মতামত

নির্বাচনকে সামনে রেখেই এসব করা হচ্ছে

[অরুন্ধতী রায় ভারতের একজন খ্যাতনামা অ্যাক্টিভিস্ট তথা গণ-আন্দোলন সংগঠক। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তার রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি। যে ক’জন ভারতীয় নাগরিক ইংরেজিতে সাহিত্য চর্চা করে বিশ্বে সুনাম কুড়িয়েছেন, তিনি তাদের একজন। অরুন্ধতীর সর্বাধিক পরিচিত উপন্যাস The God of Small Things. এ বইটি লিখে তিনি ১৯৯৭ সালে বিখ্যাত ম্যান বুকার প্রাইজে ভূষিত হয়েছেন। পাশ্চাত্যে আর কোনো ভারতীয় লেখকের বই এত অধিক সংখ্যায় বিক্রি হয়নি। The Ministry of Utmost Happines তার লেখা সাম্প্রতিক গ্রন্থ, যা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

প্রতিবাদী লেখক ও আন্দোলনকারী অরুন্ধতী রায় এখানে তুলে ধরেছেন গণতন্ত্রী ভারতের ক্ষমতাসীন মহলের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ। তার লেখাটিতে হিন্দুত্ববাদী সরকারের আচরণ এবং মুসলিম-দলিত-আদিবাসীর চরম দুর্ভোগ ফুটে উঠেছে। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বলে তার বিশ্বাস। দক্ষিণ এশিয়াসহ পৃথিবীর দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের নামে উগ্রতা ও সাম্প্রদায়িকতা এবং গণতন্ত্রের মোড়কে কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারের প্রেক্ষাপটে বক্ষ্যমাণ লেখাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ইনফরমেশন ক্লিয়ারিং হাউজের সৌজন্যে পাওয়া এই নিবন্ধের ভাষান্তর করেছেন মীযানুল করীম।]

 

গত ৩০ আগস্টের সকালে যে পত্রিকাগুলো হাতে এলো, তাতে দেখা যায়- যে বিষয়ে আমরা বিতর্ক করছি, তার কিছুটা জবাব মিলেছে। এ দিন ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় এক রিপোর্টে লেখা হয়েছে- Police to court : Those held part of anti-fascist plot to over throw govt. (আদালতে পুলিশ বলেছে- আটক ব্যক্তিরা ফ্যাসিস্ট-বিরোধীদের সরকার উৎখাতের চক্রান্তে লিপ্ত)। অর্থাৎ আমরা এমন এক শাসনের বিরুদ্ধে, যার পুলিশই বলছে, তারা হলো ‘ফ্যাসিবাদী’। যা হোক, আজকের ভারতে সংখ্যালঘু হওয়া অপরাধ। খুনের শিকার হওয়া এক ধরনের অপরাধ। বিচারবহির্ভূত পন্থায় কাউকে মারা হলে সেটি ওই ব্যক্তির অপরাধ। বর্তমান ভারতে গরিব হওয়াও অপরাধ হিসেবে গণ্য। আর গরিবদের পক্ষে নামার অর্থ, ‘সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র’।

পুনার (মহারাষ্ট্র) পুলিশ একই সময়ে সর্বত্র অভিযান চালিয়েছে সুপরিচিত আন্দোলনকারী, কবি, আইনজীবী ও ধর্মীয় নেতাদের বাড়িতে। গ্রেফতার করা হয়েছে পাঁচজনকে, যারা প্রথম সারির নাগরিক অধিকার সংগ্রামী। দু’জন আইনজীবীও হয়েছেন গ্রেফতার। নথিপত্র ছাড়াই কিংবা নামমাত্র নথির ভিত্তিতে এবং হাস্যকর অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে। সরকারের জানা দরকার, তারা এভাবে জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনসহ আমাদের সব প্রতিক্রিয়া এবং দেশজুড়ে সংঘটিত যাবতীয় প্রতিবাদকে গুরুত্ব দিয়েই সরকার এটি করে থাকবে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেন এটি ঘটল?

ভোটারদের প্রকৃত তালিকা এবং ‘লোকনীতি-সিএসডিএস-এবিপি মুড অব দ্য নেশন’ জরিপ থেকে দেখা যায়, ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা এত বেশি হ্রাস পাচ্ছে, যা তাদের দৃষ্টিতে উদ্বেগজনক। এটি ইঙ্গিত দেয় বিপজ্জনক সময়ের সূচনা হওয়ার। এই জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ফলে যুক্তিসঙ্গত বিষয় থেকে নজর ফেরাতে নিষ্ঠুর ও অব্যাহত প্রয়াস চালানো হবে। সেই সাথে চেষ্টা করা হবে বিরোধী দলের ক্রমবর্ধমান ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য। এখন থেকে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ সার্কাসই চলতে থাকবে- গ্রেফতার, হত্যাকাণ্ড, বেআইনিপন্থায় কথিত বিচারের রায়ে চরম দণ্ড, বোমা হামলা, সাজানো সন্ত্রাসী ঘটনা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, কোনো জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে নির্যাতন-লুণ্ঠন-হত্যা, প্রভৃতি। এ ধরনের যাবতীয় সহিংসতার হিড়িক শুরু হওয়ার সাথে নির্বাচনী মওসুমের যে সম্পর্ক আছে, তা আমরা জেনে ফেলেছি। ‘ভাগ করো আর শাসন চালাও।’ হ্যাঁ, এটাই। এর সাথে যোগ হয়েছে, ‘মনোযোগ আরেক দিকে ঘুরিয়ে দাও এবং শাসন করো।’ আগামী নির্বাচন পর্যন্ত আমরা জানতেও পারব না, কখন কোথায় কিভাবে আগুনের গোলার মতো মহামুসিবত আমাদের ওপর এসে পড়বে। এর ধরন কেমন হবে, তা-ও জানি না। তাই আইনজীবী আর আন্দোলনকারীদের গ্রেফতারের কথা বলার পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়ের কথা শুধু বলে রাখছি। যদি অগ্নিবৃষ্টিও হতে থাকে কিংবা আমরা অদ্ভুত সব অঘটনের শিকার হই, মনোযোগ যেন কিছুতেই এসব বিষয় থেকে সরিয়ে না নিই।

(১) ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসের ৮ তারিখের পরে এক বছর ৯ মাস কেটে গেছে। তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টিভির পর্দায় হাজির হয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন মুদ্রার নোট বাতিল করার। বাজারে চালু থাকা মুদ্রার ৮০ শতাংশই এর আওতায় এসেছিল। মনে হয়েছে, মোদির মন্ত্রীরা পর্যন্ত এ ঘোষণা শুনে তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া বলছে, ওই ঘোষণার ফলে কাগুজে মুদ্রার ৯৯ শতাংশই ফেরত এসেছিল। ব্রিটেনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকা এখন রিপোর্ট করছে, মোদির সে নীতি ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির ১ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল এবং প্রায় ১৫ লাখ লোকের চাকরি খেয়েছে। এ দিকে আগের নোট বাতিলের পর কেবল নতুন নোট ছাপাতেই কয়েক হাজার কোটি রুপি খরচ হয়ে গেছে। এরপর এলো পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি)। এই করের কাঠামো এমনভাবে বানানো হলো যে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসায়গুলো বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। অথচ এগুলো তখনো কাগজের নোট বাতিলের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

দেখা গেছে, খুদে ব্যবসায়ী এবং দরিদ্র শ্রেণীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ চরম দুর্ভোগের শিকার হলেও বিজেপির ঘনিষ্ঠ কিছু কোম্পানি তাদের সম্পদ কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। বিজয় মাল্য এবং নীরব মোদির মতো ব্যবসায়ীদের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যাতে জনগণের হাজার হাজার কোটি রুপি নিয়ে গোপনে চম্পট দেয়া যায়। এ সময় সরকার অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিল।
এসব ব্যাপারে আমরা কি সরকারের কোনো ধরনের জবাবদিহিতা আশা করতে পারি? কিছুই না? জবাবদিহিতার জায়গা তাহলে কি শূন্যই থাকবে?

এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বিজেপি ভারতের সবচেয়ে সম্পদশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। অপর দিকে, দলটি ২০১৯ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটা নির্লজ্জ, অনৈতিক ও মর্মান্তিক ব্যাপার যে, সম্প্রতি চালু করা ‘নির্বাচন বন্ড’ নিশ্চিত করছে- রাজনৈতিক দলের সম্পদের উৎস অজ্ঞাতনামা থাকতে পারবে।

(২) ২০১৬ সালে নরেন্দ্র মোদি মুম্বাইয় ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ইভেন্টটি উদ্বোধন করেছেন। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সেই অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক উৎসবের মূল তাঁবুটি পুড়ে গিয়েছিল। তবে এই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রহসনের প্রকৃত বহ্ন্যুৎসব হচ্ছে রাফায়েল জঙ্গিবিমান কেনার চুক্তি। প্রধানমন্ত্রী প্যারিসে গিয়ে এ চুক্তি করার কথা জানালেন। প্রতীয়মান হয়েছে, খোদ প্রতিরক্ষামন্ত্রীই এটা জানতেন না। প্রচলিত কোনো প্রটোকলেই এমন হওয়ার কথা নয়। চুক্তিটির ‘হাড়গোড়’ যা চোখে পড়েছে, তা হলো- কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) সরকারের সময় ২০১২ সালে একটি চুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং ওই চুক্তি মোতাবেক হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড বিমানগুলোর বিভিন্ন অংশ সংযোজন করার কথা। কিন্তু পরে ওই চুক্তি পরিত্যাগ করে নতুন করে সাজানো হলো।

এ দিকে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকসকে কেটে-ছেঁটে দেয়া হয়েছে। কংগ্রেস প্রশ্ন করেছে, রিলায়েন্স ডিফেন্স লিমিটেড কোনো দিন একটি বিমানও না বানিয়ে কিভাবে ওই চুক্তিতে সম্পৃক্ত হতে পারে? এ ব্যাপারে যৌথ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করার দাবি তুলেছে বিরোধী দল। এমন কোনো কমিটি গঠন করা হবে বলে কি প্রত্যাশা করা যায়? নাকি অবশ্যই পুরো বিমানবহর এবং আনুষঙ্গিক সব কিছু গিলে ফেলা হবে কোঁৎ করে।

(৩) কর্নাটক রাজ্যের পুলিশ সাংবাদিক ও আন্দোলনকারী গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্য দিয়ে ‘সনাতন সংস্থান’-এর মতো কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অপতৎপরতা উন্মোচিত হয়েছে। এভাবে যা জানা গেছে, তা হলো- একটি রহস্যময় ও পূর্ণাঙ্গ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এদের আছে হামলার টার্গেটগুলোর তালিকা; গোপন আস্তানা ও ‘সেফ হাউজ’। এদের অস্ত্রশস্ত্র প্রচুর এবং এসব সংগঠনের পরিকল্পনা রয়েছে বোমাবাজি, হত্যা ও বিষ প্রয়োগের। আমরা এসব গোষ্ঠীর ক’টি সম্পর্কেই বা জানি? আমরা জানি না, ক’টি সংগঠন গোপনে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এই নিশ্চয়তা পেয়েছে যে, তাদের ওপর ক্ষমতাশালী মহলের আশীর্বাদ রয়েছে। সম্ভবত পুলিশও তাদের বরাভয় দিয়েছে।

প্রশ্ন জাগে, আমাদের ব্যাপারে এদের মতলব কী? তাদের ভুয়া হামলা কোনটি আর আসল হামলা কোনটি? কোথায় ঘটবে এসব হামলা? কাশ্মিরে না অযোধ্যায়? নাকি কুম্ভমেলায়? তারা কিছু বড় হামলা করে, এমনকি ছোট ছোট হামলা করেও পোষা মিডিয়াকে দিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার চালায় এবং সহজেই সব কিছু ওলটপালট করে দিতে পারে। আসল হুমকি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে সাম্প্রতিককালের কিছু গ্রেফতার নিয়ে হইচই চলছে।

(৪) খুব দ্রুততার সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তছনছ করা হচ্ছে। চমৎকার রেকর্ডের অধিকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধ্বংস করে দিয়ে ভুতুড়ে ভার্সিটিকে বড় করে তোলা হচ্ছে, যার অস্তিত্ব নেহায়েতই কাগুজে। দিল্লির জওয়াহেরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে কী ঘটছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি। সবার চোখের সামনে এটিকে টেনে নামানো হচ্ছে। অব্যাহত হামলা চলছে এর ছাত্র ও স্টাফের ওপর। কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল এ ক্ষেত্রে মিথ্যাচার ও ভুয়া ভিডিও প্রচারের তৎপরতা দেখিয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের জীবন হয়ে উঠেছে বিপন্ন এবং তরুণ বুদ্ধিজীবী উমর খালিদকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। তাকে নির্দয়ভাবে হেয় করা হয়েছে। সে হয়েছে মিথ্যা প্রপাগান্ডার পাত্র। এর সাথে যোগ হয়েছে ইতিহাস বিকৃতি আর সিলেবাসের নির্বুদ্ধিকরণ।

এতে মাত্র কয়েক বছরেই বুদ্ধির জড়তা দেখা দেবে, যা থেকে আমরা মুক্তি পেতে অক্ষম। তদুপরি, শিক্ষার বেসরকারীকরণ সর্বনাশ করছে। সংরক্ষণনীতি যে সামান্য কল্যাণ নিশ্চিত করেছে, তা-ও আর টিকতে পারছে না। শিক্ষাকে আবার ‘ব্রাহ্মণ’ বানানো হচ্ছে। এবার তা করা হচ্ছে বড় বড় ব্যবসায়ী কোম্পানির পরিচয়ে। জ্ঞানার্জনের পাদপীঠগুলো থেকে দলিত আদিবাসী এবং অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের জোর করে হঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। কারণ তারা বেতনের অর্থ জোগাড় করতে পারছে না। এ অবস্থা মোটেও মেনে নেয়া যায় না।

(৫) কৃষি খাতে ব্যাপক দুর্দশা। ক্রমবর্ধমান হারে কৃষকেরা আত্মহত্যা করছেন। মুসলমানদের পিটিয়ে বা নির্যাতন করে মারা হচ্ছে। দলিতদের ওপর চলছে অব্যাহত হামলা। তাদের প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ছাড়াও ‘ভীম সেনা দল’-এর নেতা চন্দ্রশেখর আজাদকে করা হয়েছে গ্রেফতার। এই সংগঠন উচ্চবর্ণের লোকজনের হামলা রুখে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছিল। তফসিলি সম্প্রদায় ও তফসিলি আদিবাসীদের প্রতি নির্মমতা দমনের জন্য যে আইন, তা বানচালের চেষ্টাও করা হয়েছে।

এবার সাম্প্রতিক গ্রেফতার প্রসঙ্গ। গ্রেফতার করা হয়েছে ভার্নন গনসালভেস, অরুণ ফেরেইরা, সুধা ভরদ্বাজ, বরাবর রাও ও গৌতম নওলাখাকে। এদের কেউ এলগার পরিষদের সমাবেশে ছিলেন না। গত বছরের সর্বশেষ দিন এই সমাবেশ হয়েছিল। পরদিনের সমাবেশেও তারা ছিলেন না। শেষোক্ত সমাবেশে প্রায় তিন লাখ মানুষ অংশ নিয়েছে যাদের বেশির ভাগই দলিত। ‘ভীমা-কোরেগাঁও বিজয়ের ২০০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তারা সমবেত হয়েছিল। ওই ঘটনায় দলিতরা ছিল অত্যাচারী শাসক পেশোয়ার বিরুদ্ধে। তারা বিজয়ের ঘটনা উদযাপন করতে পারে খুব কমই।

যা হোক, এলগার পরিষদ গঠন করেছেন দু’জন অবসরপ্রাপ্ত খ্যাতনামা বিচারক- বিচারপতি সওয়ান্ত ও বিচারপতি কোলসে প্যাটেল। পরদিনই এলগার পরিষদের র‌্যালিতে হামলা চালায় হিন্দুত্ববাদী ধর্মোন্মাদরা। এর পরিণতিতে কয়েক দিন উত্তেজনা বিরাজ করেছে। এই হামলার জন্য বেশি দায়ী হলো দুই ব্যক্তি মিলিন্দ একবোতে ও সম্ভাজী ভিড়ে। এদের কেউ ধরা পড়েনি। তাদের এক সমর্থক গত জুন মাসে এফআইআর দায়ের করার জের ধরে পুনার পুলিশ পাঁচজন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলো- রোনা উইলসন, সুধীর ধাওলে, সোমা সেন, মিহির রাউত ও আইনজীবী সুরেন্দ্র গাদলিং। অভিযোগ আনা হয়েছে, এরা সমাবেশে সহিংসতার পরিকল্পনা করেছিল এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার ফন্দি আঁটছিল। নিপীড়নমূলক কানুন ‘বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনের’ (ইউএপিএ) আওতায় অভিযোগ এনে তাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে। সৌভাগ্য হলো, তারা এখনো মরেনি। কারণ একই অভিযোগে অভিযুক্ত ইশরাত জাহান, সোহরাবুদ্দিন ও কাওসার বি বিচারের আগেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন।

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের সরকার এবং বিজেপি সরকার- উভয়ের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, আদিবাসীদের ওপর তাদের হামলাকে গোপন করা। এখন বিজেপি দলিতদের ওপর তার হামলাকে লুকাতে চাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে বলা হয়, হামলা করা হয়েছে ‘মাওবাদী’ বা ‘নকশালদের’ ওপর। এর কারণ, ভারতের সব রাজনৈতিক দলের নজর রয়েছে আদিবাসী ও দলিতদের অধ্যুষিত নির্বাচনী আসনগুলোর দিকে। দলগুলোর কাছে এসব জনগোষ্ঠী ‘সম্ভাবনাময় ভোটব্যাংক’। ইতোমধ্যে নির্বাচনী অঙ্কের হিসাব-নিকাশ থেকে মুসলমানদের মুছে দেয়া হয়েছে। যা হোক, আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার এবং তাদের ‘মাওবাদী’ হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে সরকার দলিতদের আশা-আকাক্সক্ষাকে ক্ষুণœ ও অপমান করার ব্যবস্থা করেছে। দেখা যায়, সরকার দলিতদের ইস্যুগুলোর ব্যাপারে স্পর্শকাতর। আজ দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষ কারাগারে। এসব দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ তাদের বাসস্থান, ভূমি ও মর্যাদার জন্য লড়ছে। রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের নামে। আরো মন্দ ব্যাপার হলো, বিনা বিচারে তারা গাদাগাদি করে কারাগারে প্রহর গুনছে।

এবার তিনজন আইনজীবী ও সাতজন সুপরিচিত আন্দোলনকারীসহ ১০ জনকে গ্রেফতারের ঘটনার পর দুস্থ মানুষেরা কেউ ন্যায়বিচার পাওয়া কিংবা সুষ্ঠু প্রতিনিধিত্বের আশা আর করতে পারছে না। কয়েক বছর আগে মধ্যভারতের বাস্তারে ‘সালওয়া জুদুম’ নামে একটি বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এরা লোকজনকে হত্যা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল। তখন পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজের (পিইউসিএল) সাধারণ সম্পাদক ডা: বিনায়ক সেন ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পক্ষে মুখ খুলেছিলেন।

এ কারণে তাকে জেলে যেতে হলো। তখন সুধা ভরদ্বাজ তার স্থলাভিষিক্ত হন। সুধা একজন আইনজীবী ও শ্রমিক নেতা। তিনি কয়েক বছর আগ থেকেই ওই এলাকায় কাজ করে আসছিলেন। প্রফেসর সাইবাবা অবিরাম প্রচারণা চালিয়ে গেছেন বাস্তারে প্যারামিলিটারির অভিযানের বিরুদ্ধে। তাকে গ্রেফতার করার পর রোনা উইলসন হলেন তার স্থলাভিষিক্ত। সুরেন্দ্র গাদলিং ছিলেন সাইবাবার আইনজীবী। উইলসন ও গাদলিং গ্রেফতার হলে ভরদ্বাজ ও নওলাখাসহ অন্যরা তাদের পক্ষে দাঁড়ান। এভাবেই চলছে আন্দোলন। যারা দুস্থ ও বঞ্চিত, তাদের ঘেরাও করে খামোশ রাখা হয়েছে। যারা সরব ও ‘গণ্ডগোলের লোক’, তাদের ঠিকানা কারাগার। আমাদের দেশটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে বিধাতা সহায় হোন।

আরো সংবাদ