মধ্যপ্রাচ্য

সব মানবিক সাহায্য বন্ধে বিপাকে ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা

ফিলিস্তিনের শরণার্থীদের জন্য সাহায্য বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা বা জাতিসঙ্ঘের রিলিফ এন্ড ওয়ার্কস এজেন্সি ইউএনআরডাব্লিউ-কে সব ধরনের অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর প্রতিক্রিয়ায় এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আমেরিকা ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার হরণ করতে চায়। আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে ইসরাইল। তবে চাপ সৃষ্টির মার্কিন সিদ্ধান্তের কাছে ফিলিস্তিনিরা নতিস্বীকার করবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র হিদার নরেট বরেছেন, ইউএনআরডব্লিউএ’র কার্যক্রম অবিশ্বাস্যভাবে ত্রুটিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ সতর্কতার সাথে বিষয়টি পর্যালোচনা করে ইউএনআরডব্লিউকে দেয়া অতিরিক্ত সাহায্য বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের আর কোনো সাহায্য করা হবে না।

ইসরাইল ঘরবাড়ি কেড়ে নেওয়ায় যারা শরণার্থীতে পরিণত হয়েছেন তাদেরকে সহায়তা দিয়ে থাকে জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা বা ইউএনআরডাব্লিউ। ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকে ফিলিস্তিনি বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং এতিম শিশুদের সাহায্যার্থে জাতিসংঘের ইউএনআরডব্লিউএ ত্রাণ শাথা কাজ করে যাচ্ছে।
কিন্তু হঠাৎ করে সব ধরনের মার্কিন সাহায্য সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়ায় বিপাকে পড়েছে মানবিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী এ সংস্থাটি।

এক সপ্তাহ আগে ফিলিস্তিনিদের জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া ৫০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মধ্যে ৭০ বছর আগে যাদের বাড়িঘর দখল করেছিল ইসরাইল, কেবল ওই ৫ লাখ ফিলিস্তিনিকেই শরণার্থী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিন সঙ্কটের বিষয়ে ‘শতাব্দির সেরা চুক্তি’ নামের একটি কথিত শান্তি প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ট্রাম্প নানা উপায়ে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে এখন ফিলিস্তিনিদেরকে ওই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য করতে চাচ্ছে।

ট্রাম্পের ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জেরুসালেম ইসরাইলকে দিয়ে দেওয়া হবে এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীরাও আর কোনো দিন নিজ ভূমিতে ফিরতে পারবে না। বর্তমানে গাজা ও পশ্চিমতীরের যে ভূখণ্ডটুকু ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেটুকু নিয়েই ফিলিস্তিনিদেরকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর একটি আঘাত। এভাবে সাহায্য-সহযোগিতা বন্ধ করে মার্কিনিদের অন্যায় আবদার মেনে নিতে ফিলিস্তিনিদের বাধ্য করা যাবে না। এটা জাতিসঙ্ঘের নীতিবহির্ভূত কাজ।

মার্কিন অর্থ সহায়তা বন্ধের প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদিনা বলেছেন, এ ধরনের শাস্তির মাধ্যমে তারা এই বাস্তবতা পাল্টাতে পারবে না যে এ অঞ্চলে আমেরিকার আর কোনো ভূমিকা নেই এবং এটা কোনো সমাধানেরও অংশ নয়। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে জাতিসঙ্ঘের রেজুলেশনের অবজ্ঞা করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমানোর পর জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থাকে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জার্মানি। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিকো ম্যাস বলেছেন, জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ ও কর্ম সংস্থার (ইউএনডব্লিউআরএ) জন্য তহবিল সঙ্কটে অনিশ্চয়তার কারণে এ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এ সংস্থার ক্ষতি হলে একটি ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ইতোমধ্যে ইউএনডব্লিউআরএ-কে এ বছর জার্মানি ৯৪ মিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রদান করেছে। এ সহায়তা আরো বৃদ্ধি করার জন্য আমরা প্রস্তুত হচ্ছি।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দেওয়া এক চিঠিতে ম্যাস বলেন, বর্তমানে আমরা অতিরিক্ত তহবিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছি। এটা খুব স্পষ্ট যে ২১৭ মিলিয়ন ডলারের তহবিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার অংশ প্রত্যাহার করে নেওয়ায় পর জার্মানির সহায়তা সেই ঘাটতি পূরণ করবে না। তাই এ বিষয়ে তিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে ইউএনডব্লিউআরএ-কে একটি টেকসই অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। এ পদক্ষেপকে বাণিজ্যিক, সামরিক ব্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বৃহত্তর ধাপের অংশ।

 

মেসিদের সিদ্ধান্তে খুশি হামাস, কাজ হয়নি নেতানিয়াহুর ফোনেও

বিশ্বের ন্যায়কামী মানুষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আর্জেন্টিনা ইসরাইলের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত ফুটবল প্রীতি ম্যাচ বাতিল করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। হামাসের রাজনৈতিক দপ্তরের প্রভাবশালী সদস্য হেসাম বাদরান বলেছেন, আর্জেন্টিনার এই সিদ্ধান্ত থেকে প্রমাণিত হয়েছে গণমানুষের চাপ বাস্তব ফল বয়ে আনতে পারে।

তিনি আরো বলেন, বিশ্বব্যাপী ইসরাইলের বিরুদ্ধে বয়কট, পুঁজি প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে 'বিডিএস' আন্দোলন চলছে তা এক ধরনের প্রতিরোধ। এর মাধ্যমে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করা সম্ভব এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলকে কোণঠাসা করতে এ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

আগামী ৯ জুন জেরুসালেমে ইসরাইলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তীব্র সমালোচনা ও ফিলিস্তিনি ফুটবল ফেডারেশনের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে ওই ম্যাচ বাতিল ঘোষণা করেছে আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্তৃপক্ষ।

আর্জেন্টিনার ক্রীড়াবিষয়ক ওয়েবসাইট মিনুতুনো জানিয়েছে, সহিংসতা বৃদ্ধির আশঙ্কা, হুমকি ও সমালোচনার মুখে লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনার ফুটবল দল ইসরাইলের সঙ্গে ৯ জুনের প্রস্তুতি ম্যাচটি বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্তের পর ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আর্জেন্টিনার ফুটবল খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তবে এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়েছে ইসরাইলি নেতারা। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মরিসিও মার্সিকে ফোন করে খেলা বাতিলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অনুরোধ করেছেন। জবাবে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তার দেশের ফুটবল ফেডারেশন একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। ফুটবল ফেডারেশনের সিদ্ধান্তে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না।

ইসরাইলি যুদ্ধমন্ত্রী এভিগডোর লিবারম্যান আর্জেন্টিনার ফুটবল টিমের কঠোর সমালোচনা করেছেন। দৈনিক ইয়াদিউত অহারনোত বলেছে, আর্জেন্টিনার সিদ্ধান্তে আরো একটি বিজয় হয়েছে বয়কট আন্দোলন তথা বিডিএস মুভমেন্টের।

আরো সংবাদ