উপমহাদেশ

নয়াদিল্লি না বেইজিং : ভুটানের নির্বাচন ঘিরে তুমুল উত্তেজনা

গত বছর ডোকলামে চীন ও ভারতের মধ্যে ৭৩ দিনের সামরিক উত্তেজনার পর ভুটান নিয়ে চীন-ভারত স্পর্শকাতরতা অনেক বেড়ে গেছে। একসময় আশপাশের যেসব এলাকায় ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, এখন চীন ধীরে ধীরে সেখানে হাজির হচ্ছে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে চীন বিশেষভাবে সক্রিয় বলে দেখতে পাচ্ছে ভারত।
এরকম পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ও আগামী ১৮ অক্টোবর ভুটানে তৃতীয় জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। নির্বাচন পরিচালনার জন্য এরই মধ্যে তিন মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ভুটানের প্রধান বিচারপতিই এই সরকারের প্রধান হিসেবে রয়েছেন।

২০০৭ সালে ভুটানে প্রথম নির্বাচনী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার শুরু। নির্বাচনী সংস্কৃতি যতই এগোচ্ছে, ভুটানে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনা ততই বিকশিত হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে এখন প্রশ্ন হয়ে উঠছে, কোন দলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন। ভুটান চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে কি না এবং না করার কী কারণ থাকতে পারে— এরকম গুঞ্জনও নির্বাচনী প্রচারে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে।

ভুটানের সাথে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইছে চীন। ভুটানও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। তবে ভুটানের সরকারের (তখন প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে) ওই ধরনের মনোভাবের কারণে ২০১৩ সালের নির্বাচনের সময় ভুটানে সরবরাহ করা গ্যাসে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। নির্বাচনকে প্রভাবিত করা এবং ভোটাররা যাতে ভারত-সমর্থক দলকে ভোট দেন, সে জন্যই ওই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। যথারীতি তা-ই হয়। গ্যাসের ভর্তুকি ফিরে পাওয়ার আসায় নিরুপায় ভোটাররা পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ভোট দেয়। ৪৭টির মধ্যে ৩২ আসন পায় তারা। হেরে যায় ডিপিটি নামে পরিচিত পূর্বতন শাসকদল ‘দ্রুক পুয়েনসাম তসগপা’। যদিও প্রথম দফা ভোটে তারা সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল। ফলে গোটা দুনিয়াই জানে, ভুটানে নয়াদিল্লির ইচ্ছাই চূড়ান্ত। কিন্তু ভুটানের নাগরিকরা এখন ভারতীয় প্রভাব নিয়ে স্পর্শকাতর আচরণ শুরু করছে। আর এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ভুটানের উদীয়মান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে, যা এক দশক পেরিয়ে ১১তম বছরে পা দিল। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে নয়াদিল্লির।

ভুটানে সাধারণত দুই দফায় ভোট হয়ে থাকে। প্রথম দফায় ভোটাররা রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোট দেয়। যে দুই দল প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান পায়, তারা পার্লামেন্টের ৪৭টি আসনে প্রার্থী দেয় এবং তখন দ্বিতীয় দফা ভোট হয়। এবারের প্রথম দফা ভোটে চারটি দল অংশ নিচ্ছে। এবারের নির্বাচনে ডিপিটি আরো একটু ভালো করতে তৎপর। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাসেরিং তবগায়েকে তারা ‘প্রো-ইন্ডিয়ান’ হিসেবে তুলে ধরে জাতীয়তাবাদী তরুণদের ভোট পেতে চাইছে। তাসেরিং এই পরিস্থিতি সামাল দিতে খোলামেলাভাবেই আরো ভারতমুখী অবস্থান নিয়েছেন।

ভুটানের নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারা একত্র হয়ে নীতিগত বিষয়ে বিতর্কে যোগ দেন। এবার বিতর্কে মূলত অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোতেই আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল। জ্বালানিতে পরনির্ভরতা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক চলছে। চীন-ভারত প্রসঙ্গ সেখানে সামান্যই এসেছে। নির্বাচনে ভারতের বিরোধিতা এড়াতে সব দল মেনিফেস্টোতে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তবে নির্বাচনকে ঘিরে নয়াদিল্লি উদ্বেগমুক্ত নয় এবং বেইজিংও কূটনীতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। চীনের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কং ইউয়ানইউ গত জুলাইয়ের চতুর্থ সপ্তাহে তিন দিন ভুটান সফর করেছেন।

চীনের সুবিধা হলো, ভুটানের শাসকশ্রেণিও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। ফলে উভয় দেশের সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা দেখছে তারা। ‘সফট ডিপ্লোমেসি’ হিসেবে চীন থেকে ফুটবল ক্লাব, অ্যাক্রোব্যাট দল নিয়মিত যাচ্ছে থিম্পুতে। ভুটানের প্রচুর শিক্ষার্থীকে চীন বিনা পয়সায় পড়ারও সুযোগ করে দিচ্ছে। চীন থেকে ভুটানে পর্যটক আসার সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে। তবে সেটা এখনো ভারতীয়দের চেয়ে অনেক কম।

তবে ভারতকে কোণঠাসা করতে সম্প্রতি সীমান্ত বিবাদ নিরসনে চীন ভুটানকে দারুণ এক ছাড়ও দিয়েছে। উত্তর ও পশ্চিম ভুটান সীমান্তসংলগ্ন প্রায় ৭০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার দাবি ছেড়ে দিয়েছে চীন। বিনিময়ে চেয়েছে ভারত-ভুটান-চীন সীমান্ত যেখানে মিলিত হয়েছে, সেই ডোকলাম সংলগ্ন ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। এই প্রস্তাব ভুটানের জন্য লাভজনক হলেও ভারত একে উসকানিমূলক মনে করছে। ফলে রীতিমতো টানাপড়েনের মধ্যেই রয়েছে ভুটান।

ডোকলাম এলাকাটি সিকিমসংলগ্ন। ভারতের শিলিগুড়ি করিডর থেকেও এটা হাতের মুঠোয়। চীনকে এখানে কর্তৃত্ব করতে দিতে অনিচ্ছুক ভারত। শুধু ভারতের আপত্তির কারণে চীনের ডোকলাস সংলগ্ন ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারছে না থিম্পু। ভুটান-চীন সীমান্ত আলোচনায় ভারতের প্রভাব এই মুহূর্তে অচলাবস্থা জারি করে রেখেছে। এই অবস্থা ধরে রাখতেই ভুটান-চীন সম্পর্ক উন্নয়নে উৎসাহী রাজনীতিবিদদের আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী দেখতে চায় না নয়াদিল্লি। তাদের পছন্দ পিডিপি। শঙ্কা ডিপিটিকে নিয়ে। ডিপিটি বাণিজ্যে ভারতনির্ভরতা কমিয়ে চীনকেও কাছে টানতে ইচ্ছুক। এ মুহূর্তে ভুটানের ব্যবসায়িক বিনিময় শতকরা ৮০ ভাগই ভারতনির্ভর এবং দেশটির আয়ের প্রধান উৎস হয়ে আছে ভারতের কাছে পানিবিদ্যুৎ বিক্রি। কিন্তু তাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে সাধারণ নাগরিকদের কাছে ভারত আগে না চীন— তা অবশ্য টের পাওয়া যাবে ভুটানে তৃতীয় জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে। সেদিকেই তাকিয়ে নয়াদিল্লি ও বেইজিং।

আরো সংবাদ