রংপুর

৩৫ বছর ধরে বেতন-ভাতা ছাড়া চাকরি মুক্তিযোদ্ধার : এবার বাসস্থান থেকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা

রংপুরের ড্রাগস অ্যান্ড কেমিক্যাল কো-অপারেটিভ সোসাইটির আরডিসিসিএস লিমিটেডে দীর্ঘ সাড়ে তিন যুগ গার্ডের চাকরি করেও গতকাল পর্যন্ত এক পয়সা বেতন-ভাতা ভাগ্যে জোটেনি রণাঙ্গনের ৭ নং সেক্টেরে সম্মুখ সমরে অংশ নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলীর। উপরন্তু এখন ওই ক্যাম্পাসে বসবাসরত ওই মুক্তিযোদ্ধাসহ ৮টি পরিবারকে উচ্ছেদের জন্য পুলিশ ও মাস্তান দিয়ে জোর করে তুলে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে অসহায় হয়ে পড়েছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ পরিবারগুলো। বিষয়টি জানিয়ে বিভিন্ন দফতরে লিখিত আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর মহানগরীর স্টেশন আলমনগর এলাকায় ১৯৫৫ সালে ৪ একর ৩ শতক জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আরডিসিসিএস লিমিটেড। এখানকার উত্পাদিত ওষুধ বেশ সুনাম পায় আশির দশক পর্যন্ত। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকেই প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাসে ল্যাবরেটরি গার্ড মুক্তিযোদ্বা আইয়ুব আলী, দুই কর্মরত স্টাফ জয়নাল আবেদিন ও মজিবর রহমান এবং ক্যাম্পাসের স্থাপনায় ভাড়াটিয়া হিসেবে সুমন রহমান, মাহামুদুল হাসান, মিলন মিয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন ও আবু সায়েম পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই এখন প্রতিষ্ঠানটির নতুন কমিটি এসে মুক্তিযোদ্ধাসহ ওইসব পরিবারকে প্রশাসন এবং মাস্তান দিয়ে উচ্ছেদের জন্য চেষ্টা করছে।

এ ব্যপারে প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবরেটরি গার্ড বীর মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরে আসার পার ১৯৮৩ সালে আরডিসিসিএস লিমিটেডের ল্যাবরেটরিতে গার্ড হিসেবে চাকরিতে যোগদান করি। যোগদানের পর থেকেই আরডিসিসিএসের ক্যাম্পাসে ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছি। দীর্ঘ ৩৫ বছরেও আমি গার্ডের কোনো বেতন-ভাতা পাইনি। আমার কোনো ভিন্ন আয়ের উৎস নেই। মুক্তিযোদ্ধার ভাতা দিয়েই সংসার চালিয়ে আসছি। ক্যাম্পাসে বসবাসের কারণে আমার বাড়ি ভাড়া লাগে না। এতে আমি অনেক উপকৃত হয়েছি। কিন্তু হঠাৎ করেই কিছুদিন ধরে সেখান থেকে আমাকেসহ অন্যান্য পরিবারের লোকজনকে তুলে দেয়ার জন্য পাঁয়তারা করা হচ্ছে। বিষয়টি জানিয়ে আমি আরডিসিসিএসের সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত আবেদন করছি। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘বর্তমানে আরডিসিসিএস লিমিটেডের কর্মকর্তারা আমিসহ ৮টি পরিবারকে ক্যাম্পাস থেকে উচ্ছেদের জন্য পুলিশ ও মাস্তানদের পাঠিয়ে ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে। বিষয়টি আমরা পুলিশকে বার বার অবহিত করা সত্ত্বেও তারা কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। বরং আমাদেরকেই জায়গা ফাঁকা করতে বলছে। একারণে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। আমাকে যদি উচ্ছেদ করে দেয়া হয় তাহলে স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই ছেলের বউ এবং ৩ নাতনি নিয়ে আমাকে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে হবে।’

এ ব্যপারে আরডিসিসিএস লিমিটেডের সাবেক সভাপতি খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল জানান, আমাদের মেয়াদকালে আমরা প্রতিষ্ঠানটি সুন্দরভাবে চালিয়ে ছিলাম। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমরা এর ৪ পাশে দেয়াল দিয়েছিলাম। কিন্তু একটি কুচক্রি মহল তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ২০১৫ সালে আমাদের কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে সমবায় কর্তৃপক্ষ এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে কিছু সংখ্যক ব্যক্তিকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটির তথাকথিত সভাপতি আওরঙ্গজেব লাবলু মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলীসহ ৮টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে অন্যদেরকে জমি বরাদ্দ দেয়ার জন্য লাখ লাখ টাকা গ্রহণ করে আত্মসাত করেছেন। এছাড়াও কোম্পানির সম্পত্তি আত্মসাত করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ওই কমিটি দীর্ঘদিন থেকে সেখানে বসবাসকারী গার্ড মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যান্য বসবাসকারি ৮টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে ওই জায়গাটি দখল করে অন্যত্র বিক্রির পাঁয়তারা করছেন। যা পুরোপুরি বেআইনী।’

তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা মামলা করেছি। এই প্রতিষ্ঠানটির সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ২৮৬ শ’র ওপর। কোনো কিছু করতে হলে সকলের মতামতের ভিত্তিতে করা উচিত।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আরডিসিসিএসের সম্পত্তি ২২৮৬ জন শেয়ারহোল্ডারের সম্পত্তি। এ সম্পত্তির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে শেয়ারহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতেই করতে হবে। কারণ এ সম্পত্তির দলিলপত্র, খাজনা, রেকর্ড ইত্যাদি আরডিসিসিএস লিমিটেডের নামে। তাই কোনো অবস্থাতেই এ সম্পত্তির ব্যাপারে সমবায় কর্তৃপক্ষের বিকল্প পদক্ষেপ গ্রহণ করার এখতিয়ার নেই।

আরডিসিসিএস লিমিটেডের বর্তমান সভাপতি আওরঙ্গজেব লাবলু জানান, ‘প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৪ সালে বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মচারিরা যার যার মতন চলেও গেছেন। মুক্তিযোদ্ধা আইযুব আলীসহ অন্যদের মানবিক কারণে ওই জমিতে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ওই জমি খালি করার আদেশ দিয়েছে। সেকারণেই তাদেরকে চলে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।’

মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলীর গার্ডের বেতন ভাতার বিষয়ে তিনি জানান, ‘পুরো প্রতিষ্ঠানটি সমবায় অধিদফতর দেখে। এ ব্যাপারে আমার করার কিছু নেই।’

আরো সংবাদ