। ট্রাম্প মনে করছেন, এ বৈঠকের সবকিছু তাকে ঘিরেই হচ্ছে। কিন্তু কিমের দিক থেকে, এ বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু অস্ত্র থেকে সরে যাওয়া এবং পরমাণু অস্ত্রের মজুদ ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া কী পেতে পারে সে জন্য।
সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপ করা অবরোধ উঠিয়ে নেয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ, মানবিক সাহায্য এবং একটি আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি পেতে পারেন কিম। সেই সাথে উত্তর কোরিয়ার ওপর কখনো যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে না এবং দেশটির নেতৃত্বে পরিবর্তন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি উপেক্ষা করে অনির্বাচিত হলেও তাকে সারা জীবনের জন্য দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বলে স্বীকার ও সমর্থন করে যাবে। 

কিমের এই পরিবর্তন কেন?

সাধারণভাবে সবার ধারণা চীন উত্তর কোরিয়ার অবিচ্ছেদ্য বন্ধু ও মিত্র। অবশ্য পিয়ংইয়ং সব সময় তার নিজের পথেই গেছে। তবে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটির মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয় তখন যখন বিশেষ করে বেইজিংও জাতিসঙ্ঘের আরোপিত নতুন পরমাণু নিষেধাজ্ঞার প্রতি সমর্থন দিয়েছিল। 
উল্লেখ্য, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ বছরে ইতোমধ্যেই দুইবার কিমের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। জিনপিং উত্তর কোরিয়ার এ দিক পরিবর্তনে উদ্বিগ্ন। চীন মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমঝোতা হলে তা হবে ভয়ঙ্কর। আলোচিত এই বৈঠকের ব্যাপারেও চীন উদ্বিগ্ন। কারণ দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ করার ব্যাপারে চীনের আহ্বানে সাড়া দেয়নি উত্তর কোরিয়া। কে জানে হয়তো উত্তর কোরিয়াও একদিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চাইবে।

ঐতিহাসিক বৈঠকে যোগ দিতে ট্রাম্প-কিম এখন সিঙ্গাপুরে
রয়টার্স ও বিবিসি

ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে সিঙ্গাপুর পৌঁছেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় গতকাল রোববার দুপুরে কিমকে বহনকারী বিমানটি চেঙ্গি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরে সিঙ্গাপুরে পৌঁছান।

আগামীকাল মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের সান্টোস দ্বীপে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হবেন কিম ও ট্রাম্প। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং সুবিধাজনক স্থান বিবেচনায় বৈঠকের স্থান হিসেবে সিঙ্গাপুরকে বেছে নেয়া হয়। পৃথিবীর অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুরে একইসঙ্গে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস রয়েছে। 

সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্ট্রেইটস টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, এয়ার চায়না ৭৪৭ বিমানে করে কিম সিঙ্গাপুরে পৌঁছান। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক টুইটে কিমের পৌঁছার খবর নিশ্চিত করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করছেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুং। কিমের সঙ্গে গতকাল তিনি বৈঠক করেন এবং আজ সোমবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। 

এর আগে পিয়ংইয়ং থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি সরাসরি ফ্লাইট শনিবার সিঙ্গাপুরে অবতরণ করে। গুঞ্জন রয়েছে, কিমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিম চ্যাং সনসহ উত্তর কোরীয় কর্মকর্তাদের একটি দল আগেই সিঙ্গাপুর পৌঁছে যান। বিমানবন্দরে কিমকে শুভেচ্ছা জানান সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃশান।


১২ জুন সিঙ্গাপুরে বৈঠকের তারিখটি বেশ কিছুদিন আগে নির্ধারিত হলেও আচমকা গত ২৪ মে উনের সঙ্গে বৈঠকটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে উত্তর কোরিয়াসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব হতাশা প্রকাশ করেছিল। এরপর ২৫ মে ট্রাম্প নতুন করে ইঙ্গিত দেন, ১২ জুনই সিঙ্গাপুরে কিমের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে। ২৬ মে সংবাদ সম্মেলনেও এ বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একই দিনে আকস্মিক বৈঠক করেন উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতারা। ২৭ মে সকালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন বলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন। মঙ্গলবার ট্রাম্প কিমের বৈঠকের খবর সংগ্রহ করতে প্রায় তিন হাজার সাংবাদিক সিঙ্গাপুরে উপস্থিত থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কানাডায় জি সেভেন সম্মেলনে যোগ দেয়া শেষে শনিবার সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন ট্রাম্প ও তার সফরসঙ্গীরা। গতকাল সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুরের পায়া লেবার বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান ট্রাম্প। সেখান থেকে শাংরি লা হোটেলে যায় মার্কিন দলটি। ট্রাম্পকে বহনকারী এয়ারফোর্স-ওয়ান বিমানে ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন, হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ জন কেলি ও হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ স্যান্ডার্স।


আরো সংবাদ