নারী

ভিন দেশ : অনেক পিছুটানের মধ্যে থেকেও সফল হওয়া যায় Ñশ্যালি অ্যান

জামাইকার মাঠে একজন অতি সুপরিচিত স্প্রিন্টার শ্যালি অ্যান। তার পুরো নাম শ্যালি অ্যান ফ্রেজার প্রাইস। ২১ বছর বয়সে ২০০৮ সালের অলিম্পিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। অ্যাথলেট জগতে ১০০ মিটার দৌড়ে তিনিই প্রথম ক্যারিবিয়ান মহিলা ক্রীড়াবিদ। ২০১২ সালে সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে পাশ কাটিয়ে পরপর তিন বছর অলিম্পিক মেডেল ১০০ মিটার দৌড়ে বিশেষ খ্যাতি বহাল রাখতে সক্ষম হন প্রচুর শ্রমের মাধ্যমে।
‘২০১৬ গ্রীষ্ম অলিম্পিক’ (সামার অলিম্পিক) ব্রোঞ্জপদক পেয়ে শ্যালি ইতিহাসে ১০০ মিটার দৌড়ের ধারাবাহিক খ্যাতি ধরে রাখতে সক্ষম হন। ২০০৯ সালে আইএএএফ ১০০ মিটার স্প্রিন্টারে স্বর্ণপদক পেয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন খ্যাতি অর্জন করেন। তাতে বিশ্বে তার জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায়। পাশাপাশি সারা বিশ্ব এবং অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় তিনি দ্বিতীয় মহিলা স্প্রিন্টার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। ২০১৫ তে ১০০ মিটার দৌড়ে ‘ওয়ার্ল্ড টাইটেল’ অর্জন করেন। এরপর ২০০৯, ২০১৩ ও ২০১৫তে বিশ্বশিরোপার মুকুট অর্জন করেন। শ্যালিই একমাত্র নারী অ্যাথলেট, যিনি বিশ্বখ্যাত ও অলিম্পিক খ্যাতিÑ এই উভয় খ্যাতি পৃথকভাবে অর্জন করেন। ২০১৩ সালে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার এবং ৪ী১০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। শ্যালিই একমাত্র নারী যিনি বর্ণিত এসব খ্যাতি ধারাবাহিকভাবে অর্জন করতে থাকেন। তার ডাকনাম ‘পকেট রকেট’। এই নাম উচ্চারণ করা মাত্রই সবাই শ্যালিকেই বুঝে থাকে। কারণ তিনি দৌড়ের সময় বিস্ফোরণের মতো দৌড় শুরু করেন এবং ১০০ মিটার দৌড় অতিক্রম করেন ১০.৭০ সেকেন্ডে। ২০১৫ বিশ্বশিরোপা প্রতিযোগিতায় তাকে প্রদান করা হয় ইতিহাসে সর্ববৃহৎ স্প্রিন্টার হিসেবে।
মাত্র প্রায় ১৬ বছর বয়সে জামাইকা স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমে তিনি স্প্রিন্টিংয়ে কৃতকার্যতা দেখান। এ ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের জামাইকার এই ঘটনাটির আনন্দ যেন খুবই তীব্র।’ দর্শক বিড়বিড় করে বলতে থাকে, তুমি শুনবে, তারা চিৎকার করে বলছে, তোমার জয় নিশ্চিত, তৃতীয় সারির এ মেয়েটিকে তুমি অবশ্যই অতিক্রম করবে। এটা অবশ্য ক্রীড়াজগতের গতানুগতিক দুশমনি, যাতে আমরা অভ্যস্ত। ২০০৭ সালে জ্যামাইকার বিশ্বশিরোপা রিলে দৌড়ে তিনি ছিলেন পুরোধায়। রৌপ্যপদক জয় করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।
এমনকি শ্যালি কোনো প্রকার আশান্বিত না হয়েও বেইজিং অলিম্পিকে প্রতিযোগিতায় নামেন। খেলার জগতে এখন তাকে বলা হচ্ছে ‘জ্যামাইকার কিংবদন্তি’। এর পেছনে রয়েছে কঠোর ধৈর্য আর অনুশীলন।
বছরখানেক আগে মা হন শ্যালি। এত সব ঝামেলা আর ব্যস্ততার মধ্যেও এতটুকুও হাল ছাড়েননি এই দৌড়তারকা। বরং খেলার প্রতি ঝোঁক যেন আরো বেড়ে গেছে। যেমন সন্তান জন্ম দেয়ার পর সোনাও জিতেছেন লন্ডন অ্যানিভারসারি গেমসে। বছর কয়েক আগে যে ট্র্যাকে অলিম্পিক সোনা জিতেছিলেন, সেখানে এবার ১০.৯৮ সেকেন্ডে রীতিমতো বাজি মাত করে দেন। মা হওয়াকালে অনেকেই বলেছেন, এবার হয়তো শ্যালি খেলায় ভালো করতে পারবেন না। কিন্তু তিনি দেখিয়ে দিলেন এবং বলেন, অনেক পিছুটানের মধ্যে থেকেও সফল হওয়া যায় বা কাক্সিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এর জন্য মনের দৃঢ়তাই আসল বিষয়। মা হওয়ার পর প্রায় এক বছর পর ১০০ মিটারে জিতে শ্যালি অ্যানের যেন উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। আর এভাবেই তিনি এগিয়ে যেতে চান। শ্যালি অ্যান বলেন, আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে ট্যাকে ফিরতে, যা হয়তো সবার সম্ভব নয়। আমাকে বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ১১ সেকেন্ডের কমে ১০০ মিটার সম্পন্ন করতে পারাটা। সামনে আরো ভালো করতে চাই। বিশ্বের মানুষ আমাকে যেভাবে ভালোবেসেছে, তা টিকিয়ে রাখতে হবে আমার এ সংক্রান্ত কাজে সফলতার মাধ্যমে। সবাই বলছে, নারীদের ১০০ মিটারে একমাত্র শ্যালিই ১১ সেকেন্ডের নিচে স্প্রিন্ট শেষ করেন। এটি জামাইকাবাসীর গৌরব।
শ্যালি সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দরিদ্র পরিবার হিসেবেই চিহ্নিত করেন নিজের পরিবারকে। তার মা চাকরি করতেন। তবে সামান্য বেতনে। যে আয় করতেন তা দিয়ে কেবল সন্ধ্যার খাওয়া বাসায় নিতেন। আর এটিই ছিল শ্যালির বেদনা। তিনি ‘সাউথ ক্যাম্প জুভিনাইল কারেকশনাল সেন্টার ফর গার্লস’-এ এক অনুষ্ঠানে তার জীবনের বেদনাময় উত্থানের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি আত্মমর্যাদার দংশনে নিমজ্জিত ছিলাম এ কারণে যে, আমাদের ছিল না কোনো উত্তম পোশাক আর বিলাসবহুল বাড়ি এবং গণপরিবহনে যাতায়াত করতাম সাধারণের মতো। এ কাহিনী বলার উদ্দেশ্য এ জন্য যে, দারিদ্র্য একটি অতি স্পর্শকাতর বিষয়; যা মানুষকে অবগত থাকতে হয়।
শ্যালি অ্যানের জন্ম ১৯৮৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর জামাইকার কিংস্টোন নামক স্থানে। তার বসবাসও কিংস্টোনে। তার খেলার নাম ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড। আর ইভেন্টের নাম স্প্রিন্ট। তার কাবের নাম এমভিপি ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড কাব। ক্রীড়াজগতে এ পর্যন্ত বহু সম্মানজনক পুরস্কার পেয়েছেন শ্যালি।
‘জামাইকা অ্যাথলেটিকস অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অকেশন’স গোল্ডেন কিটস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন ২০০৯, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৫ সালে। ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৫ সালে আরজেআর ন্যাশনাল স্পোর্টস উইমেন অব দ্য ইয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১০, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে লরেস ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ড ফর স্পোর্টস উইমেন অব দ্য ইয়ারের মনোনয়ন পান এবং তাদের সম্মানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে উপস্থিত থাকেন নামকরা যত অবসরপ্রাপ্ত খেলোয়াড়। ২০১০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম ইউনিসেফ ন্যাশনাল গুডউইল অ্যাম্বাসেডর ফর জামাইকা হন। ২০১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গ্রেস গুডউইল অ্যাম্বাসেডর ফর পিস (শান্তি) নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে সায়েন্স ডিগ্রি ইন চাইল্ড অ্যান্ড এডলোসেন্স ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করা ছাড়াও আরো অনেক ধরনের পুরস্কার বা খ্যাতি অর্জন করেন খ্যাতিমান এই তারকা।

 

আরো সংবাদ